শহর এক আশ্চর্য প্রেমিকার নাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

আহমেদুর রশীদ টুটুল

অদ্ভূত রকম ভাবে শহর আমার ভাল লাগে। শহরের কেন্দ্রে বা প্রান্তে, স্টেশনে বা টার্মিনালে, শূড়িখানায় -অন্ধগলিতে আমার হেটে বেড়াতে ভাললাগে, বসে বসে মানুষ দেখতে ভাললাগে।শহর দেখতে আমি ঘন্টা চুক্তিতে রিকশা ভাড়া করি, বাসে চেপে বসি। কত রকমের, কত প্রকারের মানুষ, প্রত্যেকের মুখাবয়বের অভিব্যক্তি আলাদা, প্রত্যেকের চোখের ভেতর নিজস্ব লুকানো গল্প। এই দেখাটা আমার নেশার মতো। রাস্তা-ঘাট, গাছপালা, নদী, পুরনো ভবন সবই ভাললাগে।ভাললাগে মানে আমার দেখতে ভাললাগে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে তার চোখের দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকা গল্প শুনতে ইচ্ছে করে। যে শহরেই যাই তার বইয়ের দোকান গুলোতে অকারণে ঢু মারি, কখনো কোথাও পুরনো বইয়ের দোকান পেলে ঘড়ির কাটা আমাকে পেছনে ফেলে রেখে যায়। এভাবেই বসবাস, বেড়ানো আর আশ্রয়ের সূত্রধরে স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ভেতর জমা হয়ে গেছে অনেকগুলো শহর, শহরের নাম।

তখনো জখমের ঘা পুরোপুরি শুকায়নি। কানের ভেতরে রক্ত জমে আছে। চোখে দেখতে ঝাপসা লাগে। হাসপাতাল থেকে নিজের বাসায় ফিরে যেতে পারিনি। আত্মীয় স্বজন,বন্ধুবান্ধব কেউই আমাকে তাদের বাসায় রাখার সাহস পাচ্ছেন না। ব্যার্থ আততায়ীরা তক্কে তক্কে আছে  সুযোগের। এই প্রথম তাদের কোনো অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। পাহাড়ায় থাকা পুলিশ টের পায়না কিন্তু হাসপাতালে আসা যাওয়ার মাঝে রুনাএবংআরো দুএকজন টের পায় এই নিরব অনুসরণ। গত একটা বছর এই দূর্বিসহ অনুসরণকে পাশ কাটিয়ে চলার কতনা কসরত করেছি।পারিনি শেষ পর্যন্ত! ভাল করে দাঁড়াতে পারছিনা, এই অবস্থাতেই এক অসীম অজানায়, চরম অনিশ্চয়তায় বের হয়ে আসতে হলো। পেছনে পরে থাকলো দেশ,আবেগের স্বদেশ, আমার জন্ম শহর সুনামগন্জ, বেড়ে ওঠার শহর সিলেট আর প্রাণের শহর ঢাকা। পরে থাকলো আমার স্বপ্নের শুদ্ধস্বর; শুদ্ধস্বর ও একটা শহর হয়ে উঠেছিল বোধহয় বা হয়ে উঠার পথে ছিল, স্থানিক ঠায়-ঠিকানার বাইরে একটা মনোজাগতিক শহর। সবকিছু পেছনে ফেলে আমি রুনা আর দুই মেয়েকে নিয়ে যেন শূইন্যে দিলাম উড়া। তো ভাঙা ডানা নিয়ে যে শহরে নামলাম, সেখানে সীমাহীন আতংক আর অপেক্ষার মধ্যে পার করলাম অনেকগুলো দিন। অথচ এই শহরেই আমি আর রুনা যাপন করেছি আমাদের মধুচন্দ্রিমার উজ্জ্বল দিনগুলো।কিন্তু এবার ঘুরে বেড়ানো আর চষে বেড়ানো এই শহরের মধ্যে থেকেও এক প্রকার গৃহবন্দীই থেকেছি গেস্ট হাউসের নিরাপত্তা দেয়ালের ভেতরে। শহরটা বারেবারে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে, বেরুবার ইচ্ছা হয়নি।অপেক্ষার পালা শেষ করে অবশেষে পেলাম অভয় বাণী, নরওয়ের ছোট্ট শহর ,হেনরিক ইবসেনের জন্মস্থান শিয়েন আমাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য সম্মতি পত্র পাঠিয়েছে।

জানুয়ারির তুমুল ঠান্ডা, যে ঠান্ডার বর্ণনা দেয়া আসলেই অসম্ভব ব্যাপার, সেই ঠান্ডা আর অপার বরফে আচ্ছাদিত এক অচেনা অজানা রানওয়েতে আমাদের বহনকারী বোয়িংয়ের চাকা স্পর্ষ করা মাত্র বুকের ভেতরে কত দীর্ঘএক হাহাকার এফোঁড় ওফোঁড় করে গেলো , কী যেন হারিয়ে ফেলার বেদনার টংকার সেতারের তার ছেঁড়ার মতো বেজে গেলো আমি জানিনা, সত্যি জানিনা কেমন করে এই যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করতে হয়। ওয়েটিং লাউন্জে যিনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি মূলত একজন গায়ক। কাজ করেন শিয়েন লাইব্রেরিতে। তাঁর সঙ্গে আরো একজন ছিলেন, তিনি নরওয়ে সরকারের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। তারা আমাদেরকে স্বাগত জানালেন , জড়িয়ে ধরলেন, মনে হচ্ছিল কতদিনের যে চেনা পরিচয়।স্থায়িভাবে বিদেশ বাসের ইচ্ছা কোনদিনই ছিলনা। সিলেটি হিসাবে লন্ডনি বিয়ে করেনা, ওপি-ডিবি না, দালাল ধরেনা। তবে আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার আগে কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছিলাম, বাচ্চাদের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল, অসুস্থ হয়ে পরেছিলাম, হতাশা ঘিরে ধরেছিল। কিন্তু কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই, গোছানো টোছানো ছাড়াই এসে পরে গেলাম অচেনা বিদেশে। গায়ক বন্ধু আমাদেরকে তার গাড়িতে তুলে নিলেন। গাড়ি চলতে শুরু করলো তুষারে ঢাকা পথ মাড়িয়ে। (চলবে)

ছবি:গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]