শিরোনামে শিবরাম…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘এই বইয়ের স্বত্ত্ব তোমাকে দিলুম’।শোনা যায় এরকম একটা লাইন লেখা চিরকুট নিয়ে প্রায়ই নাকি শিবরাম চক্রবর্তীর বিভিন্ন লতায়-পাতায় আত্মীয়রা উপস্থিত হতেন প্রকাশকদের দরজায়। তাদের দাবি ছিলো বইয়ের রয়্যালটি। এরকম দাবিদারদের উৎপাতে শিবরামের আত্মজীবনী ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ বইটির দ্বিতীয় খণ্ড আর প্রকাশ করতে পারেনি পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা আনন্দবাজার। অসংখ্য উত্তরাধিকারীদের উৎপাতে পরে বইটি দিয়ে দেয়া হয় নবপত্র প্রকাশনাকে।

কিন্তু এত আত্মীয়স্বজন থাকার পরেও ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট শিবরাম চক্রবর্তীর নিথর দেহ বেওয়ারিশ ভেবে চালান হয়ে যায় হাসপাতালের মর্গে।

এখানেই থাকতেন শিবরাম

হাসির গল্পের ফোয়ারা ছিলেন যিনি তার জীবনের শেষদৃশ্য ছিলো এমনই। মৃত্যুর সময় কেউ কাছে ছিলো না এই মানুষটির। সব হাসি নিভিয়ে নিঃশব্দে মহাকালের পথ ধরেছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। গত ২৮ আগস্ট ছিলো তাঁর ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো বাংলা সাহিত্যের এক এবং অদ্বিতীয় হাসির গল্পের লেখক শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে ‘শিরোনামে শিবরাম’।

শিবরাম চক্রবর্তীর মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান গৌরাঙ্গপ্রসাদ বসু ও বাদল বসু। এই গৌরাঙ্গপ্রসাদের বোন ছিলেন তথনকার বাংলা সিনেমার প্রখ্যাত অভিনেত্রী কাবেরী বসু। তিনি শিবরাম চক্রবর্তীকে প্রতি বছর নিয়ম করে ভাইফোঁটা দিতেন। বাদল বসু ছিলেন আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক। এরা দু’জন যখন হাসপাতালে পৌঁছান তখন দেরি হয়ে গেছে। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে শিবরামের মরদেহ চালান হয়ে গেছে মর্গে। তারা ছুটলেন সেখানে। কিন্তু সহজে লাশ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। শবাগারের কর্মী তাদের একটার পর একটা ড্রয়ার টেনে লাশ দেখালো। শেষে একটি ড্রয়ার থেকে উঁকি দিলো শিবরাম চক্রবর্তীর নিথর শরীর। যারা খুঁজতে গিয়েছিলেন তাদের ভাষ্যে জানা যায়, মৃত্যুর পরেও চক্রবর্তী মহাশয়ের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি লেগেছিলো।

চিরকুমার ছিলেন শিবরাম। তাঁর একা এক মেসে কাটানো জীবনের কথা তাঁর পাঠক মাত্রই জানেন। কেনো বিয়ে করেননি এই প্রশ্নটা বরাবরই এড়িয়ে যেতেন শিবরাম চক্রবর্তী। মৃদু হেসে অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করতেন। তাঁর ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ বইতে রিনি নামে এক কিশোরী বান্ধবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। মেয়েটির সঙ্গে তাঁর ভাষায়-রোমাঞ্চকর রোমান্সের ইতিবৃত প্রকাশও করেছেন। সেই রিনি-ই কি তাঁর মানসী ছিলেন কিনা তা নিয়ে আর কিছু বলেননি শিবরাম। হয়তো তার অপেক্ষাতেই হারিয়ে গেছে মাস, বছর। নিষ্ফল সেই অন্তহীন অপেক্ষা। শেষে একটি  এপিটাফে মেলে তাঁর ভালোবাসার আর্তি-

সেদিন আসিয়ো মোরি কবরের কাছে

যে তোমারে পায় নাই, সে হেথায় আছে

ক্ষণিকের তরে সখি, বেসো তারে ভালো।

ঘরের দেয়ালে শিবরামের লেখা ফোন নম্বর

নানা ঘটনায় রোমাঞ্চকর ছিলো শিবরাম চক্রবর্তীর জীবন। চাঁচোলের অভিজাত রাজ পরিবারে জন্ম, ভবিষ্যতে রাজা হওয়ার স্বপ্ন। আইনের মারপ্যাঁচে ঘটে ছন্দপতন। তারপর বাড়ি থেকে পলায়ন, স্বদেশী আন্দোলনে মেতে ওঠা, কয়েকবার জেলখানার অতিথি হওয়া, চুটিয়ে রোমান্স, খবরের কাগজের হকারি, দাতব্য প্রতিষ্ঠানে খাবারের ব্যবস্থা, সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক, ফুটপাতে ইঁট মাথার নিচে দিয়ে সুখে নিদ্রা যাওয়া-জীবন এই মানুষটিকে কত বিচিত্র পথে চালনা করেছিলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

