শিউলিকথন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

ফারহানা ফিরু

কী ঘটনা আপনার বলুন তো? রোজ রোজ আমার পেছন পেছন আসেন যে? কী ব্যাপার?  সমস্যা কী? আবার হাতে পলিথিন ভরা শিউলি ফুল! পেয়েছেন কী? বলুন তো কী বলতে চান?  বলুন?

হঠাৎ করে ছেলেটি থতমত খেয়ে যায় মেয়েটির এই অচমকা কড়া কথাতে। ছেলেটি ঝিমিয়ে পরা পাতার মতো মুহুর্তেই নরম হয়ে মুখটা কাচুমাচু করে ফেলে। কিছুক্ষণ উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে মেয়েটি ‘অসহ্য’ বলে আবার তার গন্তব্যের পথে হাঁটতে শুরু করে হনহন করে।

জেবুন ক্লাস টেন এ পড়ে। জামালউদ্দিন স্যার এর কাছে প্রাইভেট পড়তে যায় শনি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টায়। ওদের এলাকায় একটা বড় মাঠ আছে, সেটার কোনাকুনি  হেঁটে মাঠ পার হয়ে বড় রাস্তার ওপারেই জামাল উদ্দীন স্যার এর বাসা। বড় মাঠের এক কোনে একটা চা, পুরির ছোট টং দোকান আছে। প্রায় ১০/১২ দিন ধরে জেবুন খেয়াল করছে ২২/২৩ বছরের একটা ছেলে রোজ তার পিছু পিছু স্যার এর বাসা পর্যন্ত আসে। হাতে ছোট একটা পলিথিনে শিউলি ফুলও থাকে।

কয়েকদিন ধরে সন্দেহ হওয়ায় ভয় ভয় করেও ছেলেটিকে জেবুন সেদিন সাহস করে রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলো কেন সে এটা করছে? কী চায়? কী বলতে চায়? ছেলেটা কিন্তু আবার কখনই জেবুনকে কোনও কথা, টিজ, বা কোনও বিরক্তিকর কাজ করতো না। কেবলই জেবুনের পেছন পেছন যেতো বড় মাঠের এক কোনা থেকে জামাল উদ্দীন স্যার এর বাসা পর্যন্ত। এইটুকুই।

এরপর দিনও ওই একই ঘটনা হলো। জেবুন ভেবেছিলো ছেলেটি বোধ হয় আর এমন করবেনা। কিন্তু তা হোলোনা। একহাতে শিউলি নিয়ে সে ঠিকই জেবুনের পেছন পেছন গেলো। জেবুন বিরক্ত হলো ঠিকই কিন্তু কিছু বললো না। ভাবলো, কাল যদি আসে তো আরো ইচ্ছে মতন অপমান করবে।

পরদিন ঠিকই ছেলেটি আবারো পূর্বের মতই জেবুনের পিছু পিছু আসা শুরু করলেই জেবুন পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে সোজা ছেলেটির চোখ বরাবর তাকিয়ে জোরে জোরে বকা ঝকা শুরু করলো অনেক্ষন। তারপর বললো, আগামী কাল সে তার বাবা আর ভাইকে সঙ্গে আনবে৷ আগামিকাল যদি তাকে দেখা যায় জেবুনের পিছনে তো সে লাঠি পিটা খাবে। সাবধান করে দিলো সে ছেলেটিকে।

পরদিন জেবুন তার ভাইকে নিয়ে এলো। মাঠের কোনায় দেখে ছেলেটি নেই। খুঁজলো, পেলোনা। পরের দিনও এলো জেবুন তার ভাইসহ, পরেরদিনও ছেলেটিকে পাওয়াই গেলো না। এরপর থেকে জেবুন একাই প্রাইভেটে যাওয়া শুরু করলো। কিন্তু বড় মাঠের কোনে এলেই চোখ যেনো তার ওই টং চা এর দোকানে চলে যেতো। খুঁজতো ছেলেটাকে। দিন যায় কিন্তু মন থেকে ছেলেটার কথা,তার  পিছু পিছু যাওয়া এগুলো জেবুন ভুলতে পারেনা। ঘুরে ফিরেই মনে পরে।

