শীতের স্মৃতি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শীত যেন এক বন্দী শহর। ঢাল তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দার হয়ে কাঁপছে।মাঝে শীতের কোনো সঙ্গী নেই।শূন্য পথে সে কুচি পাথরের মতো ধূসর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সে তেড়েফুড়ে ঢুকে পড়ে পাঁজরে, পাড়ায়, চা খানায়, ফুটপাথে আগুনের ধারে, সম্বলহীন মানুষের দুঃখে আরো বেশি হয়ে। সে উড়িয়ে দেয় মাঝরাতে আশ্রয়হীন কুকুরটির ঘুমও। কিন্তু তারপরেও আমরা শীত ভালোবাসি। কবি কাব্য করে লেখেন,‘‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?’’ শীতে মোড়া সকাল ফিরিয়ে নিয়ে যায় মাফলার আর বাঁদর টুপি পড়া কোনো এক গ্রামের বাজারে নদীর ধারে বাজার শূন্য জেটি বসে আছে লঞ্চ বাঁধবে বলে কয়েকজন মানুষও শীতে ভবঘুরে হয়ে বসে নদীর কিনারায় কাঁপছে তাদের আঙুলে ধরা ছোট একঘেয়ে সাদা রঙের চায়ের কাপ। মুখ থেকে উড়ে যাচ্ছে বিড়ির ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে শীতের অজানা উৎসকে চ্যালেঞ্জ জানাতে

সেসব ঠক ঠকে  একা একা শীতকালের কথা। তখন মোবাইল ফোনে শীতের পরিমাপ জানানো হতো না, কখনো কখনো ব্যারোমিটার ঝুলতে দেখা যেত ওষুধের দোকানে। তবু তখন শীত আসতো মাঠ পার হয়ে, তার পকেটে হয়তো থাকতো বৃষ্টি। ঠাণ্ডায় কেঁপে ওঠা শরীর জানান দিতো যেন আজীবনের বিষাদ ভেতরে। শিকড় বাকড়ে লেগে আছে। ক্রমাগত একা করে দিচ্ছে।

এসব দুঃখের কথা অতিক্রম করে শীতের বৃষ্টিমুখর সকালে কিন্তু লেপের কথাও থাকে। থাকে গরম চায়ের আলাপ। শিমুল তুলার গোপন নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে কেউ হয়তো ভাবছেন- কেন যে মানুষের ঘুম ভাঙে?

এবার শীত তীব্র, মারমুখী। তাই প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘শীতের স্মৃতি’।

আলী ইমাম

উত্তুরে হাওয়া জানিয়ে যায় কোথায় যেতে হবে

শিশু সাহিত্যিক

তখন আমার বয়স ১২। ১৯৬২ সাল। আমি বড় হয়েছি নিরিবিলি শহর ব্রাহ্মনবাড়িয়ায়। সেবার প্রচণ্ড শীত নেমেছিলো ব্রাহ্মনবাড়িয়ায়। তিতাস পাড়ের শহরটি কুয়াশায় একেবারে ঢাকা পড়ে গেলো। আমার স্মৃতিতে শীতকালটা এমনই ঘণীভূত হয়ে আছে। সুবেহ সাদিকের সময় আমার নানা আমাকে ঘুম থেকে তুলে হাঁটতে যেতেন। আমরা যেতাম কুরুলিয়া খালের পাড়ে। আমার নানা বলতেন, সুবেহ সাদিকের সময় ফেরেস্তারা পৃথিবী থেকে আকাশে উঠে যান। তাই তাদের ডানার বাতাস খুব পবিত্র। পৌষালী শীতের সেই শিশিরে হাওয়া শরীরে কাঁপন জাগিয়ে দিলেও এক ধরণের পুলকও সৃষ্টি করতো। মনে হতো শরীরে ডানা গজিয়েছে।আমরা কুরুলিয়া খালের তীর থেকে জেলেদের ধরা কাচকি মাছ কিনে আনতাম। অমন স্বাদের মাছ আমি জীবনে আর কখনোই খাইনি। শীতে আরেকটি খাবারও আমাকে ভীষণ টানতো, সেটা হলো পোড়া ম্যারা পিঠা। সেই পিঠা সকালবেলা পুড়িয়ে শিমের বাসী সালুন দিয়ে খেতে কী দারুণ ভালো লাগতো! এখনও সেই স্বাদ লেগে আছে জিবে। তবে কি এভাবেই মানুষ স্মৃতির জালে আটকা পড়ে যায়?

