‘শহিদ রাজা’র পূজা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর চৌধুরী

মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার বাৎসরিক আগমনের সময় সমাগত। দেবীকে বরণ করার ও তাঁর আরাধনার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছু দিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র এবং ভারতের আরো কয়েকটি জায়গাতেও, এমনকি বিদেশেও কোথাও কোথাও। করোনা অতিমারীর আবহে উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে এবং প্রয়োজনীয় যাবতীয় বিধিনিষেধকে যথাসম্ভব মান্যতা দিয়ে পূজার আয়োজন কীভাবে করা যাবে সেটাই এখন ছোটবড় সমস্ত পূজার আয়োজকদের মাথাব্যথার প্রধান কারণ। বস্তুত দুর্গাপূজা তো এই বঙ্গে কেবলমাত্র একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বার্ষিক উৎসব নয়, সর্বধর্ম নির্বিশেষে আপামর পশ্চিমবঙ্গনিবাসীর আনন্দোৎসবের একটি উপলক্ষ। এ’বছর হয়তো , হয়তো কেন, নিশ্চয়ই, উৎসবে অংশগ্রহণের ব্যাপকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা অনেকাংশেই সংকুচিত হবে। তবুও অশুভ শক্তিকে পরাভূত করে শুভশক্তিকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার সেরা উৎসব তো এটাই।

কিন্তু আর কয়েক দিনের মধ্যেই যখন এই বাংলার প্রায় সমস্ত সম্প্রদায়ের আবালবৃদ্ধবনিতা উৎসবে মেতে উঠবে, তখন পূর্ব ভারতের অল্প কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা একটি আদিবাসী সম্প্রদায় দুর্গাপূজার দিনগুলি কাটাবে তাদের ‘শহিদ রাজার’ মৃত্যু উপলক্ষে শোক পালন করে। এই সম্প্রদায়ভুক্ত লোকেরা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘অসুর’ নামে এবং নিজেদের বর্ণনা করতে গিয়ে তারা ‘আদিবাসী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মূলনিবাসী’ শব্দটিই বেছে নিতে পছন্দ করে। পৌরাণিক যুগে এক দল আর্য দেবতার নির্দয় আক্রমণে তাদের রাজা ‘মহিষাসুর’ মৃত্যু বরণ করার স্মৃতিতে তারা দুর্গাপূজার সময়ে উৎসবে সামিল হওয়ার বদলে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী হয়ে থাকে। পুরাণের কাহিনী অনুসারে, মহিষরূপী এই প্রাচীন দানব-বংশীয় রাজা কঠোর তপস্যার মাধ্যমে বর লাভ করেছিলেন যে স্বর্গে-মর্ত্যে-পাতালে কোন পুরুষের দ্বারা তাঁর নিধন সম্ভব হবে না। কিন্তু আর্য দেবতারা তাঁকে পরাজিত ও ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। সেজন্য ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এই তিন প্রধান দেবতার নেতৃত্বে অন্যান্য দেবতাদের সমবেত প্রয়াসে সৃষ্টি হয় ‘দশপ্রহরণধারিণী মহাশক্তি’ দেবী দুর্গার। সিংহবাহিনী দশভূজা এই দেবীই ত্রিশূলের আঘাতে নিধন করেন মহিষাসুরকে। মহিষাসুরের অনুগত অসুর সম্প্রদায়ের কিন্তু বিশ্বাস যে ষড়যন্ত্রী দেবতারা অন্যায় যুদ্ধে তাদের রাজাকে হত্যা করেছে। তাই মহিষাসুর তাদের কাছে ‘বীর শহিদ’।

অসুর সম্প্রদায়ের রীতি অনুসারে নরনারী নির্বিশেষে তাদের সমাজের সবাই আশ্বিন মাসের এক পূর্ণিমা তিথিতে সমবেত হয় রাজা মহিষাসুরের অপমুত্যুতে শোক প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে। এটাও এক ধরনের পূজা, যার নাম ‘আশ্বিন পূজা’ বা ‘অসুরপূজা’ এবং অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে দুই পর্যায়ে, প্রথমবার ফাল্গুন মাসে আর তারপর দ্বিতীয়বার আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজার দশম দিনে, অর্থাৎ ‘দশমী’ (বা ‘দশেরা’) তিথিতে। কালক্রমে অসুরপূজার পরম্পরা পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি আদিবাসী গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে যেখানকার বাগদি, সাঁওতাল, মুন্ডা, এমনকি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছেও মহিষাসুরের পরিচয় ‘হুদুর দুর্গা’ নামে, যাকে তারা ‘শহিদ’ জ্ঞানে আরাধনা করে থাকে। এদের অনেকেরই নামের সঙ্গে জোড়া পদবীও ‘অসুর’। দুর্গপূজার নয় বা দশ দিনে এরা দিনের বেলা তেমন কোন কাজকর্ম করা থেকে বিরত থাকে বা বাড়ির ভেতরেই থাকে, কেবল সন্ধ্যার পরই বাইরে বেরোয় তাদের নিজস্ব রীতিনীতি মেনে পূজায় অংশ নেওয়ার জন্য। দুর্গাপূজার নবম দিনে স্ত্রী-পুরুষ মিলে তারা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে নিজেদের মঙ্গলের জন্য।

সমাজকর্মীদের বা সামাজিক সক্রিয়তাবাদীদের পর্যবেক্ষণ হলো যে বছরের পর বছর ধরে অসুরপুজা ক্রমে দলিত-বহুজন আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়ে উঠছে। কয়েক বছর আগে সুষমা অসুর নামে ঝাড়খন্ডের অসুর সম্প্রদায়ের বর্তমান প্রজন্মের প্রতিনিধি একজন সামাজিক সক্রিয়তাবাদী আরো দশ-বারোজন সহকর্মীর সঙ্গে মিলে বেশ কয়েকটি পথসভার আয়োজন করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো বঙ্গীয় সমাজের মূলধারার দুর্গাপূজার পটভূমিতে অসুরপূজা যেন দলিত সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার এবং জনমানসে তাদের বিষয়ে সচেতনতা প্রসারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে পরিগণিত হতে পারে তা নিশ্চিত করা। সুষমার কথায়, অতীতের দিনগুলিতে গ্রামে গ্রামে জমিদারদের উদ্যোগে যখন দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো, তখন তথাকথিত নিম্নবর্ণের ‘দলিত’ সম্প্রদায়ের প্রজারা পূজার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের কাজ করতো বা তাদের দিয়ে ঐসব কাজ করানো হতো। কিন্তু এই প্রজারা পূজা ম-পে ঢুকতো না, বাইরেই থাকতো, এবং পূজার অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সময় হলেই সেখান থেকে চলে যেতো। তাদের রাজা মহিষাসুরের বিনাশকারিণী দেবী দুর্গার পূজায় তারা পরোক্ষভাবেও যোগ দিতো না। দুর্গাপূজাকে উপলক্ষ করে সংগঠিত সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠানে ‘আধুনিক’ অসুররা আজকাল হয়তো যোগ দেয় বা উপস্থিত থাকে, কিন্তু আজও তারা প্রত্যক্ষভাবে পূজায় অংশ নেওয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box