শীতকাল কবে আসবে

ইরাজ আহমেদ

বহু বছর আগে সেই শহরে শীতকালটা একেবারে অন্যরকম ছিলো।কুয়াশাঘেরা শীতকালের কথা ভাবলে আমার খুব বেশী মনে পড়ে আমাদের পাড়ার কথা। অদ্ভুত সুন্দর ঠান্ডা মেখে গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়ার বাড়িঘর, সরু গলির ভেতরে সকালবেলার কুয়াশা, আলসেমি করা ছুটির দিন, আমাদের ক্রিকেট খেলা, ফেরিওয়ালার ডাক, মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কেতলি, মিষ্টির দোকানে ভাজা পরোটার ঘ্রাণ, বিশাল ভাড় নিয়ে বসে থাকা মাঠাওয়ালা, বাজার থেকে কথা বলতে বলতে ফিরে আসা মানুষ, বিছানার কাছে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকা আমার পোষা কুকুর-কত কথা যে একসঙ্গে মনের মধ্যে ভীড় করে আসে।এক আশ্চর্য নির্জন সময়ের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে আমি ফিরে যাই। এই শহরে শীত আসে এখন। কিন্তু মনের মধ্যে শূণ্যতার হাওয়া ঘোরে। স্মৃতি শুধু সুঘ্রাণ ফেলে যায়। বাকীটা হারিয়ে যায় সময়ের গর্ভে।
সত্তরের দশক তখন শেষ হয়ে আসছে। সিদ্বেশ্বরীর চারপাশের এলাকাগুলো ছিলো আরো নির্জন। শীতে স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ভোরবেলা রমনা পার্কে যাওয়া ছিলো বাধ্যতামূলক। পাড়া থেকে সব বন্ধুরা দলবেঁধে ভোরবেলা রওনা দিতাম বেইলি রোডের শেষ মাথায় গভীর সবুজ হয়ে ফুটে থাকা রমনা পার্কে। তখন অক্টোবর মাস থেকেই একটু একটু ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করতো। নভেম্বরে এসে সেটা দাঁড়াতো কড়া শীতে। আকাশে আলো ফুটে ওঠার আগে আমরা বের হয়ে পড়তাম। ডিসেম্বর মাসের ভোরবেলা মাঝে মাঝে ঘন কুয়াশায় পথ আবছায়া হয়ে হারিয়ে যেতো। আমরা বন্ধুরামুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করার খেলা খেলতে খেলতে রওনা দিতাম। আমাদের যাত্রা শুরুর পর্বটা ছিলো ভীষণ মজার। কারো কারো দায়িত্ব ছিলো বাসা থেকে বের হয়ে অন্যদের ঘুম থেকে ডেকে তোলা। অনেকেই নভেম্বর, ডিসেম্বর মাসের প্রচণ্ড শীতে লেপের তলা থেকে বের হতে চাইতো না। তাদের জানালায় ছোট ছোট পাথরের টুকরো ছোঁড়া থেকে শুরু করে সমেবেত কন্ঠে সঙ্গীত-কতকিছু যে করতে হতো। গানের চোটে শেষে বাড়ির অন্যদের ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার ভয়ে সবাই বের হয়ে আসতো। আমি বসবার ঘরে ঘুমাতাম। সে ঘরের একটা জানালার কাচ ভাঙ্গা ছিলো। কাচের বদলে হার্ডবোর্ড লাগিয়ে রাখা হয়েছিলো। উঠতে না চাইলে বন্ধুরা রাস্তার রাজ্যের বালি ওই বোর্ড সরিয়ে আমার মশারির ওপর ফেলতো ।
ভোরবেলা বের হয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে যেতাম রমনায়। বেইলি রোড তখন নির্জনতার ডাকনাম। এখনকার মতো দোকান আর মানুষের ভীড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে থাকতো না এলাকাটা। দোকান বলতে তখনকার মহিলা সমিতির নাটক মঞ্চের পাশে একটা ব্যাংকের মহিলা শাখা,‘লাকি ব্রেড’ নামে একটা রুটি-বিস্কিটের দোকান। ছিলো একটা বইয়ের দোকান আর প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরী। অত ভোরে কারো শাটারই খোলা থাকতো না।কয়েকটা একতলা-দোতলা বাড়ি ঠাণ্ডা মেখে নিঝুম হয়ে পড়ে থাকতো পথের ধারে। রাস্তা ভিজে থাকতো শিশিরে। আমরা পাতলা গেঞ্জি আর ট্রাউজার পড়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে ছুটতে শুরু করতাম পার্কের দিকে।
আসলে সকালবেলা পার্কে ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিলো আড্ডা আর লোকজনের বাসার গাছের ফল সাবাড় করা। তবে শরীরচর্চা যে একেবারেই হতো না তা নয়। অতিউৎসাহী কয়েকজন বন্ধু পার্কে ঢুকেই ব্যয়াম আর চক্কর দেয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে যেতো। আমরা কিছু অকর্মা ঘাসের উপর হাত পা ছড়িয়ে বসে গল্প করতাম। ওই সময়ে পার্কে এখনকার মতো স্বাস্থ্য লোভী মানুষের ভীড় ছিলো না। ফাঁকা পার্কে বসে বসে আমরা পাতা ঝরা দেখতাম, পাখির ডাক শুনতাম আর শীতে কাঁপতাম।
একটু বেলা উঠলে অলস পায়ে আমরা ফেরার পথ ধরতাম। তখন ক্লাস অথবা পরীক্ষার বালাই না থাকায় পাড়ার মোড়ে ঘোলওয়ালার সামনে আমাদের আরেকটা আড্ডা জমতো। কেউ কেউ যেতো ‘জলখাবার’ নামে বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে পরোটা আর রসগোল্লা খেতে। কোনো কোনো দিন প্রতিবেশীদের খেজুর গাছে বাঁধা রসের হাঁড়ি লুট করার অভিযানও চলতো। তখনও পাড়ার লোকজনের ঘুম ভাঙ্গতো না।শুধু অমরদের লন্ড্রীটা খুলতো ওর বাবা। কালী মন্দিরের লাগোয়া পরেশ দাদার মুদী দোকানের জানালায় তখনও অনন্ত শীত। বন্ধুরা গলাগলি করে বাড়ি ফিরতাম সেইসব ভোরে।মন ভালো করে দেয়া শীতকাল আর ফিরে আসে না এখন। এই শহরের আঙুলে গোনা দিনগুলি ফুরিয়ে ফেরার অপেক্ষায় বসে থেকে ভাবি-আর কোনোদিন ফিরবে কি সেই শীতকাল?

ছবিঃ প্রাণের বাংলা