শীতে আমাদের সেই শহরের নিয়াজ পার্কে মেলা হতো। সারারাত জেগে চাটাইয়ে বসে চাদরমুড়ি দিয়ে যাত্রা দেখতাম। সে আমার এক উত্তেজনাময় স্মৃতি। শীতের রাতে কুকড়ে গিয়ে যাত্রামঞ্চের সেই উচ্চকন্ঠ আমাকে কেমন সজীব করে রাখতো।

শীতকালের একটা ভিন্ন মাত্রা আছে যা অন্য ঋতুতে পাওয়া যায় না। উত্তুরে শিরশিরে হাওয়া যেন জানিয়ে যায় দূরে কোথাও কতদূরে যেতে হবে। অড়হড়ের ক্ষেত ধরে অবিরাম হাঁটা, পায়ে শিশির ভেজা মাটির স্পর্শ, সেই ঘাসের গন্ধ জীবনের এই গোধূলী বেলায় এসে বেশি করে মনে পড়ে।

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

হৃদয়ের পুরে পরিচিত সুরে ডাকো

কথা সাহিত্যিক

‘শীতকাল আমার প্রিয় ছিল’ বাক্যটা লিখতেও এখন গায়ে কাঁটা দেয়।ঐ তো শহরতলীর পথে বা ফেরিঘাটে লাল ধুলোয় খাবি খেতে খেতে সরভাসা চা আর পিঠাওয়ালির তৎপর হাতে খোলাজালি পিঠা খেয়েছি আমি। শীত মানে কৃষ্ণদামপুর চরে এই এতটুকু কলাই শাকের ক্ষেত— শিশিরস্নাত, জলশীর্ণ নদীর রেখা ধরে খালারা গায়ে মেরুন শাল জড়িয়ে ফিরে আসছে।মরে আসা ইছামতীর নিঃস্রোত তীরে বুকভাঙানিয়া ‘ব্রজবাবুর ঘাট’ আর পেছনে ভাঙাচোরা প্রাসাদোপম বাড়িতে আনসারদের নেড়ে দেয়া ভেজা লুঙ্গি।চষাক্ষেতে বসে থাকা যুবকের সংঘ, নাড়াপোড়া মাঠের ওপর দিয়ে বোঁ বোঁ শব্দ করে ওড়া ঢাউস ঘুড়ি। কে জানতো লাটাইবাঁধা ঘুড়ি এমন শারীরিক শব্দ করতে পারে। সন্ধ্যাবেলার টিমটিমে আলো জ্বলা বাজারে পাটের বস্তাগন্ধী চালের দোকান, অপর্যাপ্ত আলোয় ঝিলমিল করছে রাতের বাজারে জিয়ল মাছ, ডাঁই করা আছে শীতের স্যাপগ্রিন নলডোগ শিম, সুরকি-লাল বিলিতি বেগুন আর ডার্ক পার্পল ‘সিন্দুরকোটা’ আলু। শীতের সন্ধ্যা মানে শ্রীকুন্ডেশ্বরীর সামনে অলস সিগ্রেটের নীলচে ধোঁয়ায় পেকে ওঠা বুড়োদের সভা। আমার শীতের বেলা মানে রোদের রঙ মিহি লালচে, কুয়াশার ভিতরে সূর্যোদয়ের আলোর ঝালর, শুকনো ধুলো উড়ানো বাতাস। এই শীতপ্রধান বৃটেনে, এই স্যাঁতসেঁতে বৃষ্টিভেজা লন্ডনে হাড়কাঁপানিয়া জলবায়ুতে সে কথা মনে পড়লেও কান্না পায়।

