শহুরে বাউল

আশিকুজ্জামান টুলু

কিছু মানুষ শুধুই দিতে আসে, নেয়না কিছু । এদের আসাটা যেমন নিরবে হয়, যাওয়াটাও ঠিক নিরবেই । অনাড়ম্বর এক প্রস্থানে মিলিয়ে যায় বাতাসে । এদের নিয়ে মানুষও তেমন উচ্চবাচ্চ করেনা । এদের তাতে কিচ্ছু আসে যায়ও না, এরা কোন অর্থহীন আড়ম্বরে বিশ্বাসী নয় এবং সেকারনেই থেকে যায় অবহেলিত অথচ এদের অবদান সবচাইতে বেশী থাকে সমাজে ।
লাকি আখন্দ। একজন শহুরে বাউলের নাম। যার রক্তের প্রতিটি অনু পরমানুতে সুর আর সুর । এই সুরের যাদুকর কোন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন কিনা আমার জানা নাই । পেলেও হয়তো মারা যাওয়ার  পর অথবা মৃত্যুশয্যায় । অর্থাৎ এ ধরণের নিজ বলয়ে বিচরনকারী শিল্পীদের মৃত্যু পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হয় পুরস্কারের জন্য। যারা এমন ইন্ট্রোভারটেড শিল্পী, তাদের মৃত্যুই পুরস্কারের যোগ্যতা অর্জন করিয়ে দেয় । এরা মারা যাওয়ার পরই শুরু হয়ে যায় ফেসবুকে ঝড়, টেলিভিশনে কতিপয় মানুষের ‘ওনাকে খুব কাছে থেকে দেখেছি’ জাতীয় ভালোচনা অনুষ্ঠান এবং পরিবারকে লাখ পাচেক অথবা দশেক টাকার চেক প্রদানসহ পত্রিকার জন্য ছবিতোলা ।
লাকি ভাইয়ের সঙ্গে আপমার পরিচয়টা অনেকটা আজগুবি ভাবেই হয়েছিলো । উনার গানের পাগল আমি সেই ১৯৭৭/৭৮ থেকে।উনাকে নামে ও চেহারায় চিনি । টিভিতে দেখেছি । ওইটুকুই। ৮৪/৮৫ এর দিকে একবার হ্যাপি ও লাকি ভাই প্রোগ্রাম করার জন্য টি এস সিতে আসলেন । যতদূর মনে আছে ওটা টোকাই সমিতির প্রোগ্রাম ছিলো । টোকাই সমিতির সভাপতি ফজল আমার বন্ধু হওয়াতে আমাকে বেজ বাজাতে বললো উনাদের সঙ্গে । আমি এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম । তখন ব্যাপারটা ছিলো ‘যেখানে রাইত, সেখানেই কাইত’ টাইপের অর্থাৎ যে যেখানে বাজাতে বলতো, ঝাপায়ে পড়তাম । চিনি বা না চিনি, সেটা বিষয় না, বাজানোটাই বিষয় । সেইরকম একটা অবস্থায় লাকি ভাইয়ের সঙ্গে বাজানোর সুযোগ পেয়ে হাতে চাঁদ পেয়ে গেলাম । হ্যাপি এবং লাকি ভাই উঠলেন গাইতে, ওনারা একের পর এক গান গাইতে থাকলেন এবং আমি টপাটপ সব গান পারফেক্ট কর্ডে বাজিয়ে দিলাম,উনারা আশ্চর্য হয়ে গেলেন এই ভেবে যে কোন প্র্যাক্টিস ছাড়া এই অপরিচিত ছেলে কিভাবে ঠিক কর্ড গুলি বাজিয়ে গেলো । আমাকে খুব আদর করলেন লাকি ভাই এবং বললেন যে আমি খুব ভালো বেজ বাজাই । আমি মনে মনে হাসলাম কারন উনার প্রতিটা গান তখন আমার মুখস্ত, সবসময় গাই সুতরাং কর্ড বহু আগে থেকেই মুখস্ত অর্থাৎ সেদিনের বাজানোটা আমার কোন ক্যারিশমা ছিলোনা । আমি খুব খুশী হয়ে গেলাম আমার প্রিয় কম্পোজারের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাওয়াতে।এই শুরু হলো লাকি ভাই আর হ্যাপির সঙ্গে আমার যোগাযোগ। আর কোনদিন শেষ হয় নাই, শুধু সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতেই থাকলো।আমি খুব সুন্দর করে রক্ষা করে গিয়েছি ওই সম্পর্কটা । ।
