শীতে ভালোবাসার পদ্ধতি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাঘ মাস পা রাখলো নিজের আয়ুর শেষপ্রান্তে।তবু শীত যেন এবার নাছোড়বান্দা গোয়েন্দার মতো পেছনে পড়ে আছে আমাদের।ভোরবেলা কুয়াশা হাই তোলে শহর অথবা গ্রামের মাথার উপর।ঝুপসি গাছের মাথায় বসে থাকা একলা পাখির শরীরে আবার উড়ে যাবার ক্লান্তি। বিকেলে হাওয়া নতুন করে কাঁপন ধরায় পাজরে।চায়ের দোকানে কাপের গভীরে চামচের দ্রুত খট খট জানিয়ে দেয় শীত এখনো আছে এ পাড়ায়। ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠা যেন দ্রুত উল্টে গিয়ে আড়মোড়া ভাঙতে চায় ফাল্গুনে।

শীতকাল নিয়ে শীত আসার আগে আমাদের চিন্তার শেষ নেই।ভালো গুড় কবে উঠবে বাজারে, কপিগুলো সাইজে আরও বড় হবে কবে, লেপ, কম্বল ছাদে দেবার জন্য কড়া রোদ পাওয়া যাচ্ছে না, গরম কাপড় সব পড়ে আছে লন্ড্রীতে, পারদ নামতে নামতে বারো হয়ে যাবো না তো! অসংখ্য প্রশ্ন জমা হতে থাকে শীত আসার মুখে। যেন এক যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি। শীত এত প্রশ্নের উত্তর দেয় না। সে তার ওম, ভয় আর কাঁপুনি নিয়ে নিরুত্তর জড়িয়ে ধরে থাকে আমাদের।

শীত নিয়ে আমাদের মাতামাতির শেষ নেই। কিন্তু শীত চেপে বসলেই আপত্তির রব উঠে যায়। শীত বিদায়ের জন্য বাংলা মাসের ঠিকুজি ধরে চলে টানাটানি। মাঘের শীতে বাঘ পালায়;এবার মনে হয় শীত সহজে যাবে না।নানান কথা আর পূর্বাভাসে ভরে ওঠে মানুষের কথার ঘর। শীত বিদায়ের পর্ব নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘শীতে ভালোবাসার পদ্ধতি’।

‘শীতে ভালোবাসার পদ্ধতি’ কবি আবুল হাসানের একটি কবিতার শিরোনাম। শীতকালে ভালোবাসার বিশেষ কোনো পদ্ধতি আছে কি না জানা নেই। কিন্তু শীতকালকে ভালোবাসার নানারকমের পন্থা আছে হয়তো। আবুল হাসান তাঁর কবিতায় লিখেছেন, ‘‘কনক আমরা এবার শীতে নদীর তীরে হো হো হাসবো’’। কবি শীতের নদীর তীরে বসে হাসতে চেয়েছেন। এই হাসির সঙ্গে শীতকাল, রোদ আর সুন্দর সময়ের একটা ছবি জড়িয়ে আছে। বিগত শতাব্দীতে শীতকালের অভিজ্ঞতাও একটু ভিন্ন ছিলো। এখন শীত বাঙালির প্রতি বেশ সদয়ই বলতে হবে। পশ্চিম গোলার্ধের বেশির ভাগ জায়গাতেই যেমন সাত-আট মাস তার দৌরাত্ম্যে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলতে বলতে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, আমাদের সে রকম নয়। কোনোরকমে এক মাস একটু ‘চিলচিলে’ ভাব, তার পরেই আবার ঘুরতে শুরু করে ফ্যান। শৈশবের শীতের সেই সব ধারালো দিনের ছোঁয়াও এখন আর পাওয়া যায় না। খুব কাছেই তুষারশুভ্র হিমালয় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভূগোলের বই থেকে শুরু করে সব জায়গায় আমাদের দেশের স্ট্যাটাস কিন্তু গ্রীষ্মপ্রধান। জীবন অতিষ্ঠ করা গরমের ছাপ আমাদের চিরকালের।স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই পরিচয়ের প্রধান্য মেনে গ্রীষ্ম অথবা বর্ষা নিয়ে প্রচুর সাহিত্য রচনা করেছেন। কিন্তু শীত নিয়ে ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে অথবা শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন’ এরকম কিছু চরণের পরেই তিনি চলে গেছেন ফাল্গুনের বন্দনায়। জীবনানন্দ দাশও আশ্বিন অথবা হেমন্ত নিয়ে অসংখ্য লাইন লিখেলেও শীত তাঁর কবিতায় মৃত্যুর অনুষঙ্গে কুন্ঠিত উঁকি দিয়েই চলে যায়।

কিন্তু শীত তো আমাদের অনেক কথা মনে পড়িয়ে দেয়। আমরা ভাবি এবার শীত এলে গ্রামে চলে যাবো। সেখানে ঘরের পাশে সারারাত শীতের আক্রমণ ঠেকিয়ে ঘন হয়ে থাকা গাছপালার উপর ভোরের শিশির পড়ার যে সোঁদা আর বুনো সুঘ্রাণটি পাওয়া যেতো, তা এখন আর পাওয়া যায়? সন্ধ্যায় মাঠের উপরে সাদা তুলার মতো ছড়িয়ে থাকা কুয়াশার আস্তরণ, শীতের সন্ধ্যায় ক্রিকেট খেলে বাড়ি ফেরার পথে কোথাও পাতা পোড়ানোর তীব্র মিষ্টি গন্ধ, কোনো বাড়িতে মৃদুস্বরে কথা বলা রেডিও এখন কোথায় মিলবে শীতকালে? এখন শীত পড়তে না পড়তেই উবে যায়।গ্রীষ্মকাল চলে আসে তার তেজ নিয়ে শাসন করতে। শীতের এই বিদায় নেয়ার মুহূর্তে তাই মনে হয় জাঁকিয়ে পড়া শীত আরেকটু সময় রাজত্ব করে গেলে ক্ষতি কি?