এখানে আমি প্রথম এসেছি শেষ শরতে, হেমন্ত সেবার বেশ ছোট্ট করে সারলো মনে আছে, কিছুদিনের ভেতরেই দেখতে পেলাম দুপুর তিনটের আকাশে লোহার বালতির মতো অন্ধকার আর তাতে একরকম ফোলা ফোলা বনরুটির মতো চাঁদ। সেই চাঁদকে ঢেকে দেয় বৃষ্টির মেঘ, ছরছরে বৃষ্টি। ট্রাফালগার স্কোয়ারকে প্রায় প্রদক্ষিণ করে লাল বাস যায়, তাদের গায়ে লেখা দেখি টেট মডার্নে ফ্রিদা কালোর প্রদর্শনীর কথা, অঁরি রুশোর ছবির কথা, টিকেটের মূল্য আমার সাপ্তাহিক খাইখরচের সমান। এখানে শীতের ‘শাদা’ শরতের মতো অমল-ধবল নয়, এর ‘কালো’ও বর্ষার নিবিড় অন্ধকারের পূঞ্জ নয়- যার ছায়ায় দিব্যি মন মেলে দেয়া যায়- এ হলো রিক্ততার দৃশ্যমান ইঙ্গিত— “বেরিয়ে এসেছে প্রেতের দল, আমারই কল্পনার সৃষ্টি- পৌষ তাদের ডাক দিয়েছে…কোনোকালে অর্ধ-অনুভূত কোনো আতঙ্ক, দু-বছর আগেকার চাপা-পড়া হতাশা, কোনো দিবানিদ্রার দুঃস্বপ্ন, শৈশবের কোনো অবচেতন ভীতি। এরা সবাই সম্পূর্ণীকৃত, পুনরুজ্জীবিত এই পৌষের স্পর্শে।” (বুদ্ধদেব বসু)

আমার নানাবাড়িতে ছাদে ছিলো শীতের সবজিবাগান, ছাদে মাটির চুলা গড়ে আমার নানী পিঠা বানাতো, বিবিখানা বিক্রমপুরের দিককার পিঠা হওয়া সত্ত্বেও আমার মনে পড়েনা বিবিখানার কথা।তার পাশে বসে থাকলে পাওয়া যেত সিন্দুকে তোলা চাদর- হেজলীন স্নো- জাম্বাক আর খেজুরগুড়ের সম্মিলিত গন্ধ। আকাশ ভরে উঠতো নয়নতারা রঙা বিকেলের আলোয়, সেই রঙ ফিরোজা হয়ে উঠলে চাঁদ উঠতো, উজ্জ্বল হয়ে উঠতো শুক্রগ্রহও। নির্মেঘ আকাশে তারার প্রদীপমালিকা। ফুটফুটে জোছনা- মিটমিটে জোনাকি আর গভীর কুয়াশা সাঁতরে নানা-নানীর বাড়িতে পৌঁছলেই চাল সেদ্ধ করার- গুড় পাক দেয়ার- খড় নাড়বার নিবিড় সুগন্ধে অবগাহন।

জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন- “এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে”; তাঁর কবিতা পড়ে পড়ে আমি বিলাতি শীত সইতে চেষ্টা করতাম।ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে নামা হাঁস আমি দেখতাম বিলেতের ধূসর আকাশে, সিকামোরের পচা পাতা জমছে ঘোড়ার জল খাওয়ার পরিত্যক্ত আয়তাকার পাথরের চৌবাচ্চাগুলিতে।শুরু হয়ে গেছে সূর্যহীন ঋতু, শীতে আবার ঝড়বৃষ্টি হয় এ’মুল্লুকে। যেন শুধু পাঁজরের তলায় তলায় নিজের শীর্ণ আঙুল চালিয়ে দিয়েই শান্ত হয়নি এই ডাইনি, সেই আঙুলগুলো দিয়ে ক্রমাগত টেনে ছিঁড়ছে আমার বুকের পালক, ডানার রেশম। শীত নিয়ে কত কাব্য করেছেন কোলরিজ-কীটস-হুইটম্যান-ইয়েইটস-এমিলি ডিকিন্সন, কিন্তু এইসব কবিতার ডানার তলায় আমি এতটুকু শান্তি পেলাম না বিলেতে প্রথম শীতসংকাশে। কোথায় গেল ‘সুয্যিমামার বিয়েটা’? কোথায় গেল বৃষ্টিসন্নিধানে আমার ‘অঙ্গে হর্ষের পড়ুক ধুম’? শীতপ্রধান দেশে শীতেই মানুষের ভিতরে অস্থিরতা বাড়ে, বাড়ে বিষন্নতা, অভিবাসী এশীয়দের বাড়ে ভিটামিন-ডির অভাবজনিত ব্যাধি বা ব্যাধির উপসর্গ… এইসব কিছুই না জেনে ধূসর বাড়িঘর, ইঁদুররঙা পীচঢালা রাস্তা, মেঘ চোঁয়ানো জোছনা আর ফ্যাকাশে শাদা আকাশের নীচে আমি যা অনুভব করতে লাগলাম লাগাতার, তার ভালো নাম ‘আত্মহত্যার প্রয়াস’। এই ভেজা বৃষ্টির শীতকাল মনে পড়িয়ে দেবে ডিলান থমাসের লাইন,

