শিল্পচর্চা: স্মৃতি ও ভাবনা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক

(কলকাতা থেকে): কিছু দিন আগে মধ্য কলকাতার একটা ছোট, তবে শিল্পী ও শিল্পরসিক উভয়ের কাছেই প্রিয়, আর্ট গ্যালারীতে আয়োজিত এক চিত্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিলো। বয়স বা অভিজ্ঞতার বিচারে অপেক্ষাকৃত নবীন জনাবিশেক শিল্পীর কাজ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিলো। তবে আয়োজকরা দু’চারজন প্রবীণ ও নামী শিল্পীর কিছু কাজও সেখানে রেখেছিলেন, সম্ভবত এই কারণে যে এই শিল্পীরা প্রদর্শশালার সঙ্গে উপদেষ্টা বা শুভানুধ্যায়ী হিসাবে জড়িত। সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের পর প্রদর্শিত ছবিগুলি ঘুরে দেখলাম ঘন্টাখানেক ধরে। উপস্থিত কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গেও পরিচয় ও কথাবার্তা হলো। তাঁদের কেউ কেউ অন্য কোন প্রদর্শনীতে তাঁদের ছবি থাকলে দেখতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। ছবি দেখতে দেখতে এবং শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার মন বার বার পাড়ি দিচ্ছিলো বহু পিছনে ফেলে আসা অতীতের দিকে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি যখন আমি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডী পেরিয়েছি, তখন তৎকালীন কলকাতার একদল সংগ্রামী (‘লড়াকু’ নয়, ‘স্ট্রাগলিং’) শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিলো। সবাই মোটামুটি আমার সমবয়সী, রুচি-প্রবৃত্তি এবং অন্যান্য কিছু বিষয়েও আমার সঙ্গে বেশ মিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাথমিক পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হলো এবং নিজে শিল্পী না হওয়া সত্ত্বেও ঐ দলটির সঙ্গে আমার দারুণ জমে গেলো। তারা প্রায় সকলেই বেকার বা অর্ধ-বেকার, আমারই মতো। কেউ কোন স্কুলের আর্ট টীচার, কেউ বিজ্ঞাপন সংস্থার জন্য কার্টুন আঁকে – এরাই দলের মধ্যে ‘প্রিভিলেজড্ ক্লাস’ বা বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী কারণ তাদের যৎসামান্য হলেও একটা নিয়মিত আয়ের সংস্থান আছে। অন্যরা কখনো বইপত্রের প্রচ্ছদ এঁকে বা ইলাস্ট্রেশান করে অথবা হয়তো টালিগঞ্জের সিনেমার কোন শিল্প নির্দেশকের বদান্যতায় সিন-সিনারী আঁকার কাজ করে কোনমতে হাতখরচা জুটিয়ে নেয়। তবে সবাই নিজের নিজের মতো ছবিও আঁকে, সেটাই তাদের ধ্যানজ্ঞান, আসল কাজ। ছবি আঁকার বাইরে আর যে কাজটা তারা সবাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করে তা হলো চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া। আমার মতো একজন অ-শিল্পীকে তাদের আড্ডায় স্বতঃস্ফূর্ত আহ্বান জানাতে কারোরই কোন আপত্তি হলো না। ধর্মতলা স্ট্রীটের (বর্তমান লেনিন সরণী) এক মাথায় ‘নিউ ইয়র্ক সোডা ফাউন্টেইন’ নামে এক সুপ্রাচীন রেস্তোরাঁতে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের আড্ডা বসতো। কোনার দিকের একটি বা দু’টি টেবিল আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা দখল করে রাখতাম যতক্ষণ না রেস্তোরাঁর কোন কর্মী এসে আমাদের বলতেন, ‘দাদারা, দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে, এরপর পুলিশ এসে ধমক দেবে।’ তখন পথে নেমে এসে প্রায়ই দেখতাম বাস-ট্র্যাম আর চলছে না, অগত্যা পা-গাড়ি ছাড়া নিজের নিজের আস্তানায় ফেরার আর কোন উপায় থাকতো না। রেস্তোরাঁর ম্যানেজারের আমাদের প্রতি এক ধরনের স্নেহ মিশ্রিত প্রশ্রয় ছিলো। শহরের ওরকম একটা জমজমাট এলাকায় সত্যিকারের খদ্দেরদের বদলে আমরা টেবিল আটকে রাখায় তিনি কোনদিনই আপত্তি জানাননি, অন্য কর্মীরাও সবাই আমাদের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন।

