শহর তোমার মন নাই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ এক উপেক্ষিত শহর যেনো। দিনমান উৎক্ষিপ্ত, চঞ্চল, চাওয়া-পাওয়ার খাতার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া সেই শহরের নিষ্ঠুর অবয়ব ভোজবাজীর মতো যেন পাল্টে গেছে। শহরের ফাঁকা রাস্তা জড়িয়ে গেছে শূন্যতার উৎসবে।এই শহরকে ব্যস্ত করে রাখা, উদ্বিগ্ন করে রাখা, জটিলতার গলিতে হাঁটিয়ে মারা মানুষরা চলে গেছে যে যার শিকড়ের টানে। লম্বা ছুটির আলস্যে শহরের মুক্তি এখন।

জীবনানন্দ দাস কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আকাশ ছড়িয়ে আছে আকাশে আকাশে’। মনে হলো এখন এই শহরটা ছড়িয়ে আছে আকাশে আকাশে। পথের পাশে ছোট দোকানের পশরা, পুলিশের সঙ্গে কানামাছি খেলা, নকল খাবার, লোক ঠকানো, খিস্তি, শেষবার মানুষের সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়া বাজারের তালিকার অসহায়ত্ব, বিশাল দোকানবাড়ির গা বেয়ে নামা গরম, ভিড়ে আটকে যাওয়া যান্ত্রিক বাহনের আর্তচিৎকার করা হর্ন-সব যেন ছুটির কাঁথায় মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে গেছে। শুধু পড়ে আছে কবেকার চেনা এক লাজুক শহর।

সেই শহরের নির্জনতায় ফুটে থাকতো রমনা পার্ক, শীতে নীল হয়ে যেতো রেসের মাঠের ঘাস, সামান্য উত্তেজনাময় রেস্তোরাঁয় ভাসতো চায়ের ঘ্রাণ, আলোড়িত হতো ফুটবল খেলার মাঠ। পথ চলে যেতো রিকশার ক্রিং ক্রিং বেলের সঙ্গে।

এই ঢাকা শহরের কি মন আছে? আছে কোনো ঠিকানা? সেই মন নিয়ে এ শহর কী করে? এ শহরের বেদনা কোথায়, আনন্দ কোথায়? অভিমানে ছত্রখান হয়ে যাওয়ার প্রহর কোথায়? অগুন্তি মানুষের ভিড়ে শহরটাকে আমার কখনো ওয়েস্টার্ন সিনেমার বন্দুকবাজ নায়কের মতো মনে হয়, দু হাতে রিভলবার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানে ওখানে গুলি ছুঁড়ছে, তীব্র রোদের ভেতরে ছুটে চলা এক অশ্বারোহী যেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণ। সেই উর্ধশ্বাসের জীবনে শহরের মনের খবর কে রাখে?

শহর আমাদের নিশ্চয়তা দেয় না, স্বস্তি দেয় না। শহর যেন অচেনা মানুষের মাতৃভূমি।এই লোহার বাসরে ফ্লাইওভারের মুকুট পরে শহর, আকাশ ঢেকে ফেলতে চায় বড় বাড়ি বানিয়ে, কফির দোকানে ঢুকে কিনতে চায় নির্জনতা, বহুতল বাসস্থানের বারান্দায় টব বসিয়ে গড়তে চায় শূন্যতার ব্যাবিলন।

নির্দয় এই শহর! ফুলের কথায় ভোলে না। ভালোবাসার মায়াঞ্জনে মুগ্ধ হয় না। কবিতার ছত্র এই শহরের মুখস্ত নেই, মনে থাকে শুধু প্রতি মুহূর্তের লড়াই। তবু আমরা এই শহরের কাছে চাই, এই শহরের কাছেই ফিরে আসি।শহর লোভ দেখিয়ে কাছে টানে। কাছে টেনে এনে সত্ত্বাকে কেবলই পীড়িত করে। এই শহর ভালোবাসায় তন্ময় হতে জানে না। তবু এই শহরটাকেই আবার ফিরে চাই সবাই।

উপেক্ষিত এক শহর। প্রয়োজনে ব্যবহার করে ফেলে চলে যায় সবাই। লম্বা ছুটিতে দলবেঁধে মানুষের উৎসে ফিরে যাওয়ার বহর দেখেই বোঝা যায় এই শহরকে ভালোবাসে না কেউ। ফাঁকা শহরে কতিপয় অদৃশ্য উদ্বাস্তু অসহায় নাগরিক ছাড়া শহরের সঙ্গী হয় না কেউ। প্রিয়ার গালের তিলের জন্য সমরখন্দ আর বোখারা বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কবি হাফিজ। এই শহরকে কেউ কোনোদিন বিলিয়ে দিতে চাইবে? চাইবে না জানি। তবু মায়া হয় শূন্যতার উৎসবের একমাত্র সঙ্গী এই শহরের জন্য। আচ্ছন্ন গলি, টপকানোর বৃষ্টিভেজা দেয়াল, জানালার শার্শিতে অস্পষ্ট কারো মুখ, বারান্দায় উড়ো চিঠি, বিকেলে জলের ঝরোকা, সারবন্দী কৃষ্ণচূড়া গাছ, ছিলো তো একদিন। এক মুখচোরা শহর কিছুদূর চলেই ফুরিয়ে যেতো, টেলিভিশনের একটা চ্যানেলে বেঁচে থাকতো, সাইকেলের হ্যান্ডেলে বাংলা সাবান ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতো কেউ, বৃষ্টির দিনে চালভাজা পাওয়া যেতো। ছুটির দিনের ফাঁকা শহরে মেঘ করে এলে বৃষ্টির আশায় ভর করে ফেরে পুরনো দিন।শহরটাকে চেনা মনে হয় তখন। ভাবি, কোথায় যাবো আমি তাকে ফেলে, কোন মেঘের দেশে হারিয়ে যাবো? এতো আমার সেই অসহায় শহর। একাকীত্বের মাঝখানে নিজের ক্লান্ত মন ছড়িয়ে বসে আছে কোনো রেলরাস্তার ধারে। তার তো কোথাও পালাবারও পথ নেই। আমাদের উপেক্ষা কুড়িয়ে ছুটির হাওয়ায় দিন যায় শহরের, ঢাকা শহরের।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]