শীতের ক্ষ্যাপামী দেখা যেতো সেই পেছনে ফেলে আসা সময়ে। সুপারকুল হুডি, জ্যাকেট, ব্লেজার, অফ-শোল্ডার সোয়েটার তখন কোথাও ছিলো না। শীত আসার আগে থেকেই সোয়েটার বানানোর ধুম পড়ে যেতো বাড়িতে বাড়িতে। যখন তখন বারান্দায় দাঁড় করিয়ে গায়ে ছোট্ট এক টুকরো উলেবোনা কাজ ধরে মাপ নেয়া হতো আমাদের। আর অবিশ্রাম চলতো কারো আঙুলে ধরা কাটার ঘর গুনে এগিয়ে চলা। উলের দোকান, ডিজ়াইনের বই আর বিভিন্ন নম্বরের কাঁটা নিয়ে কতো তোলপাড়! দুপুরবেলা ছাদের রোদে শরীর মেলে দিয়ে কাউকে দেখা যেতো নিবিষ্ট মনে উল বুনে চলতে। তৈরি হবে সোয়েটার অথবা বাঁদর টুপি, হাত মোজা। ‘আ টেল অব টু সিটিজ়’ উপন্যাসে আছে,- ফরাসি বিপ্লবের সময় প্যারিসের রাস্তায় বিপ্লবী জনতার হাতে নিহত অভিজাতদের কাটামুন্ডু নিয়ে শোভাযাত্রার সময় মাদাম দেফার্জ-এর মতো মহিলাদের উল বুনতে বুনতে কাটা মাথার নিঃস্পৃহ গণনার কথা।তখনকার শীতকালেক্রিকেট খেলার মাঠেও কখনো চোখে পড়তো এই উল বোনার দৃশ্য। এখনকার ব্যস্ত জীবনে ক্ষণকালের শীতে সেই দৃশ্যগুলো আর চোখে পড়ে না। শীত এখন পাঁচতারা হোটেল অথবা রেস্তোরাঁয় স্টেকে কামড় বসাতে বসাতে, পানীয়র উত্তাপে তুমুল আলোড়িত হতে হতে হাঁসফাস করে। শীত আসছে না কেনো বলে আকুলিবিকুলি করা মানুষজন শীত এলেই তাকে তাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় নানা আয়োজন করে।

শুধু শরীর অথবা মনে নয়, শীত নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে বাংলা সাহিত্যেও। মধ্যযুগে, বিশেষ করে মঙ্গলকাব্যে বা বারোমাস্যায় বারবার ধরা পড়েছে বছরের এই পঞ্চম ঋতু, পৌষ আর মাঘ মাসের শীত।
ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর কালকেতু বধউপাখ্যানে বলেছেন— পউষের প্রবল শীত সুখী যেজন। / তুলি পাড়ি আছারি শীতের নিবারণ ॥ / ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক। / মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক ॥’

আবুল হাসান তাঁর কবিতায় কনককে লাল কার্ডিগান পড়তে বলেছেন। লাল কার্ডিগানে হয়তো লুকিয়ে ছিলো কবির ভালোবাসার স্মৃতি। অন্যদিকে কবি আবিদ আজাদ বলেছেন-‘সব মরবে এবার শীতে / কেবল আমার ফুসফুসের পাতাঝরার শব্দ ছাড়া।শীত একদা এমনই হাহাকার বয়ে নিয়ে আসতো।শীত তখন পড়ার টেবিলের চারপাশে ঝিমধরে উড়তে থাকা মশার শরীর, ধনেপাতার গন্ধে মাখা ভালোবাসা, সবজির উৎসবে ছাপানো মধ্যবিত্ত রান্নাঘর।স্কুলের ছুটির দিনে শীতের রোদে মাখামাখি ছাদে উৃঠে তখন কতো কনককে দেখা যেতো লাল কার্ডিগান পড়ে বিপ্রতীপ কোনো ছাদে ঘুরে বেড়াতে। কতকার চিঠি আসতো শীতে, পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট বিয়ের হিড়িক পড়ে যেতো।

শীত এখন আর নিজের দীর্ঘ উপস্থিতি নিয়ে ঘুমন্ত সাপের মতো পড়ে থাকে না। কোনো কর্পোরেট অফিসের ব্যস্ত এক্সিকিউটিভের মতো তার আছে দৌড়। তাই শীত আসার আগেই শীতকে টের পাওয়ার জন্য চারদিকে এত ব্যস্ততা চোখে পড়ে। তারপর শীত তার খুনী মাত্রায় হাজির হলেই শুরু হয় বসন্তের জন্য কাঁদুনী গাওয়া। কিন্তু তার প্রবল নৈঃশব্দ নিয়ে জমে থাকুক আমাদের দোড়গোড়ায় তাই তো চাই। শীত শীতের মতো করেই আসুক। আবার আরেক বছর এমন শীতের দেখা মিলবে কিনা কে জানে? নির্লজ্জের মতো জীবনের অনেকগুলো বছর বেঁচে কাটানো গেলো। আবার যদি দেখা না হয় এমন শীতের সঙ্গে! শীতে ভালোবাসার পদ্ধতি আমরা আবার কবে ফিরে পাবো কে জানে?

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ প্রাণের বাংলা ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]