ঐ ধর্মতলা স্ট্রীটের উপরেই একটা বাড়ির একতলায় একটা ছোট ঘরে আমার শিল্পী বন্ধুদের কয়েকজন পূর্বসূরী পত্তন করেছিলেন সোসাইটি অফ কনটেম্পোরারী আর্টিস্টস্ নামে সংগঠনটির, ১৯৬০ সালে। ঐ ঘরেও মাঝেমধ্যে আমাদের আড্ডা বসতো এবং সেখানে সোসাইটীর দফ্তর ও কর্মশালা আজও রয়েছে। এখন অবশ্য কলকাতার দক্ষিণাঞ্চলে আরও বড় একটা জায়গা হয়েছে যেখানেও সদস্য-শিল্পীরা কাজকর্ম ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকেন। সোসাইটী অভ্ কনটেম্পোরারী আর্টিস্টস্ কেবল কলকাতায় নয়, গোটা ভারতে, এবং সম্ভবত গোটা বিশ্বে, শিল্পীদের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সক্রিয় সংগঠন। সেই সময়ে সোসাইটীর সদস্য আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে সফল ও খ্যাতিমান শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। কেউ কেউ অবশ্য প্রয়াত, যেমন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত, গনেশ পাইন এবং আরও দু’একজন, যেমন সুনীল দাস, যিনিও ইহলোকের মায়া কাটিয়েছেন বছর তিনেক হলো। মনে আছে, বছর পঁয়তাল্লিশ আগে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃপ্রতিম একজন শিল্পরসিক বন্ধুর উদ্যোগে গড়া এক প্রদর্শশালার সঙ্গে আমিও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম, যেখানে সুনীল দাস ছাড়াও সুনীলমাধব সেন এবং ওড়িশার প্রখ্যাত শিল্পী প্রফুল্ল মহান্তির একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিলো। আমার ঐ বন্ধুদেরই পরামর্শে-  কিংবা বলা যায় প্ররোচনায়-  আমিও একবার শিল্পী হয়ে ওঠায় প্রলুব্ধ হয়েছিলাম, কলকাতার সরকারি চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ‘ক্যাজুয়াল’ বা অনিয়মিত ছাত্র হিসাবে গ্র্যাফিক আর্টস্-এ একটা সংক্ষিপ্ত পাঠক্রম সমাপ্তও করেছিলাম। তবে আমার শিল্পচর্চার মেয়াদ মোটামুটি ঐ পর্যন্তই, এর বেশি আর এগোয়নি বিশেষ।
যাই হোক, অতীতের স্মৃতি রোমন্থন স্থগিত রেখে আবার ফিরে যাই কয়েক দিন আগে দেখা ঐ চিত্রপ্রদর্শনীতে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবেই উপস্থিত ছিলেন তিন-চারজন কলা সমালোচকও। তাঁদের সঙ্গেও অল্পবিস্তর কথা হলো। প্রত্যেকেই বললেন যে কলকাতার শিল্পীরা খুবই ভালো কাজ করে চলেছেন, বিশেষ করে তথাকথিত নবীন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে অবশ্যই বিশ্বমানের উৎকর্ষের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কলকাতায় যথার্থ শিল্পরসিক লোকজনের অভাব রয়েছে বলেই মনে হয়, অনেকের কাছেই ভালো ছবি বলতে বোঝায় ‘ওল্ড মাস্টারস্’ বা গত শতকের প্রবীণ শিল্পীদের আঁকা ছবি অথবা এমন ছবি যা সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিনন্দন। সমকালীন শিল্প সম্পর্কে কম লোকেরই আগ্রহ বা ধারণা আছে। তাছাড়া রুচিরও একটা ব্যাপার আছে। উচ্চ মূল্যে ছবি কেনার মতো আর্থিক সঙ্গতি যাদের আছে তাদের মধ্যে হাতে গোনা দু’চারজনকে বাদ দিলে অন্যরা যখন ছবি কেনেন তখন সেটা কেনেন ‘ইনভেস্টমেন্ট’ হিসাবে, ভবিষ্যতে অনেক বেশি দামে ছবি বিক্রী করে লাভ করার উদ্দেশ্যে। এই শ্রেণীর ক্রেতাদের কাছে ওল্ড মাস্টারদের আঁকা ছবিই হলো ‘সেফ ইনভেস্টমেন্ট’ – নিরাপদ বিনিয়োগ। ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই তা নয়, আমার প্রয়াত বন্ধু গণেশ পাইন যেমন ছিলেন এমনই এক ব্যতিক্রম। আরও দু’একজনও আছেন বা ছিলেন। এই চিত্র সমালোচকরা অবশ্য এটাও বললেন যে কেবল কলকাতা বা অবশিষ্ট ভারত বলে নয়, গোটা বিশ্বেই ছবি বেচাকেনার বাজারে এমনই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
