শীত চলে গেছে পরশু…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চলে তো যাবেই। সে একা এবং বিচ্ছিন্ন, কুয়াশায়।শীত চলে গেলে কী পড়ে থাকে, প্রাণীকূলের রিপ ভ্যান উইংকেল ব্যাঙের শীতনিদ্রা? পুকুরে সাবমেরিনের মতো ডুব দিয়ে থাকা নৌকার শরীর ভেসে উঠে আশপাশের পৃথিবীকে জানায় এতদিনকার সবুজ অন্ধকারে থাকার গল্প?শীত চলে গেলে চায়ের দোকানের পাশে বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা বাদামী কুকুরটার ঘুম কমে যাবে।কোথায় কোন এক গ্রামের বাড়ির ঘরে জমে থাকবে বিগত শীতে স্তুপ করে রাখা তামাকের তীব্র ঘ্রাণ।আর এইসব গুঢ় পরিবর্তন জানবে বাজারে অমর কবিরাজের দোকানঘরে আলমারির পেছনে একমনে জাল বুনতে থাকা মাকড়সা।

এলোমেলো হাওয়া আসে এখন। পাতা ঝরে পড়তে শুরু করেছে শহরতলায়। সূর্য পাল্টে নিয়েছে কৌণিক অবস্থান পৃথিবীর দিকে। কুয়াশার চাদরকে এবার ধারালো আক্রমণে ছিন্ন করে দেবে বসন্তকাল। দূর আকাশে যে নক্ষত্রমণ্ডল কুয়াশরে কারণে ছিলো অস্পষ্ট তা আবার স্পষ্ট হতে শুরু করবে সন্ধ্যায়। গ্রামে নিথর অন্ধকারে কেউ শুনতে পাবে একটি পাতা খসে পড়ার শব্দ। শীত চলে গেছে। হয়তো আবার কেউ সুপর্ণাকে চিঠি লিখবে শীতকাল কবে আসবে জানতে চেয়ে।

আমাদের ঋতুর মঞ্চে পাল্টে যাওয়া দৃশ্য অভিনীত হবে এখন। শীত পার হয়ে বসন্তে জেগে উঠবে প্রকৃতি আবার্।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো বিদায়ী শীত নিয়ে ‘শীত চলে গেছে পরশু…’।

গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির পাতা উল্টে জানা গেলো, তাদের পূরাণে শীত এসেছে শস্যের দেবী দেমিতার কন্যা হারানোর শোক থেকে।গ্রিক দেবতা হেডিস অপহরণ করেছিলো দেমিতা‘র কন্যাকে। আর তারপরেই দেমিতার শোক শীত হয়ে নেমে আসে পৃথিবীর বুকে।

কিন্তু শীত চলে গেলেও তো কোথাও শীতের জন্য শোক রয়ে যা্য়। যারা শীতের এই যাই যাই দিনে লেপ কাঁথা রোদে মেলে দিয়ে জাল গোটানোর পায়তারা করে, গন্ধরাজ ফুলের গাছের ডালে চেককাটা মাফলার ফেলে রেখে পুকুরের দিকে যায় দুপুরবেলা তাদের কাছে তো শীতের নিষ্ক্রমণ মানে-বাঁচা গেলো। কিন্তু আমাদের কর্কটক্রান্তীয় সূর্যের দেশে শহুরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যারা সন্ধ্যাবেলা ‘চিল’ বলে উঠতে চান, ডিপার্টমেন্ট স্টোরের অ্যাটেনডেন্টের কাছে জানতে চান,‘গুড়ে গন্ধ হবে তো এবার?’ তাদের চমকে দিয়ে মাথার উপর ঘুরতে শুরু করে অনাদিকালের ফ্যান।

কবিরাজের দোকানের মাকড়সাটা কি সত্যিই জানে শীত চলে গেলে কী কী ঘটে? মদনের অফিস ঘরে পুরনো কাশির মতো ঝুলে থাকা তালা জানে? ছোট মাছ আর শালগম দিয়ে রান্না তরকারির অবেলার ঝোল জানে?