একদিন জেবুন কী মনে করে  মাঠের কোনের টং দোকানে গিয়ে চা বানানো মামাকে জিজ্ঞেস করে সেই ছেলেটার কথা। মামা চিনতে পারেনি। পরে জেবুন বর্ণনা দেয়। বলে  ছেলেটি ৭/৮ দিন আগে রোজ সকাল ৬ টার দিকে এখান থেকে চা খেয়ে এক প্লাস্টিক ভরা শিউলি ফুল নিয়ে তার পেছন পেছন যেতো। এটা শুনেই দোকানের পাশে ১২/১৩ বছরের ছোট এক ছেলে ঐ ছেলেটিকে চিনতে পেরে বলে, ও আচ্ছা, ইমরান ভাই। বুজ্জি আপা, হাতে সকালে এক পেলাস্টিক শিউলি ফুল দেখতেন, না? হ্যায় না? হ্যায় তো বহিরা আপা, কালা, কানে হুনে না, বড় রাস্তার ঐ পাড়ে বড় গওসিয়া হুটেলে কাম করে, হুটেল যাওনের পথে এক বাড়িত হ্যার ছুডু বুন আঁখি থাহে,  হ্যায় আবার চুক্কে দ্যাহেনা, হ্যার বাপ বাড়ির মালিকের জমিত কামলা খাটে, হ্যার লাইগা বেটিরে এইহানে কুনো রকম থাকতে দিসে আর কী! আঁখি শিউলি ফুল খুউপ ভালোবাসে তো, তাই আংগো দুকানের পিছ থেকে এত্তগুলা শিউলি রোজ কুড়ায়া হ্যার বুনরে দিয়া গওসিয়া হুটেলে কাম করতে যাইতো। আপনেরে দেইখা বুজতো, অকন তার হুটেলে যাওনের টাইম অইসে, তাই আপনের পিছে যাইত, সামনে দি যাইতে ডর লাগত হ্যার। খুউপ ভালা আছিলো আপা ইমরান ভাই, তার শখ অনেক ট্যাকা জমাইবো হ্যায়,  তারপর বুনের চুখ অপারেশন করবো। কিন্তু কয়েকদিন আগে কী যে হইলো আপা, হ্যার বুনডার কী এক কালা জ্বর আইলো, দুইদিনেই মইরা গেলো। হায়রে মাইনষের জীবন! ইমরান ভাই ও চাকরি ছাইড়া গ্রামের বাড়িত চইলা গেলো।

কথাগুলো শুনে জেবুনের মাথা পুরাই চক্কর খেয়ে উঠলো। কিছু বলতে পারলো না। থ মেরে কিছুক্ষন বসেই রইল টুলটাতে। কিছুক্ষন পর দোকানের পিছে গিয়ে দেখে শিউলি ফুলের চাদর বিছানো। ঘোরের বানে সে শিউলি কুড়ানো শুরু করলো। তারপর ওগুলো হাতে নিয়ে কী যেনো ভাবতে ভাবতে জামাল উদ্দীন স্যার এর বাসা পর্যন্ত চলে এলো। ওর অন্যান্য বান্ধবিরা ওকে দেখে বলছে, কী রে জেবুন? কাঁদছিস কেন? হাতে শিউলি ফুল! কি হয়েছে তোর? কেউ কিছু বলেছে? কী হয়েছে বল?

জেবুন কিছুই বলতে পারেনা,  কেবলই কেঁদেই যায় আর কেঁদেই যায়। হু হু করে।

টানা সাত বছর ধরে জেবুন এখন রোজ শিউলি ফুল কুড়াতে যায়। তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আঁখিকে নিয়েও পুরো শিউলী সিজনে শিউলী কুড়াতে মিস করেনা সে। ভোরে শিউলি কুড়োনো ওদের জীবনের নিয়মিত অংশ হয়ে গিয়েছে। শিউলি কুড়োনোর মাঝেই জেবুন বাঁচিয়ে রাখে তার মনে ইমরান আর আঁখিকে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]