চীনেমাটির বাসন পুঁছিও, বসার ঘরের আঙন মুছিও, পাখিটারে দিও আহার,

বৃষ্টিতে ধোয়া দিনে ভুল করে জানালা গলায়ে রৌদ্র আসিলে মুছাইও জুতা তাহার।

রৌদ্র যে আমার কী, সূর্য যে আমার কে, সেইসব এমন করে বুঝব কে জানতো! কোথায় ফেলে এসেছি সৌরকরোজ্জ্বল সকাল আর মাঘসংক্রান্তির রাত, তারায় নির্মিত অনন্ত আকাশগ্রন্থি, মুনিয়ার বাসায় শীত আর শিশিরের জল, মেঠো ইঁদুরের গর্তের খুদ শীতের আর্তি মাখা যত, পশ্চিমের বারান্দায় কালো আলোয়ান গায়ে দিয়ে আমি যা কিছু ভাবতাম পাশের দালানের পেছনে টিমটিমে একটা বাতি আর তার ঝিনুক আকারের ঢাকনির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে। লন্ডনের পথে পথে একটি আশ্চর্য সবুজ কাকাপোর মতো, না-টিয়া না-পেঁচা কাকাপোর মতো, সহজ শিকার কাকাপোর মতো, উড়তে ভুলে যাওয়া বিলুপ্তপ্রায় কাকাপোর মতো হেঁটে বেরিয়েছি আমি। কে যেন আমার মাথায় ওষুধ-বড়ি টিপে দিয়েছিল, টি-টি করে উড়ে এলাম কোন দেশে… কিংবা আমি হয়তো নুহনবীর জাহাজ থেকে ডাঙার সন্ধানে উড়িয়ে দেয়া দাঁড়কাক, কোনো এক রহস্যময় কারণে আর কোনোদিন ফিরে আসবো না জাহাজে।

রিনি বিশ্বাস

শীত, না আদিখ্যেতা!!!

বাচিক শিল্পী

 

এই সময়ে সবটাই কেমন জবুথবু; ঘুম চোখে লেপটাকে বেশ কায়দা ক’রে, এদিকে মাথা মুড়ি দিলাম, তো ওদিকে এক চিলতে পা গেল বেরিয়ে! হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে খেয়াল হলো আজ তো সকালে লাইভ! অত‌এব, গোটা কয়েকবার ‘ধ্যাৎ’ বলে উঠে বসতেই হলো! ঘোর আবছা হতে টের পেলাম আসলে অ্যালার্মের শব্দেই উঠে বসার বদলে আমি আরেকটু গুটিসুটি দিয়ে শোওয়ার তাল করছিলাম! দোষ কিন্তু আমার নয়! গত ক’দিন ধরে টেম্পারেচার শুধুই পড়তির দিকে; ইচ্ছে না থাকলেও লফ্ট থেকে টেনেটুনে শীতের জামাকাপড় নামাতেই হয়েছে! বক্স খাটের ভেতরে ‘সযতনে’ রাখা লেপ‌ও এসেছে ‘বর্হিবিশ্বে’! সারা ঘরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে চিত্রবিচিত্র নানান মাপের মোজা! গায়ে উঠেছে ফুলহাতা জামা, হাফপেন্টুলের বদলে শোভা পাচ্ছে ফুল পেন্টুল! সব মিলিয়ে সে এক মহাসমারোহ! এ কথা সে কথার পর যে কাউকে অবধারিতভাবে প্রশ্ন করছি ‘ঠান্ডা কেমন লাগে?!’ ‘আহা, বেশ ভালো’, শুনলেই মনে মনে দাঁত কিড়মিড় ক’রে বলতে ইচ্ছে করছে ‘যত সব ঢং’!!!! আমি কোথায় ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি, আর এদের দেখো, যত্ত আদিখ্যেতা!!!