বড় বেশি বিবর্ণ শীত। সে কয়েকটা মাস থাকে বিবর্ণ হাওয়া আর ধূলো নাকে টেনে। কিন্তু শীত মানেই এক ধরণের নস্টালজিয়া। ন্যাপথলিনের গন্ধে গন্ধে এক উদাসীন সন্ন্যাসী যেন। কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘‘নাথিং বার্নস লাইক কোল্ড’’। তাই কী চার্লস ডিকেন্সের দুনিয়া কাঁপানো ‘টেল অফ টু সিটিজ’ উপন্যাসের ভয়ংকর নারী চরিত্র মাদাম লাফার্জ ফরাসী বিপ্লবের সময় উল বুনতে বুনতে প্যারিস শহরে গিলোটিনে কাটা মুণ্ডুর হিসাব রাখছিলেন? ডিকেন্সও জানতেন শীত বিপ্লবকেও পোড়ায়? বসন্ত নিয়ে যতোই মাতামাতি থাক শীত এক ভীষণ নির্বিকার, রুদ্ধশ্বাস অন্ধকার। কথাটা উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের। আর জীবনানন্দ দাশ তো সরাসরি লিখেছেন ‘শীতরাত’ কবিতায়-‘‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে’’।কেন মৃত্যু আসে? কেন শীতকালের কোনো নিশিথ কবির কবিতার চরণকে এমন তীব্র করে রেখেছে? জীবনানন্দ দাশের বহু প্রেমের কবিতায় বসন্তের বন্দনা আছে। আশ্বিন কোনো কোনো কবিতায় আশ্চর্য উদাসীনতা তৈরি করেছে। কিন্তু শীত যেন খুনী তার কবিতায়; মৃত্যুর ঘোষণা দেয়।হৃদয় মরে যায়, ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়।বিপাশামদির নাগপাশ জড়িয়ে ধরে। তবুও শীতের জন্য আমাদের আক্ষেপ থেকে যায়।

বাংলা সনের পঞ্চম ঋতু শীত। প্রকৃতি শীতে শুষ্ক হয়ে আসে। বৃষ্টিপাতও কমে যায়।অন্য মাসগুলোর যেমন অনেক আয়োজন থাকে আচরণে শীতের তেমনটা নেই। কিন্তু তবুও শীতকাল বাঙালির জীবনে জুড়ে থাকে উৎসবের সময় হয়ে। পিঠা তৈরি হয়, বিয়ের ধুম লাগে, মানুষ ভ্রমণে বের হয়, শীতের ঝকঝকে সবজি চিঠি লেখে আকাশকে। থাকে অলস দুপুরে লেপের নিচে শুয়ে গাঢ় শার্লক হোমস অথবা ফেলুদা। কারো জন্য এক জীবন ধরে বোনা সোয়েটারের উপন্যাস। কিন্তু তারপরেও শীত কেমন যেন এক ব্যর্থ প্রেমিক।কোথায় যেন তার ব্যথা জড়িয়ে থাকে। মাও জে দং একবার বলেছিলেন, ‘জ্যাকেট, সোয়েটার ও মাফলার দিয়ে শরীর ঘেরাও করো। এটাই প্রতিক্রিয়াশীল শীতকে পরাজিত করার একমাত্র উপায়।’ শীতের শ্রেণী চরিত্র প্রতিক্রিয়াশীল কি না জানা নেই। কিন্তু হারানোর বেদনা যে লেখা থাকে শীতের শরীরে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই শহরে শীত ফুরিয়ে গেলে আরও কত কী জুড়ে যায়। বইমেলা আসে ফাল্গুনের হাওয়ায় উড়তে উড়তে। অনেক রাতে একা বাড়ি ফিরতে গিয়ে একলা পথিক পথ ভুল করে আচমকা পেঁচার ডাক শুনে। শহরের শূন্য পথে পাতা ঝরে, শিশিরের স্মৃতি কোনো এক মাকড়সার জালে।পথের আলোর চোখ বাঁধতে পারে না কুয়াশা। কুকুরগুলো ঘুমিয়ে পড়ে না নির্মানাধীন বাড়ির সামনে বালির স্তুপে। শীত শেষ হয়ে যায়। স্মৃতি পড়ে থাকে যেন আরেক জন্মের।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল  


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments