শিলং-গৌহাটি আর করিমগঞ্জ-আসামের টানে

সাব্বিরুল হক

আগের দিনের কাগজপত্রে লেখা দেখতাম আসাম ডিভিশন;দাদার আমলে সিলেটের জায়গাজমির কথা বলছি, অবাক লাগত এই ভেবে যে, খুব অতীতের না – ১৯৪৭ সালে সিলেট রেফারেন্ডামের আগে-আমরা সিলেটে থাকলেও ছিলাম আসাম বিভাগের বসবাসকারী!

করিমগঞ্জ হয়ে আসামে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেটা ছোটবেলা থেকে কাজ করেছে,তবে যেতে-যেতে দেরি হয়ে গেছে অনেক বছর যেন পথেই; ওপারে করিমগঞ্জ, এপারে জকিগঞ্জ, মাঝখানে কুশিয়ারা নদী। উপমহাদেশ ভাগাভাগির পর এপার-ওপার যাওয়া আসা বন্ধ হয়ে গেল অবাধে। করিমগঞ্জ এখন আসামের আর জকিগঞ্জ তো বাংলাদেশে। আসামের প্রতি দুর্বলতা বহু বছর, তাই সেখানকার অনেক শহর ঘুরে দেখতে ভ্রমণ করা।

কুড়িগ্রামের রৌমারিতে এসে শুনলাম, এখান থেকে আসামের ধুবড়ি বেশি দূরে নয়, ব্রহ্মপুত্রের ওপারেই, এই ধুবড়ির দক্ষিণ দিক থেকে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র চলে গেছে গোয়ালপাড়া হয়ে গৌহাটির দিকে।

রৌমারির ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বসে আছি। সহযাত্রী জানাল, দাঁতভাঙ্গায় গেলে খুব কাছ থেকে আসামের ধুবড়ি জেলা দেখা যাবে।

পরদিন ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে এলাম ধুবড়িতে, সাজানো-গোছানো সুন্দর শহর; উঠেছিলাম বন্ধুর বোনের বাসায়। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হলে বন্ধুর বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজন ধুবড়িতেই থেকে যান। তার মুখেই শুনলাম কাহিনী, স্মৃতিবিজড়িত ধুবড়ি কি আর ছাড়া যায়! তাই থেকে গেলাম ধুবড়িতে। শহরটা ঘুরে দেখার সময় মনে হলো, এ যেন আরেক রংপুর শহর, রংপুরের সঙ্গে হুবহু এক।

আসামের ধুবড়ি শহর দেখার সময় স্থানীয় এক কলেজছাত্রের সঙ্গে পরিচয় হল, জানালেন, প্রাকৃতিক সম্পদেও আসাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দখল করে আছে। কয়লা, চুনাপাথর, পেট্রল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সিমেন্ট ছাড়াও এই আসাম বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ। ধুবড়ি থেকে শুরু করে ডিব্রুগড় পর্যন্ত আসামের বিস্তৃতি আসাম হলো বাংলা ছবির কিংবদন্তির নায়ক-পরিচালক প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়ার দেশ। আর প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকা আসামের গর্ব। তার গাওয়া ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘মেঘ থম থম করে’, ‘গঙ্গা আমার মা’—এসব গান তো শুধু আমাদের প্রিয় নয়, আপনাদেরও তাই না?’ কথাগুলো শুনে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়

ভাবলাম, আসামের ২৭টি জেলা শহর ঘুরে দেখতে পারলে তো ভালোই হয়। ধুবড়ি, কোকরাঝোর, বঙ্গাই গাঁও, বরপেঠা, নলবারি, গৌহাটি, মঙ্গল দৈ, তেজপুর, মরিগাঁও, নগাঁও, উত্তর লখিমপুর, ধেমাজি, ডিব্রুগড়, তিন সুকিয়া, শিবসাগর, জোড়হাট, গোলাঘাট, ডিমাপুর, ডিফু, হাফলং, শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, কামরূপ কামাখ্যা, দিসপুর-এ সবই তো জেলা শহর। ধুবড়ি দেখার পর নদীপথে লঞ্চে এলাম গোয়ালপাড়ার দিকে। এখানে কৃষ্ণ নামের এক আবাসিক হোটেলে উঠলাম। গোয়ালপাড়া এসেই বুঝলাম, দৃষ্টিনন্দন আসামের কারুশিল্প এবং কত সুন্দর এখানকার শিল্পীরা। লোকশিল্পের আখ্যান তুলে ধরেছেন শিল্পীরা, তাদের হাতের জাদুতে। জিপসি রমণীদের সূচিশিল্প নজর কাড়ে পর্যটকদের। আর আছে পিতলের নানা সম্ভার, রূপার ঝালরের কারুকাজ, নানা আভরণ, বাঁশ-বেতের নানা কিছু, চিত্রকলা, পাথরের দেবদেবী, হাতির দাঁত ও মোষের শিঙের নানা সম্ভার। এসব দেখে এলাম ব্রহ্মপুত্রের তীরে। এখানেই কিন্তু বাংলার পাঁচ মুড়ারই তুল্য পোড়ামাটি ও শোলায় পৌরাণিক আখ্যান রূপ পেয়েছে। এই গোয়ালপাড়াতেই বসন্তে দোল উৎসব বেশ জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়।

