শীতনিদ্রা

istiak

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

শীতকাল প্রায় এসেই গেল। এখন খাওয়া দাওয়া খুব ভাল হবে। পেটে ঠিকমত খাওয়া ঢুকলে ঘুমটাও ভাল হবে। শীতকালে অবশ্য এমনিতেই ঘুমিয়ে মজা। নরম লেপের তলায় শরীর গরম রাখার চেষ্টা। বিবাহিত, অবিবাহিত সবার বেলায় একই নিয়ম প্রযোজ্য নয় অবশ্য। সেটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ব্যাঙও ঠান্ডার সময় শীতনিদ্রায় থাকে। কিন্তু ব্যাঙ এর গায়ে লেপ, কম্বল কিছুই থাকে না। তাই বলে ব্যাঙের ঘুম হয়না, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। দিনশেষে আপনার ঘুম ঠিকমত হলো কিনা, তাই নিয়ে কথা।এজন্য দরকার সত্যিকারের ট্যালেন্ট লোকজন। এদের ঘুমানোর জন্য, নরম বিছানা, বালিশ কিছুই লাগেনা।যারা বাসে বা ট্রেনে পাশের যাত্রীর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমায়, তাদের কি ঘুম হয় না? অবশ্যই হয়, এত বেশি হয় যে মাঝে মাঝে এদের মুখের লালায় শার্ট ভিজে যায়। একবার কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাব। শিলিগুড়ির ট্রেনে উঠেছি। সেবারই প্রথম আমার রাতের বেলা ট্রেনে শুয়ে শুয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তো সব কিছু গোছগাছ করে অন্য সবার দেখাদেখি আমিও শুয়ে পড়লাম, কিছুক্ষন পর শুনি আশপাশ থেকে নাক ডাকার শব্দ আসছে। আর আমি ট্রেনের মধ্যে ঘুম হবে কি হবে না, এই চিন্তা করতে করতে রাত কাবার! শুধু ট্রেন কেন, পাঁচ তারকা হোটেলের বিছানাতেও আমার ঘুম আসতে চায় না। বেশি নরম বিছানায় শুলে মনে হয় পিঠের মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাবে। আসলে কুকুরের পেটে ঘি সয় না। শুধু ঘি কেন, আমার শরীরে চা-ও সহ্য হয়না। যদি ভুল করে কোনভাবে সন্ধ্যার পর চা বা কফি খেয়ে ফেলি, তো সেই রাতে আমার আর ঘুম হবে না। মনে আছে একবার বান্দরবনে যেয়ে কেওক্রাডাং(বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়) এ ট্রেকিং এ গিয়েছিলাম।

সন্ধ্যায় যখন বেস ক্যাম্পে ফিরলাম তখন আর বাকী সবার মত আমিও এক কাপ চা খেয়ে একটু ফ্রেশ হতে চেয়েছিলাম। প্ল্যানটা ছিল চা খেয়ে কিছুটা চাঙা হয়ে তারপর রাতের খাবার খেয়ে একটা জম্পেশ ঘুম দেব।কিন্তু ঐ এক কাপ চা আসলে আমার শরীরে ভায়াগ্রার মত কাজ করেছিল। সারাদিনে প্রায় আট ঘন্টার মত ট্রেকিং করার পরও সারারাত এক ঘন্টাও ঘুমাতে পারিনি। নিজের শরীরে এত শক্তি দেখে ট্যুরের পুরোটা সময় নিজেকে ঘোড়া ভাবতে শুরু করেছিলাম। ট্যুর শেষে যখন ঢাকা এসে পৌছলাম, তখন খুব ভোর। বাড়ি ফিরব বলে কোন সিএনজি (থ্রি হুইলার অটো রিকশা) না পেয়ে একটা লোকাd-frog-sleepল বাসেই উঠে পড়লাম, কিন্তু কোন সিট খালি নেই। ঐ ট্যুরে নিজেকে ঘোড়া ভাবতে ভাবতে এমন অবস্থা হয়েছিল যে বাসে ঘোড়ার মত দাঁড়ানো অবস্থাতেই পুরোটা রাস্তা আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসেছিলাম। একেই বলে ঠ্যালার নাম বাবাজি! বাস থেকে নামার সময় কন্ডাকটর শুধু বলল, ‘ভাই, জীবনে বহুত ঝিমাইন্যা পাবলিক দেখসি, তবে এই রকম ডিম পাড়া মুরগির মত কাউরে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ঝিমাইতে দেখি নাই!’ সাথে সাথে পকেট চেক করে দেখলাম আবার পকেটমার আমাকে মুরগি করেছে কিনা! না, সব ঠিকই ছিল। অবশ্য পকেটমারও বোঝে, এই সাত সকালে যে লোক চলন্ত বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমায়, হয় সে নাইট গার্ড না হয় চোর। বান্দরবনের গহীনে পাহাড়ে জঙ্গলে চার পাঁচ দিন ঘোরাফেরা করে চেহারার যা অবস্থা ছিল, তাতে দ্বিতীয়টাই মনে করা স্বাভাবিক।

তো এই ঘুম কেউ ঘুমায় সোজা হয়ে, কেউ এক পাশে কাত হয়, কেউবা আবার উপুড় হয়ে। কারো লাগে নরম বালিশ, আবার কারো কোল বালিশ। কেউ রেল স্টেশনে ঘুমায়, আবার কেউ ক্লাসে ঘুমায়। বিড়াল কোন কাজ না করেও মালিকের সাথে নরম বিছানায় ঘুমায়, আবার কুকুর সারা রাত বাড়ি পাহারা দিয়েও উঠানের মাটিতে ঘুমায়। কেউ নাক ডেকে ঘুমায়, কেউবা নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। কেউ মরার মত ঘুমায়, কেউ আবার ঘুম না হওয়ার জন্য মরে। কেউ ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে, কেউবা আবার স্বপ্ন দেখাকে দোষ মনে করে। দুপুরের পর একটা ভাতঘুম কতটা জরুরী তা আমরা ভেতো বাঙালী ছাড়া আর কে বুঝবে? তবে ভাতঘুমের বিলাসিতা তো অনেক দূরের কথা, রাতে একটু আরাম করে ঘুমানোর কষ্টটা সবচেয়ে বেশি টের পায় সেই মানুষগুলো, এই শীতের রাতে যাদের গায়ে একটা গরম কাপড় নেই। আমাদের আরামের শীতনিদ্রায় যাওয়ার আগে, এই মানুষগুলোর জন্য ঘরের পুরোনো গরম কাপড় কিছু (যদি থাকে তো) দিয়ে দিলে কেমন হয়? আপনার পুরোনো কাপড়ের ওমে যদি অনেক দিনের না ঘুমানো কারো চোখে নতুন করে ঘুম আসে, আমি নিশ্চিত আপনার চোখেও জীবনের সবচেয়ে সুখের ঘুম নেমে আসবে।