কিন্তু জীবনের শেষদৃশ্যে অনেকটাই পাল্টে গিয়েছিলেন এই আনন্দিত মানুষটি। এক সম্পর্কিত ভাগ্নে আর তার স্ত্রী‘র দেখাশোনায় জীবন কাটতো তার। তখন কেমন উদাস আর গম্ভীর দেখাতো শিবরাম চক্রবর্তীকে। শরীরও অসুস্থ হতে থাকে। কেউ কেমন আছেন জানতে চাইলে বেশিরভাগ সময় বলতেন-‘ভালো আছি, ফাস কেলাস আছি।’ বলতেন ট্যাকসির কথা। নিজের নিজের জিনিসপত্র সব বাঁধা হয়ে গেছে। একটা ট্যাক্সির অপেক্ষায় বসে আছেন। সে ট্যাক্সি হয়তো মৃত্যুর গাড়ি। যেন তাঁকে শেষ গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।

শিবরাম চক্রবর্তীর আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে তখন দৈনিক আনন্দ;বাজার পত্রিকায় প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছিলো। সরকারী সহায়তাও তখন জুটেছিলো তাঁর। কিন্তু তখন সেই টাকায় যথাযথ খাবার আর সামান্য আরাম তার জুটেছিলো কিনা তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে।

সার্কাসের ক্লাউন চরিত্রটি তাঁর খুব প্রিয় ছিলো। নিজেকে ক্লাউন বলতে ভালোবাসতেন। একটা লেখায় লিখেছিলেন-‘‘সার্কাসের ক্লাউন সব খেলা জানে। সব খেলাই পারে। কিন্তু পারতে গিয়ে কোথায় কী যে হয়ে যায়, খেলাটার হাসিল হয় না। হাসির হয়ে ওঠে। আর হাসির হলেই তার খেলা হাসিল হয়’’।

চিরকাল নিজেকে নিয়ে এক ধরণের ব্যাঙ্গ করে গেছেন। কিন্তু তার আড়ালে সমাজের অসঙ্গতির পিঠেও চাবুক বসিয়েছে তাঁর কলম। ছোটদের জন্য কেনো লেখেন জানতে চাইলে বলতেন, আমার ধারণা, আমার লেখা বড়দের মতো হয় না। এক পুলিশের গোয়েন্দা অফিসার একবার শিবরাম চক্রবর্তীকে অনুসরণ করা এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার নির্দেশ পেলেন। তখন শিবরামের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনকারীদের গভীর যোগাযোগ।সেই গোয়েন্দার সঙ্গে শিবরাম নিজেই আলাপ করেছিলেন। গোয়েন্দার জবানীতে জানা যায়, পরিচয়ের এক পর্যায়ে তিনি শিবরামের লেখার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনার লেখা আমি পড়েছি। খুব সুন্দর।’ উত্তরে শিবরাম বলেছিলেন, ‘আমি সুন্দর লিখি। কিন্তু আমি সুন্দরী লিখি না। তাই অর্থকষ্টে ভুগি।’

জীবনের প্রায় শেষ সময়ে একটি সংস্থা তাঁকে সংবর্ধনা দিতে নিয়ে যায়।

সেখানে লিখিত ভাষণে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন শিবরাম এভাবে-

আজ জীবনের অন্তিম তীরে পৌঁছে তাদের সবাইকে-যারা এখন বালক, একদা বালক ছিলো এবং পরেও আসবে যারা-তাদের সবাইকেই, আর দেশের সব কিশোর-কিশোরীকেই সস্নেহ আমার সাদর নমস্কার, আমার শেষ নমস্কার জানিয়ে সন্তর্পণে বিদায় নিতে চাই।

তাদের জন্য, এবার সবার জন্যই সত্যিকারের বড় বড় লেখক এসেছেন, আসছেন এবং আসবেন আরো আরো-তাঁদের মহাসমারোহে সবার অগোচরে অম্লানবদনে নিঃশব্দে টুপ করে তলিয়ে যেতে পারলেই নিজেকে ধন্য জ্ঞান করবো।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ শিবরাম স্মৃতি, ফিচার
ছবিঃ গুগল, শিবরাম স্মৃতি

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]