শহর কোথায় ছবির মত বরমচাল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

আমি তখন ক্লাস সেভেন-এ পড়ি। রাজনগর পৌর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। বাবা থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। পরিবারের অভিভাবক আম্মা আর বড় ভাই। এলাকায় থাকলে লেখাপড়া হবে না- এমন ভাবনা-ই তাদের মধ্যে ঢুকে গেল। বাবা চান বাইরে ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করা হোক আমাকে। সিদ্ধান্ত হল কুমিল্লা ইস্পাহানি স্কুলে ভর্তি করা হবে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সিদ্ধান্ত বদল। অনেক দূরের জেলা কুমিল্লায় পাঠালে ঠিকমত খোঁজ খবর রাখা কঠিন হবে। তাই অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত হল আমার খালার বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচালে আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হবে। খালার বাড়ি থেকেই আমি বরমচাল বহুমুখী স্কুলে (বর্তমানে এটি বরমচাল স্কুল এন্ড কলেজ) লেখাপড়া করব।
বরমচাল আমার নানা বাড়িও বটে। যথারীতি আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল বরমচালে। ভর্তি হলাম বরমচাল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই স্কুলে ছেলে-মেয়ে এক সঙ্গেই লেখা পড়া করে। বয়েজ স্কুলে পড়–য়া আমি প্রথমবারের মত নতুন একটা পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হলাম। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমার অনেক বন্ধু বান্ধব জুটলো। আমি, আমার খালাত ভাই হায়াৎ শহীদ শিপন এবং ভাগ্নে মুক্তাদীর আহমেদ মুক্তা একই ক্লাসে এক সঙ্গে পড়ালেখা করছি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম এ মুহিত। ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে বাঘের মত ভয় পায়। প্রথম দেখাতেই আমাকে কাছে টেনে নিলেন।

বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয়

নতুন জায়গা, নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু-বান্ধব। এক কথায় সবই নতুন। শুরু হলো আমার নতুন বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাঠ। বাড়ি ছেড়ে ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন পরিবেশে লেখাপড়ায় মনোযোগ বসাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। বাড়ি থেকে বলা হল কিছু দিন গেলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমিও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলাম। নিজেকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সুযোগ পেলেই একটু আধটু ঘুরে বেড়াতাম।
বরমচাল জায়গাটা একেবারেই গ্রামীণ পরিবেশ। ছবির মত একটা গ্রাম। আমার স্কুলের সামনে ভাঙ্গাচুড়া ইটের গাঁথুনির সড়ক। আর পিছনে সমান্তরাল রেল লাইন। স্কুলের পাশেই বরমচাল রেল স্টেশন। শ্রেনীকক্ষে বসেই দেখতাম ঝিক্ ঝিক্ শব্দে ট্রেনের আসা যাওয়া। আর সুযোগ পেলেই ছুটে যেতাম রেল স্টেশনে। হাঁটতাম রেল লাইন ধরে। স্টেশন লাগোয়া বাজার। তার পাশেই বরমচাল চা বাগান। ছুটে যেতাম সেখানেও। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। আবার কখনও একাকি…। টিফিনের সময় রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে সবচেয়ে ব্যস্ত ইদ্রিস মিয়ার ক্যান্টিনে বসে চা-বিস্কুট পান করা, বন্ধুদের নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা দেয়াসহ নানা রকম দুষ্টুমিতে মেতে থাকা।

ক্যাম্পাসে শহীদমিনার

রেল স্টেশনকে ঘিরে ছোট্ট এই মফস্বল শহরের ব্যস্ততা এখন আর আগের মত নেই। এক সময়ের ব্যস্ত স্টেশন যেখানে লোকাল আর আন্তঃনগর ট্রেন মিলিয়ে দিনে গোটা দশেক ট্রেনের ঝিক্ ঝিক্ শব্দ শুনা যেত সেটিও নাকি এখন আর খুব একটা শোনা যায় না। স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে যে ঘণ্টা শুনা যেতে, এখন সেটিও শোনা যায় না। সময়ের ব্যবধানে ব্যস্ত এই রেল স্টেশনটি মৃতপ্রায়। এই স্টেশনের উপর দিয়ে এখন ট্রেন ছুটে গেলেও স্টেশন চলছে ধুক্ েধুক্।ে তিন দশক আগে এই স্টেশনের যে জৌলুস ছিল সেটিও হারিয়ে গেছে।তবে আজও বঁেচে আছে স্টেশন লাগোয়া বাজার। তার ওপাশে চা বাগান। বাজার থেকে বালুকাময় সরু রাস্তা ধরেই যেতে হয় চা বাগানে। প্রবেশ মুখেই সমতলে দেখা মিলে চা বাগানের। আবার একটু সামনে এগুলেই ছোট ছোট টিলার উপর অপূর্ব সুন্দর চা বাগান এখনও সতেজ আছে।