ছোটবেলায় কেমন লাগতো শীতকাল?! আরে বাবা, ছোটবেলা, মেজোবেলা, বড়বেলা, সবেতেই এ অধমের এই উত্তরে কোন নড়নচড়ন নেই! শীতকাল চিরকালই আমার দুচোক্ষের বিষ! কোন কাজ করার আগে অন্তত মিনিট পনেরো-কুড়ি নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করো! তারপর নিজেকে ‘বাবা, বাছা’ করে বুঝিয়ে লেপের নীচ থেকে টেনে বের করো! হাঙ্গামার কোন শেষ নেই!!! বাড়ির ঝাড়ুদার কাম বাসনা ধোয়ার দিদি কাম রান্নার মাসির তো এই একটিই মাত্র বিকল্প! অত‌এব সংসারের লক্ষ কোটি কাজ, শীত গ্রীষ্ম বারোমাস এই শর্মাকেই করতে হবে!!! লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে কোনদিন কেউ দেবে না রে ভাই, যে ‘আহা শীত, বাহা শীত’ বলে প্রশস্তি গাইবো! ভোর চারটের অ্যালার্ম বাজতে না বাজতেই ‘চল্ চল্ চল্’ বলে রণদুন্দুভি বাজিয়ে ময়দানে নেমে পড়তে হবে! যুদ্ধ শেষ হতে সেই মাঝরাত!!!

তবে হ্যাঁ, এতসবের পরেও জীবনে এক আধবার‌ও কি শীত নিয়ে রোমান্টিক হ‌ওয়ার সুযোগ পাইনি?! তা পেয়েছি!! ওই এক আধবার‌ই, তবু পেয়েছি! সেবার হলোকি ঘোষ সাহেবের বন্ধুরা সব ঠিক করলো ৩১ শে ডিসেম্বর পাহাড়ে কাটানো হবে! বলিহারি এদের বুদ্ধি বাপু!!! তখন কলকাতার ঠান্ডাতেই কাঁপুনি ধরে যায়, আর এরা চললেন পাহাড়!!! তো যাওয়া হলো! ইয়া মোটা মোটা শীতের জামাকাপড় খানিক গায়ে পরে, আর খানিক পোঁটলায় বেঁধে পৌঁছনো হলো দার্জিলিং! সব বন্ধুর ‘হ্যা হ্যা’ হাসি অগ্রাহ্য করে নিজের ঘরে ‘হিটার’-এর বন্দোবস্ত‌ও হয়ে গেলো! তারপরের দৃশ্য‌ই মনে রাখার মতো!!! জনগণ যেই না বাইরে ঘুরেটুরে হোটেলে ঢুকছে, সটান এই ঘরে! হুঁ হুঁ বাপু, সব ঠান্ডা কী এই শর্মার‌ই লাগবে?! তোমরাও ‘বোজো’!!! তো ওই বেড়াতে গিয়েই ঘোষবাবুর সঙ্গে তাঁর গিন্নী মানে আমার একখান ‘রোমান্টিক’ ছবিও উঠলো! ব্যস্, ওই অবধিই! আপনারা বুঝি আরো রোমান্টিক গপ্পো আশা করছিলেন! শীতের সময় এর চেয়ে বেশি রোমান্টিক হ‌ওয়া পোষায় না মশাই! শুনেছি অবিশ্যি এক চাদরে গা মুড়ে, ফায়ার প্লেসের সামনে বসে, রেড ওয়াইন খেতে খেতে গজল শুনতে নাকি বেশ লাগে! আপনার মত আমিও এসব গপ্পোতেই শুনেছি! চাক্ষুষ করার সুযোগ আসেনি!!! ( খিইইই দুঃখু!!!)

এখন সব ভেবেচিন্তে একটা সিদ্ধান্তে এসেছি, বুঝলেন! যখন ছোট ছিলাম, তখনকার সবকিছুর মত‌ই, শীতটাও বেশ ছিলো! কমলালেবু, জয়নগরের মোয়া নিয়ে ছুটির দিনে মায়ের সঙ্গে ছাদে মাদুর পেতে বসার জন্যই তখন শীত আসতো! মাদুরে তখন রোদ্দুরের ‘ওম’ মেখে নিতে ছড়িয়ে রাখা হতো লেপকম্বল! তাতে পিঠ দিয়ে, প্রফেসর শঙ্কু পড়ার চেয়ে ভালো শীতকাল আর হয়নি, আর হবেও না!

তাই বলছিলাম কি, যা গ্যাছে তা তো গ্যাছেই! শীতকালকে আর পিছু ডাকবেন না প্লিজ! যথেষ্ট হয়েছে, এবার এসো বাপু! পরেরবার কাজকর্ম থেকে ছুটিছাটা নিয়ে রাখবোখন, তখন নাহয় বাকি গল্প‌ও শোনানো যাবে! আজ (“হি হি হি হি”) এটুকুই থাক!!! এখন চাদর ছেড়ে রেখে কাজ সেরে নিই! এরপর ঠান্ডায় পুরো জমে গেলে আর নড়াচড়া করতে পারবো বলে মনে হচ্ছে না!

অঞ্জন আচার্য

হয়তো সেদিনও শীত ছিলো

কবি, প্রাবন্ধিক

সেদিন শীত ছিলো কেমন— মনে নেই। তবে হিম ছিলো হয়তো। ১৯৯৫ সাল। ২৩ ডিসেম্বর কিংবা ৭ পৌষ। সন্ধ্যার দিকে হাত-মুখ ধুতে কলপাড়ে গেলো বাবা। ফিরে এসে বারান্দায় উঠার সিঁড়িতে পা রাখবে কি রাখবে না— ইতস্তত করছে। মা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। পাশে দাঁড়ানো আমি। এমন সময় মাকে উদ্দেশ্য করে বাবা বললো— বুকটা ক্যামন জানি খুব ব্যথা করতাছে আজ!

ব্যস্ত মা সেই কথার গুরুত্ব না দিয়ে বলে— ‘তুমার খালি খালি দুঃচিন্তা! ঐসব কিছু না। গ্যাস্টিকের ওষুধ খাও, সব ঠিক হইয়া যাইবো।’

মা চলে গেলো রান্না ঘরে, রাতের রান্না করতে। আমিও চলে গেলাম অন্য ঘরে। আগের দিন মানিকগঞ্জ থেকে ছোট পিসি-পিসামশয় এসেছেন বাড়িতে বেড়াতে। পিসতুত ভাই রাজু, বোন বিজুকে নিয়ে আমাদের জেঠতুতো-কাকাতো ভাইবোনেরা তখন হৈচৈ মেতে আছে। শীতের রাত বলেই হয়তো বেশি রাত জাগার উপায় ছিলো না স্কুল-পড়ুয়া আমাদের কারো। ঠাকুমার ঘরে রাজু ও আমি একসঙ্গেই ঘুমাতে যাই লেপের ভেতরে। হঠাৎ তীব্র চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায়। পাশে শোয়া রাজুকে খুঁজে পাই না। বিছানা ছেড়ে উঠি। স্পষ্ট শুনতে পাই— মায়ের চিৎকার। কান্নায় ভাঙা আর্তনাদ শুনি— ‘ও, জুয়েলের বাবা, কী হইছে তুমার? কথা কও না ক্যা? ও জুয়েলের বাবা।’[আমার বড়দা অসীমের ডাকনাম জুয়েল। বোধের পর থেকে দেখেছি, বাবাকে মা ‘জুয়েলের বাবা’ বলেই ডাকতে।]

