শহর তৈরী হয়, শহর মরে যায়, মানুষের মতো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(টরন্টো থেকে): টরন্টোতে এইবার চরম ঠান্ডাকাল চলছে। মাঝে মাঝে তুষার ঘেরা বাইরের দুনিয়া দেখলে মনে হয় পৃথিবীতে আছি না মঙ্গল গ্রহে!!

বিরক্তি ধরে গেছে। কতোদিন আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায়? বন্ধু-পরিবার নিয়ে তাই ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গিয়েছিলাম কানাডার ছোট্ট শহর Lindsay। শহরের দ্রষ্টব্য Lindsay মেমোরিয়াল পার্ক। পার্কের নাম শুনেই মাথার ভেতর পিন পিন করছিলো। ‘মেমোরিয়াল’ মানে স্মৃতি। কি স্মরন করছে এই পার্ক? কিছু কি হারিয়েছে এই শহর..? একটু ঘাটাঘাটি করতেই বেরিয়ে গেল শত বছরের স্মৃতি। এক সময় জমজমাট রেল জংশন ছিলো এই শহর। দিনে ২০টা-৫০টা ট্রেন এই ষ্টেশনে দম নিতো। কালের বির্বতনে সব হারিয়ে গেছে। রেল লাইন সরে গেছে। শহর ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেছে। মেমোরিয়াল পার্কে তাই একটা পুরনো ট্রেন স্মৃতি হিসাবে রাখা আছে।

কোন এক অজানা কবি লিখেছিলেন,

“Years are many. This road served its past. A piece of our past is gone.”

আমি ঝিম মেরে বসে রইলাম। শহর তৈরী হয়। শহর মরে যায়। মানুষের মতো।

ব্রিটিশ আমলের কথা। কোর্ট-কাচারী, পোষ্ট অফিস, হাসপাতাল, পাকা রাস্তা, পাটের কুঠি, হাই স্কুল, মসজিদ মিলিয়ে আমার নানা বাড়ী পিংনা ছিলো একসময় জমজমাট শহর। ঐতিহাসিক সুবর্ণ বন্দর ছিলো এই পিংনাতেই। নদী পথে কোলকাতার সংগে ব্যবসা চলতো। সরাসরি স্টীমার যোগাযোগও ছিলো। শুনেছি কবি কায়কোবাদ এই পিংনার কোন এক মসজিদে বসে তার বিখ্যাত ‘আযান’ কবিতা লিখেছিলেন।

আমি যে সময় বুঝতে শিখেছি তখন এলাকা মরে গেছে। জগন্নাথগঞ্জ ঘাট তখনো ছিলো। কিন্তু পিংনার সেই বৈভব আর নেই। পিংনা বাজারে তখনো কালের সাক্ষী হয়ে ভঙ্গুর আর জীর্ন শরীর নিয়ে দাড়িয়ে ছিলো সেই আমলের দুই একটা দালান।

আম্মার সংগে চলে যেতাম। শীতে..গ্রীস্মে..বর্ষায়। সরিষাবাড়ী থেকে ট্রেনে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট। তারপর পায়ে হেটে মাইল তিনেক। প্রথমে পিংনা বাজার। বাজার পেরিয়ে বিশাল পুকুর।

পুকুরের এক পাড়ে আমার নানা বাড়ী। আরেক পাড়ে পুরনো ইটের তালুকদার বাড়ী। শান বাঁধানো ঘাট। ধাপে ধাপে নেমে গেছে। আশেপাশের সবুজ গাছ…আর মাথার উপর খোলা আকাশ মিলে পুকুরের জলে কেমন প্রগাঢ় আপন আপন ছায়া।

সেটা পেরিয়ে ছোট্ট এক টুকরো বাঁশ ঝাড়। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সরু পথ। আশে-পাশে নানান ধরনের গাছ। সবগুলো চিনি না। বাতাসে কেমন গন্ধ। মাটির গন্ধ। পাতার গন্ধ। ফুলের গন্ধ। সব কিছু মিলে মিশে কেমন আপন আপন গন্ধ। মায়ের গন্ধ।

বাড়ীতে ঢুকেই আম্মা পাল্টে যেতো। নিজের বাড়ী! এই বাড়ীর মেয়ে সে। নানা বেঁচে নেই। আমি দেখিনি। নানীকে দেখেছি। বয়স হয়ে গেছে। টিনের চারচালা ঘরে থাকতেন। পাশেই রান্না ঘর। সেখানে রান্না চলছে। বাড়ীর ছোট মেয়ে এসেছে! চার ভাই বোনের মধ্যে আম্মাই সবার ছোট।

দুপুরে খাবার শেষে সবাই বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসতো। আম্মার বেশি কাছে যেতাম না। দূরে বসে গল্প শুনতাম। এবাড়ী-সেবাড়ী থেকে কতো মানুষ আসতো। আম্মাকে তখন দূরের মানুষ মনে হতো। একটু ব্যথা অনুভব করতাম কি? হয়তো। কিন্তু তার হাসিমুখ…তার প্রশান্ত মুখ ভালো লাগতো। আমাদের ছয় ভাইবোনের বিশাল সংসার। নানান দায়-দায়িত্বের শিকল ভুলে…আম্মা থাকুক না। থাকুক না কিছুক্ষন এই রকম…।

আমি একা একা বাঁশ-ঝাড়….জংলা গাছ-গাছালীর মধ্যে হাঁটতাম। কোথাও কোথাও গাছ-পালা ঘন হয়ে ঘিরে ধরতো। পেছনের চারচালা ঘর…নিকোনো উঠোন আড়াল হয়ে যেত। মানুষের কথা শোনা যেত না। বাতাসে গাছের পাতা…ডালপালা মিলে শব্দ তৈরী করতো। আমি হাত বাড়িয়ে অদৃশ্য সেই শব্দ ধরতে চাইতাম।

বিকেলের দিকে আম্মা বেড়াতে বেরুতো। আত্মীয়.প্রতিবেশী..বান্ধবী। আমি এইবার পিছু ছাড়তাম না। আম্মা সম্ভবত রেখে যেতে পারলে খুশী হতো। কিন্তু আমি ছাড়তাম না। মুখ শক্ত করে তার পিছু পিছু…। আম্মা বলতো..‘আমার পেট মোছা..তোর জন্য আমার জংগলে গিয়েও শান্তি নাই….’। আমিও আম্মার শেষ সন্তান।

একদিন বেদানা খালার বাসায় গেলাম। ছায়া-ঘেরা টিনের ঘর..উঠোন। জানালার পাশে বসে ছিলাম। জানালার বাইরেই একটা ডালিম গাছ। অনেক ডালিম ধরে আছে। সেই প্রথম আমি ডালিম গাছ দেখলাম। কেউ একজন একটা পাকা ডালিম এনে আমাকে দিলো। সেই ডালিমের রং এখনো মনে আছে। চোখ বন্ধ করে সেই ডালিমের গন্ধ এখনো আমি পাই।

বাসায় ফিরতে ফিরতে অন্ধকার হয়ে যেত। রাজ্যের ভয় এসে ঘিরে ধরতো আমাকে। অন্ধকার গ্রামের পথে আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আম্মার হাত ধরে…গা ঘেষে হাঁটতে চাইতাম। আম্মা বিরক্ত হতো। ‘এতো ভয় কেন তোর?’ আমি আরো শক্ত করে আম্মার হাত ধরতাম।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আম্মার মুখে হারানো পিংনার গল্প শুনতাম। আম্মার মুখ ঝলমল করতো। আমি গল্প বাদ দিয়ে আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক সময় আম্মার গল্প শেষ হতো।

আম্মা কি সেই অজানা কবির মতোই বলতে চাইতো….‘সেই দিন আর নেই’?

একটা দীর্ঘশ্বাস কি শুনতাম? কোন সে হারানো দিনের কথা বলতো আম্মা? তার শৈশবের কথা? নাকি হারানো পিংনার কথা? কোনটা নেই? নাকি দুইটাই নেই? নাকি একটা না থাকলে আরেকটা থাকে না?

হাজারো প্রশ্ন….আমি উত্তর ধরতে পারতাম না। এখনো পারি না।

ছবি: গুগল ও লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]