আজও আছে প্লাটফর্মে সেই চা ষ্টল

বরমচাল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম মাত্র বছর দেড়েক। খালার বাড়িতে কঠিন শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠা আমি সুযোগ পেলেই পুরো বরমচাল এলাকার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। খালার বাড়ির সামনেই ছিল হাওর ‘হাকালুকি’। এটি দেশের সবচেয়ে বড় হাওর। সিলেট এবং মৌলভীবাজারের অন্তত পাঁচটি উপজেলায় বিস্তৃত এই হাওর ঘুরে দেখতে বেড়িয়ে পড়তাম পরিচিতজনদের নৌকায় করে। ভরা বর্ষায় কতদিন সকালে নৌকা নিয়ে গভীর হাওরে ঘুরতে যেতাম। হাওরের বুকে দ্বীপের মত গ্রাম। হাওর জুড়ে মাছ শিকারের উৎসব, রংবেরং এর পাল তোলা শত শত নৌকা- শান্ত, শীতল পরিবেশ। এসব দেখে মন ভাল হয়ে যেত। পুরো দৃশ্যই ছিল একেবারে ছবির মত। তবে এখন আর এই দৃশ্য আগের মত দেখা যায় না। হাওর অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে পলিতে। অনেক এলাকায় হাওরের বুকে তৈরি হয়েছে পাকা সড়ক। নৌকার বদলে হাওরের অনেক এলাকায় এখন সাই সাই করে ছুটে যায় যানবাহন।

রেল ষ্টেশন লাগোয়া চা বাগান

এক সময় যে বরমচাল ছিল একেবারেই শান্ত, সবুজে ঘেরা এক অপরূপ জনপদ। সময়ের ব্যবধানে সেটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। সবুজ এই জনপদের যে বিদ্যালয়টিতে আমি লেখা পড়া করতাম সেটিও এখন মাধ্যমিক স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে রূপ নিয়েছে স্কুল এন্ড কলেজে।বরমচাল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ছিলাম খুবই দুষ্টু এবং চঞ্চল প্রকৃতির। সুযোগ পেলেই নানারকম দুষ্টুমিতে মেতে উঠতাম আমি, শিপন, মুক্তা, হেলাল, শক্তিপদ পাল, আমাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শান্ত এবং গভীর মনোযোগি ছাত্র আবদুল আহাদ, ফয়েজ উদ্দিনসহ আমরা কয়েক বন্ধু। আমাদের দুষ্টুমির সঙ্গী ছিল আনন, শুক্লাসহ আরো কয়েকজন। দুষ্টুমির জন্য শ্রেনী শিক্ষকের কাছে কম পিটুনি খাইনি। এমন কি প্রধান শিক্ষক মুহিত ছাড়ের বেত্রাঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। তবে যতই দুষ্টুমি করি না কেন- লেখাপড়ায কোন কমতি ছিল না আমাদের। বন্ধুদের প্রায় প্রত্যেকেই এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শক্তি ও হেলাল দু’জনেই কলেজ শিক্ষক। বন্ধু আহাদ একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ফয়েজ ব্যারিস্টার। শিপন লন্ডনে আইটি ইঞ্জিনিয়ার। আবার কেউ কেউ আছে দেশের বাইরে।

এখানে শুধু সাইনবোর্ডেই টিকে আছে ষ্টেশনটির নাম

প্রধান শিক্ষক মুহিত স্যার আমাদেরকে যেমন কঠিন শাসন করতেন, ঠিক তেমনি সমানভাবে ভালোবাসতেনও। বরমচাল থেকে চলে আসার বছর কয়েক পর হঠাৎ শুনলাম স্যার সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। সেদিন মনটা ভীষণ খারাপ হয়েছিল। খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে ছিলাম প্রিয় স্যারের নিথর দেহ এক নজর দেখার জন্য। এই বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন যারা আমাদেরকে আপন সন্তানের মত ভালোবাসতেন। গভীর মমতায় আমাদেরকে পড়াতেন। সেই শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আবদুল খালিক, নিলয় চক্রবর্তী, কুমুদ রঞ্জন চৌধুরী উজ্জ্বল, আবদুল মান্নান, আবদুল বাসিত স্যার। এদের মধ্যে এই তো কছিুদনি আগে মারা গেলেন নিলয় স্যার ও উজ্জ্বল স্যার। মান্নান স্যার গত হয়েছেন বছর কয়েক আগে। গণিতের অধ্যাপক হিসেবে বাসিত স্যার আছেন একটি কলেজে। খালিক স্যারও নিজ এলাকায় আছেন। আজও প্রিয় এই স্যারদের ভীষণ মিস করি। তাদের কল্যাণেই আজ এই আমি ইট পাথরের নগরীতে জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত।

সমান্তরাল রেললাইন

আর প্রিয় বিদ্যালয় আজও আপন গতিতে চলছে। পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুর। বেড়েছে এর ব্যপ্তি। আর ছবির মত জনপদ বরমচাল- এক সময় যেটি ছিল একেবারেই শান্ত। ট্রেনের ঝিক্ ঝিক্ শব্দ ছাড়া খুব একটা কোলাহল ছিল না। সময়ের ব্যবধানে সেই জনপদই এখন কোলাহরমূখর ব্যস্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। সুযোগ পেলেই মন ছুটে যেতে চায় সেই জনপদে।

ছবি:লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]