ছুটে যাই পাশের ঘরে। বুঝতে অসুবিধা হয় না— এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক কিছু। মেঝেতে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে বাবা। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সবাই। সবার চোখেই জল। সবাই কাঁদছে। সদ্য ঘুম ভাঙা এই আমি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকি বাবার মুখে দিকে। মনে হয়, এক গভীর ঘুমে কাতর আছে। হঠাৎ সেই ভিড় থেকে দৌড়ে গেলাম ঠাকুরঘরে। উপুড় হয়ে পড়লাম ঠাকুরের পায়ে। কেবল এইটুকু উচ্চারণ করতে পারলাম মনে আছে— ঠাকুর, তুমি আমার বাবাকে সুস্থ্য করে দাও। যেকোনো মূল্যে বাবাকে ভালো করে তোলো।

তখনও বুঝিনি কী হারিয়ে ফেলেছি চিরতরে। তখনও জানা নেই— বাবা নেই। প্রবল বিশ্বাসের জোরে শুধু একটা অলৌকিকতার জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম। ভাবছিলাম, ভোর হলেই সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে আগের মতো।

সেই রাতটি যেন আটকে থাকে কোথাও। এসময় জীবনের দীর্ঘতম রাতের পর ভোর আসে। সেই ভোরকে মনে হয় রাতের চেয়েও গাঢ় অন্ধকার। কোনো অলৌকিতা আমার জন্য অপেক্ষা করে না। বিশ্বাসী মনে সেই প্রথম অবিশ্বাসের চাবুক পড়ে।

আমি ভেতর-কান্না মানুষ। প্রকাশ্যে কাঁদতে জানি না। আমার না-কাঁদা দেখে অনেকে ভাবেন, আমি হয়তো খুব শক্ত মনের মানুষ। মোটেই তা নয়। বুকের ভেতর হিরোশিমা-নাগাসাকির কথা কেবল আমিই জানি। জানতে দিই না। জলের একটা স্রোত চোখের বাঁধে এসে অনেকক্ষণ ধরে আঁটকে থাকে। গাল বেয়ে একসময় গলে যায় সাধারণ নিয়মে।

সকাল হতে না হতেই শীতের পোশাক-পরা মানুষগুলো বাড়িতে ভীড় করতে শুরু করে। কুয়াশায় তখন কান্নার শব্দ ভাসতে থাকে এখানে ওখানে। আমি যেন কিছুই দেখি না। কিছুই শুনি না। কেবল বাবার দিকে তাকিয়ে থাকি। কাঁচা বাঁশে বাঁধা হতে থাকে খাটিয়া। তার ওপর বাবাকে শুইয়ে জড়ানো হয় রাতের পরিধেয় লেপ-তোশকে। চন্দনে সাজানো হয় কপাল। চোখের পাতায় রাখা হয় তুলসি। বুকের ওপর ভগবৎ গীতা। আমি আকারে ছোট ও শক্তিতে দুর্বল বলে খাটিয়ায় কাঁধ দিতে দেওয়া হয় না।

ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় লাইলিপট্টিতে আমাদের যে বাড়িটি ছিলো, সেখান থেকে কেওয়াটখালী শ্মশানঘাটের দূরত্ব অনেক। পায়ে চলা পথ নয়। তবে আমরা সবাই হেঁটে চলি। পাশ থেকে আমি গোপনে বাবাকে স্পর্শ করে রাখি। একসময় মনে হয়, কে যেন লেপ দিয়ে বেঁধে রেখেছে এক মস্ত বরফ খণ্ডকে। তার শীতলতা আমার শরীরে তরঙ্গ হয়ে বয়ে যায়। সেই থেকে আজও যখন ২৩ ডিসেম্বর আসে, আজও ৭ পৌষ আসে, আজও যখন শৈত্যপ্রবাহের বার্তা নিয়ে শীত জেঁকে বসে, সেদিন আমি কোনো শীত অনুভব করি না। শীতের পোশাকে উষ্ণতা অনুভব করি না। বরফের আবার শীত কিসে?

কাভার ও অলংকরণ: প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]