লাকি ভাইয়ের কিছু গান, অনেকে হয়তো জানেনা এসব উনার সুরকরা । যেমন, সখি চলনা, সখি চলনা, জলসা ঘরে এবার যাই, আজ এই বৃষ্টির কান্না শুনে, আমায় ডেকোনা, কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে, আগে যদি জানিতাম, কে ঐ যায়রে আলো জ্বেলে ইত্যাদি । উনার গান এই নীল মনিহার শুনেই আমি প্রথম ইন্সপিরেশন পেলাম গান সুর করার এবং আমার জীবনের প্রথম গান সুর করলাম ‘যদি আমায় ডাকো, সেই বিদায় বেলায়, ফিরে আসবো আবার আমি।’ একারনে আমি লাকি ভাইয়ের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ । উনাকেও আমি বলেছি ব্যাপারটা । উনি কেন যেন আমাকে খুব আদর করতেন, আমার সঙ্গে খুব দুষ্টামি করতেন্ আমার জোক খুব পছন্দ করতেন। উনি জানতেন যে আমি ক্রমাগত জোক করতে পছন্দ করি । ওনার একটা বিশাল গুন ছিলো যেটা আমার খুব ভালো লাগতো । সেটা হলো উনি আমাদের ওই সময়ের মিউজিশিয়ান যারা উনার চাইতে জুনিয়র তাদের সঙ্গে খুব সম্মান করে কথা বলতেন। যখন মিউজিক নিয়ে কথা হতো অর্থাৎ সবার  মতামতটাকে অসম্ভব দাম দিতেন। ভালো কাজকে খুব প্রশংসা করতেন। উনার নিজের সুরগুলো খুব খুব রসালো ছিলো, রস চুয়ে চুয়ে পড়তো । শুধুমাত্র একটা গিটার দিয়ে গাইলেও গান শেষে মনে হতো এক থালা মজাদার বিরিয়ানি খেয়ে উঠলাম । মনটা একেবারে টইটম্বুর হয়ে ভরে যেতো ।
আজ এখানে আমি উনার সুর করা একটা গান ‘আজ আছি কাল নেই’ গেয়েছি । এই গানটা শুনলেই আমার কেন যেন কান্না পায় বহুবছর আগে থেকেই । আমি বলতে পারবো না এই গানে কি পরিমান আবেগ লাকি ভাই দিয়েছিলেন সুর করার সময় ।
আমরা ওই সময়ে  সবার সামনেই প্রশংসা করতে পছন্দ করতাম । কিন্তু এখন কেন যেন  মনে হয় বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই প্রশংসা করলেই ভাবে যে কোন একটা স্বার্থের কারনে প্রশংসা করছি । আসলে মোটেই তা নয়, একটা কিছু ভালো লাগলে না বলে থাকতে পারেনা আমাদের প্রজন্মের মিউজিশিয়ানরা । আজও আমাদের বয়সী সবাই কোন একটা ভালো কাজ আমাদের মধ্যে যখন কেউ করে, অন্যজন সেটার প্রেইজ করে এবং আমরা সেটাকে কমপ্লিমেন্ট হিসাবে নেই । একবারের জন্যেও মনে আসে না ‘নিশ্চয়ই কোন স্বার্থ আছে।’
ঠিক লাকি ভাইয়ের সমান কিংবা তার চাইতে কিছুটা বেশী ট্যালেন্টেড হ্যাপি । হ্যাপির সুরে গান ‘আবার এলো যে সন্ধ্য’, ‘কে বাশি বাজায় রে’,। উনারা দুজনেই জাতশিল্পী ছিলেন অর্থাৎ ম্যাটেরিয়ালিস্টিক লাইফের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিলোনা, শুধু গান আর গান । একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটা রেকর্ডিঙে হ্যাপির অর্গান বাজানোর কথা । আমি অ্যাকস্টিক বাজাচ্ছি ওখানে । রেকর্ডিং সন্ধ্যা ৭ টা থেকে । হ্যাপি আসেনা, আমরা ওয়েট করছি । অবশেষে আমরা সাড়ে আঁটটায় শুরু করে দিলাম ওকে ছাড়াই । ও ঠিক সাড়ে নয়টায় এলো । এসেই বাচ্চাদের মতো একটু হাসলো, মিউজিক ডিরেক্টরকে বিভিন্ন ছুতা দেখালো কেন আসতে পারে নাই, মিউজিক ডিরেক্টর বললো,আচ্ছা বুঝছি, ‘বসো তাড়াতাড়ি, বাজাও ।’
ও একবার শুনলো গানটা এবং একটা প্রিলিউড বানিয়ে বাজালো ওখানেই এবং ওই মুহূর্তেই । আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম ওর বানানো প্রিলিউড শুনে । মিউজিক ডিরেক্টর আমাদের তৈরি করা প্রিলিউড বাদ দিয়ে ওরটা ফাইনাল করে দিলেন । আহা কি বাজালো, আঙ্গুল দিয়ে মধু ঝরে ঝরে পড়তে থাকলো, আমরা শুনে পাগল হয়ে গেলাম প্রিলিউডটা । একেই বলে শিল্পী, শিল্পী মানেই অনেকটা এলোমেলো । এলোমেলোরাই বেশী ট্যালেন্টেড হয় ।তাদের খাওয়া দাওয়ার ঠিক নাই, শুধু গান আর গান । ঠিক আমাদের হ্যাপি যেমন । আগা নাই মাথা নাই, বন বন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনো সময় টি এস সি তো কোনো সময় হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকানের সামনে গিটার নিয়ে গান গাচ্ছে । কে শুনছে আর কে শুনছে না, ওর তাতে কিচ্ছু আসে যায় না, এক কাপ চা পেলেই জুড়ে দিলো গান । আর সেই গান শুনে এমন কোন মানুষ জন্মায় নাই যে তার ভালো লাগবেনা। ওই মাঠের মাঝখানে বসে, যেখানে না আছে কোন ইন্সট্রুমেন্ট, না আছে মাইক । আসলে হ্যাপিও ছিলো আরেক শহুরে বাউল। এদের কিচ্ছু লাগতো না শুধু এক কাপ চা আর একটা সিগারেট ছাড়া ।
আজ সব কিছু শুধু গল্প হয়ে গেছে, ইতিহাস হয়ে গেছে অথচ এরা একসময় বিরাজ করেছে সিংহের মতো। কোনদিন মিউজিক্যালি কোন কম্প্রোমাইজ করে নাই। কারো কাছে ছোট হয় নাই কোন পুরস্কার বা অন্যকিছুর জন্য । এরা বাঘের মতো মিউজিক করে গেছে, কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে সারা বাংলাদেশ । আজও যেকোনো জমজমাট অনুষ্ঠানে একবার শুধু গেয়ে দেখেন ‘এই নীল মনিহার’, দেখবেন এক সেকেন্ডের মধ্যে সারা অডিয়েন্স কিভাবে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সম্মোহিত হয়ে যায়। কিভাবে থেমে যায় সময়। কিভাবে নীরবতা গ্রাস করে অস্থিরতাকে। কিভাবে মানুষ হারিয়ে যায় সুরের ইন্দ্রজালে। কিভাবে ওই বোহেমিয়ান মিউজিশিয়ানরা মনের মধ্যে গর্ত করে ঢুকে যায় মুহূর্তের মধ্যে । আসলে আমি জানিনা, এরা কি মিউজিশিয়ান? না অন্যকিছু? যাদের পকেটে একটা টাকা না থাকলেও বোঝা যেতোনা, মুখে ভুবন ভুলানো হাসিটা সবসময় ঝুলতে থাকতো আর এক মুহূর্ত দেরি না করে শুরু করে দিতো ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা, শুধু দুজনে’।

ছবি: গুগল