যাঁদের সঙ্গে সেদিন আমি কথা বলেছিলাম তাঁদের একজনের মত হলো, গত বিশ-ত্রিশ বছরে সর্বভারতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে কলকাতার অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। যে কয়েকজন শিল্পীর আবির্ভাব এই সময়ের মধ্যে ঘটেছে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যদের সংখ্যা চার-পাঁচজনের বেশি নয়। অপেক্ষাকৃত নবীন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না যাঁরা অব্যাহত বা নিরবচ্ছিন্নভাবে নতুন সৃজনক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছেন। এটা অবশ্য যিনি বলছিলেন তাঁর নিজস্ব মত, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার। আমি নিজেও খানিকটা চিন্তা করেছি বিষয়টা নিয়ে এবং আমার মনে হয়েছে যে সমকালীন শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের শিল্পীরা যখন নতুন নতুন আঙ্গিক, মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছেন, তখন কলকাতা তথা বাংলার শিল্পীরা হয়তো ভাস্কর্য এবং রঙ-তুলি দিয়ে ছবি আঁকার মতো চিরাচরিত বা প্রথাসিদ্ধ শিল্পকর্মরীতির পুনরাবিষ্কারে এবং তার মধ্যে নতুন অর্থ সন্ধানের প্রয়াসে অধিকতর মনোযোগী থেকেছেন। তবুও কলকাতা তথা বাংলায় শিল্পচর্চার বর্তমান দৃশ্যপট অবশ্যই উৎসাহব্যঞ্জক। কলকাতার কয়েকটি আর্ট গ্যালারী তাদের প্রদর্শিত শিল্পসম্ভারে সমকালীন আস্বাদ যোগ করতে সচেষ্ট হচ্ছে। এইসব প্রদর্শনশালায় সাধারণ উৎসুক দর্শকদের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের সবাই নিশ্চয়ই ছবির ক্রেতা নন কিন্তু তাঁদের উৎসাহ স্পষ্টতঃই আন্তরিক। এই দর্শকদের অনেকে একই প্রদর্শনী বার বার দেখার জন্য ফিরে আসছেন, সঙ্গে নিয়ে আসছেন সমরুচিসম্পন্ন বন্ধুবান্ধবকে। প্রদর্শশালাগুলির সামনে এখন প্রধান সমস্যা হলো যথেষ্ট সংখ্যক নতুন প্রতিভার সন্ধান পাওয়া। দু’চারজন শিল্পকলাবোদ্ধার যেমন মত, কলকাতা তথা বাংলার শিল্পীদের টেক্নিক্ বা প্রয়োগপদ্ধতি অবশ্যই শক্তিশালী, কিন্তু বহির্বিশ্বে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে যেসব চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণা ঘোরাফেরা করছে তাদের ব্যাপারে সচেতনতায় তাঁরা যেন কিছুটা উদাসীন। এই বোদ্ধাদের মতো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা আমার তো নিশ্চয়ই নেই, তবে আমার সীমিত উপলব্ধি থেকে আমার কিন্তু মনে হয় যে সর্বভারতীয় স্তরে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে যেমন, কলকাতা তথা বাংলার শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও তেমনি আসল প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন ধরনের ভারতীয় দৃষ্টিগোচর শিল্পের ধারার উন্মেষ ঘটানো সম্ভব যা একাধারে স্বাতন্ত্র্যসূচক বা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল, আবার সমসাময়িক অথচ একেবারে শেষ কথা নয়। হয়তো শিল্পচর্চাক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রবণতা এবং বাণিজ্যিক সাফল্য থেকে কলকাতার অবস্থান এখনও কিছুটা দূরে থাকার কারণেই সেটা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে যাওয়ায় সাধারণ দর্শকদের ক্রমবর্ধমান উৎসাহই অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করবে। বলা যায় না, হয়তো বর্তমান দশকের শেষ থেকেই তেমন একটা ছবি আমাদের চোখের সামনে ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকবে। সবশেষে নিবেদন, আগেই বলেছি আমি একজন অ-শিল্পী, তাই আমার ব্যক্তিগত মতামতকে যদি বোদ্ধারা অনধিকারচর্চা মনে করেন, আমি মার্জনাপ্রার্থী।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]