এক কৃষকের সঙ্গে পরিচয় হলো তার কাছে শুনলাম, চৈত্রসংক্রান্তিতে তিন দিন ধরে ফসল বোনার উৎসব বোহাগ বা রঙালি চলে আসামের গাঁও-গেরামে। ফসল কাটার উৎসব চলে আশ্বিনে। এই উৎসবকে বলা হয় বাঙালি বা মাটি বিল্ব; আশ্বিন-সংক্রান্তিতে শুরু হয়ে চলে কার্তিকজুড়ে। তাই একে কার্তিক বিহুও বলা হয়। আর ফসল তোলার ভোগালি বা মাঘ বিহু চলে আশ্বিন-সংক্রান্তিতে দুই দিন ধরে, গোটা আসামে।

কৃষকের মুখেই শুনলাম, তার নাম প্রমথ হাজারিকা। অনুশোচনার স্বরে তিনি বললেন, জানেন, যখন শুনি ‘মানুষ মানুষের জন্য…’ তখন মনে হয় এ গানের কথা মিথ্যে-মিথ্যে। এ জমানায় মানুষ কি আর মানুষের জন্য হয়! তাই যদি হতো, তাহলে মানুষে মানুষে এত হানাহানি কেন! কেন মানুষ মানুষকে হত্যা করে! কৃষক প্রমথ হাজারিকা তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। একটা চৌকিতে বসতে দিয়ে বললেন, ‘বসুন, আসছি।’ একটু পর এক ছেলে ট্রেতে কয়েক ধরনের পিঠা এনে রাখলো। বললো, ‘এখানে সন্তোষি, রূপসী, নির্মলা নামের পিঠা আছে। খান, মজা পাবেন।’

একটা পিঠা মুখে নিয়ে বললাম, ‘বাহ্! বেশ মজা তো!’

প্রমথ হাজারিকা এসেই বললেন, এই নিখিল আমার সম্পর্কে শ্যালক। স্ত্রীর কোনো ছেলেপুলে হলো না বলেই ওকে রেখে দিয়েছি। জানেন, স্ত্রী অনিতাকে নিয়ে বহু ঠাকুরের কাছে গিয়েছি, কোনো কাজ হয়নি।

গোয়ালপাড়ার ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জেলেদের বসবাস। ওখানে এসে চমকে গেলাম। ডালাভর্তি কত না মাছ! দেখে তো অবাক! এক জেলে বলল, ‘বাবু, জেলেপাড়ায় আজ গানের আসর বসেছে। চলুন, দেখে আসবেন।’ ঢুকতেই কানে ভেসে এলো ‘ভোট দিয়ে যা, আয় ভোটার আয়, মাছ কুটলে মুড়ো দিব/ গাই বিয়োলে দুধ দিব/ মিটিংয়ে যাব না/ অবসর পাব না/ কোনো কাজে লাগব না/ যদুর কপালে আমার ভোট দিয়ে যা…।’ গানের এ কথার সঙ্গে জেলেদের নৃত্য দেখে দু’চোখ সার্থক হলো।

ব্রহ্মপুত্র নদে নৌবিহার করার জন্য মনটা এবার চঞ্চল হয়ে উঠলো। এক নৌকাচালককে বললাম, ব্রহ্মপুত্র ঘুরে দেখতে চাই, দু’ঘণ্টায় কত নেবে? বললো, ‘দুইশ’ টাকা দিলেই চলবে।’

দু’নয়ন ভরে দেখে যাচ্ছি অপরূপ ব্রহ্মপুত্রকে। জল থৈ থৈ করছে। আকাশে তাকিয়ে দেখি — না, মেঘ তো থম থম করে না। তুফান হবে না, ভয় কিসের? ভাবলাম, সব জল কি এই আসামের এই ব্রহ্মপুত্রের? তাহলে আমাদের দেশের ব্রহ্মপুত্রের জল কোথায় গেল! ওরা কি কোথাও বাঁধ দিয়ে জলকে আটকে রেখেছে? এজন্যই কি বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্রে জলের এতটা অভাব! নৌকাচালককে এসব কথা বলতেই একটু হেসে বললেন, ‘তাই হয়তো হবে।’

পরদিন এসে পৌঁছালাম গৌহাটিতে। এর পাশেই দিসপুর শহর। সেখানে গড়ে উঠেছে আসামের রাজধানী। আগে তো রাজধানী ছিল গৌহাটিতে। অতীতের প্রাগজ্যোতিষপুর হয়েছে গৌহাটি শহর। গুয়া অর্থ সুপারি আর হাটি হচ্ছে হাট, অর্থাৎ সুপারির হাট ‘গৌহাটি’। আসাম কেন সারা উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বারও এই গৌহাটি। আগেও এই শহরে এসেছি। এবারও চেনা শহরকে দেখে একটু বেশি উৎফুল্ল হলাম। দিন চলে গেলে তো আসামের গৌহাটি ভ্রমণ শেষ হয়ে যাবে! ভাবলাম, দিনটা কি ধরে রাখা যায় না!

ভালো করেই জানতাম, ব্রহ্মার পুত্র দামাল নদ ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে ৫৫ মিটার উঁচুতে গড়ে উঠেছে শহর। সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক শহর হিসেবেও পূর্ব ভারতে খ্যাতি আছে গৌহাটির। অতি দ্রুত আধুনিক সাজে প্রসার পেয়েছে এই শহরটি। সব ধর্মের—শৈব, বৈষ্ণব, তন্ত্র (শাক্ত), বৌদ্ধ, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের সহাবস্থান ঘটেছে আসামের গৌহাটিতে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে আসাম ট্যুরিস্ট লজে উঠেছিলাম। দেখলাম, লোকজনের তেমন একটা ভিড়ভাট্টা নেই। রাস্তার একপাশে লেখা আছে—গৌহাটি থেকে সড়ক দূরত্ব : কাজিরাঙ্গা-২১৭ কিমি, ডিব্রুগড় ৪৪৫ কিমি, শিবসাগর ৩৬৯ কিমি, মানস ১৭৬ কিমি, ওরাং ১৪০ কিমি, লামডিং ২২১ কিমি, হাফলং ৩৫৫ কিমি, ডিফু ২৬৯ কিমি, দিরং ১০০ কিমি, শিলচর ৩৯৮ কিমি, আগরতলা ৫৯৭ কিমি, ডিমাপুর ২৮০ কিমি, নগাঁও ১২০ কিমি, তেজপুর ১৮১ কিমি, উত্তর লখিমপুর ৪১৫ কিমি, শিলং ১০৩ কিমি, দার্জিলিং ৫৮৭ কিমি, গ্যাংটক ৩২৪ কিমি, কলকাতা ১১৬৪ কিমি, দিল্লি ২১৬০ কিমি।

গৌহাটিতে দু’দিন থাকার পরে এবার চললাম জোড়হাটের দিকে। অহম রাজাদের অতীতের রাজধানী জোড়হাটের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উল্লেখ্য। এখানে আছে বুড়ি গোহানির মন্দির, ব্রিটিশের গড়া নানা স্মারক, জেলখানার সামনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মঞ্চ ছাড়াও নানা কিছু। এসব ঘুরে ঘুরে দেখার পরে এলাম চা বাগানে। দেখলাম, এই জেলা শহরের চারদিকে রয়েছে চা বাগানের ছড়াছড়ি। জলবায়ুর গুণেই জোড়হাট চায়ের শহর।

গৌহাটি থেকে ট্রেনে জোড়হাটে গিয়ে উঠেছিলাম হোটেল প্যারাডাইসে। হোটেলের ম্যানেজার রসিক লোক। ভ্রমণে এসেছি শুনে বললেন, এখান থেকে বেশি দূরে নয় মাজুলী দ্বীপ। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ এটি, অতীতে আয়তন ছিল ২৮২১.৬৫ একর। নানা মঠ, নানা আখড়া রয়েছে এখানে। অন্যতম বৈষ্ণবতীর্থ মাজুলীতে গেলে আনন্দ পাবেন। কমলাবাড়ী মাজুলীর প্রধান কেন্দ্র। জোড়হাট থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে নিয়ামতিঘাট পৌঁছে ভটভটি বা লঞ্চে পারাপার। তার পরই দেখা পাবেন মাজুলী দ্বীপের। এই দ্বীপের উত্তরে লখিমপুর, উত্তর-পশ্চিমে শোনিতপুর, দক্ষিণে গোলঘাট ও এই জোড়হাট, পূর্বে শিবসাগর।

এবার ভাবলাম, শিবসাগরের দিকে এগোই। বাসে চলে এলাম শিবসাগরে। এটি জেলা শহর। অতীতের অহম রাজাদের রাজধানী শহর। তখন নাম ছিল তার রঙ্গপুর। জোড়হাট থেকে শিবসাগরের দূরত্ব মাত্র ৫৬ কিমি।

ভাবলাম, জীবনে হয়তো শিবসাগরে আর আসা নাও হতে পারে। এখানে এসে উঠলাম আসাম ট্যুরিস্ট লজে। ৩-৪ ঘণ্টার চুক্তিতে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শিবসাগর দেখতে। শিব আর সাগর—এই দুয়ে মিলে শিবসাগর। ১২৯ একর ব্যাপ্ত দুইশ’ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই শিবসাগর জলাশয়। পাড়েই ট্যুরিস্ট লজ। শিবসাগর আকারে অবিকল সাগরের মতো। এর পাড়ে দেখলাম শিবমন্দির। ওখানকার এক ঠাকুর জানালেন, শিবসিংহের রানী মাদামবুকা ১৭৩৪ সালে এটি তৈরি করান। ভারতীয় শিবমন্দিরগুলোর মধ্যে এটিই উচ্চতম। উচ্চতা ১০৪ ফুট। শিবরাত্রিতে দূর-দূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন।

শিবমন্দির দেখার পর এলাম বিষ্ণু ডোল ও দেবী ডোল দেখতে। এ দু’টি হলো দুর্গা মন্দির। শিবসাগরের মাঝপথে দিখৌ নদী। এটি পেরুতেই দেখলাম ডিম্বাকার দ্বিতল রঙঘর। এটি অহমরাজ প্রমত্ত সিংহ ১৭৪৪ সালে তৈরি করান। এখানকার এক গাইডের মুখে এ কথাই জানলাম। তিনি আরও জানালেন, এই রঙঘর প্যাভিলিয়নে বসে হাতির যুদ্ধ ও নানা জন্তুর খেলা দেখতেন রাজা। আজও এখানে জাঁকজমকপূর্ণ বিহু উৎসবের আসর বসে।

শিবসাগর থেকে ৫ কিমি দূরে ৩১৮ একর জমি নিয়ে জলে টলটল জয়সাগর দেখার জন্য এবার এলাম এখানে। মাতৃস্মৃতিতে ১৬৯৭ সালে অহমরাজ রুদ্র সিংহের হাতে ৪৫ দিনে তৈরি হয় জয়সাগর। দেখলাম, এর পাড়ে রয়েছে কলেজ, মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, মন্দিররাজি—জয়ডোল ও শিবডোল। আর আছে বাঙালি স্থপতি ঘনশ্যামের ডেরা বা নিত গোঁসাই। জয়সাগর থেকে ১৬ কিমি দক্ষিণে গিয়ে দেখলাম ‘গৌরী সাগর’। ১৫০ একর ব্যাপ্ত গৌরীসাগর খনন করান শিব সিংহের প্রথম স্ত্রী রানী ফুলেশ্বরী ১৭২৩ সালে। মন্দিরও রয়েছে দেবী দুর্গার গৌরীসাগরের পাড়ে।

শিবসাগর এতই ভালো লেগে যায়, যেজন্য এখানে একদিন থাকার পরে পর-পর তিনদিন থেকেছিলাম। শিবসাগর থেকে ১৩ কিমি পূর্বে গড়গাঁওয়ে অতীতের কারেঙ্গঘর বা পিরামিডধর্মী রাজপ্রাসাদটি দেখে তো আরও অবাক হলাম। অতীতের কারুকার্য বিনষ্ট হলেও এখানে ভাস্কর্য বড্ড সুন্দর মনে হলো। লোকমুখে শুনলাম, ১৫৪০ সালে স্বর্গদেব চাও চুকেনমুঙে কাঠ আর পাথরে গড়েন ৭ তলার এই প্রাসাদটি। এর সিংহদরজাটি প্রমত্ত সিংহের, যা বর্তমান রূপ পায় ১৭৫২ সালে রাজেশ্বর সিংহের হাতে। তবে ১৬৯৯ সালে অহমরাজ রুদ্র সিংহ স্থানান্তর ঘটান রাজধানীর। তৈরি করেন নতুন করে কয়েকটি ঘর, রঙঘরের অদূরে পথের বিপরীতে। তলাতল ঘর নামেও সমধিক খ্যাত এটি। এরও ৪টি তলা ওপরে, ৩টি তলা মাটির তলে।

এখানে এসে দাঁড়িয়ে দু’নয়ন ভরে দেখে যাচ্ছি। আরও শুনলাম, মাটির তলে ছিল সেনানিবাস, রানীমহল, এমনকি ২টি সুড়ঙ্গপথও ছিল সেকালে। একটিতে গড়গাঁওয়ের কারেঙ্গঘর, দ্বিতীয়টিতে দিখৌ নদীর সঙ্গে সংযোগ ঘটে। তবে আজ সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ।

শিবসাগরের মিকির উপজাতির জীবনযাত্রাও আমার মনে বৈচিত্র্যের স্বাদ এনে দিল। এদের পাড়া ঘুরে দেখার পরে এলাম প্রথম অহমরাজ সুখাফারু (১২২৯) নির্মিত রাজধানী শহরটি দেখতে। এছাড়া আজান পীরের দরগা দেখে ফিরে এলাম শিবসাগরে। তখনও সন্ধ্যা নামেনি। হোটেল বয় চা এনে রাখল। চা মুখে দেয়ার আগেই চায়ের গন্ধ আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করল। মুখে দিয়ে বললাম, ‘বাহ্! এমন চা আর কোথায় মেলে! এ তো খাঁটি চা। ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আর রূপসী বাংলা হোটেলে এমনটি তো পাইনি! বাহ্, এ জীবনে এই বুঝি সত্যিকার অর্থে চা পান করলাম।’

এবার ভাবলাম, গোলঘাটে ফিরে যাওয়ার কথা। বাস ধরে এলাম মহকুমা শহর গোলঘাটে। উঠলাম মধুবন হোটেলে। ছোট্ট শহর গোলঘাট থেকে অরুণাচল রাজ্য আর নাগাল্যান্ড রাজ্য দু’টি খুব কাছে। ইচ্ছা করেই সেবারে ওই দুই রাজ্যে যাওয়া হয়নি। আসামের রূপে মুগ্ধ হয়ে আরও ভাবলাম, ফিরে যাই জেলা শহর করিমগঞ্জে। সময় হাতে ছিল না বলেই গৌহাটিতে ফিরে এলাম।

এবার ট্রেনে চলেছি গৌহাটি থেকে কলকাতার দিকে। এক সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ। ভদ্রলোক বাঙালি জেলা শহর তেজপুরে বাড়িঘর করেছেন বহু বছর আগে। বয়স সত্তর। দু-চার কথা হতেই বেশ সম্পর্ক গড়াল। তিনিই জানালেন, ১৮৩৯ সালে আসাম গেল বাংলায়। চিফ কমিশনারের শাসনাধীনে ১৮৭৪ সালে প্রভিন্সে রূপ পায় আসাম। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বাংলার পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে আসামের মিলন ঘটায় সেদিনের ব্রিটিশরাজ। ১৯৪৭-এর উপমহাদেশ ভাগাভাগিতে করিমগঞ্জ ছেড়ে সিলেট গেল পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের আপনাদের বাংলাদেশে। ইচ্ছা করলে আমার বাবা বাংলাদেশে যেতে পারতেন। যাননি! যদিও আমার পূর্বপুরুষদের আদিবাড়ি সিলেটে। ওখানে কেউ-ই নেই। আমাদের আত্মীয়স্বজন সবাই যে আসামের বিভিন্ন শহর, যেমন—গৌহাটি, ডিব্রুগড়, শিবসাগর, উত্তর লখিমপুর, করিমগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে! ‘

ছবি: গুগল