শীত চায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কখন চায়? গভীর রাতে শহরতলীর বিচ্ছিন্ন পথের অংশে একমনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের অন্ধকার আড়াল থেকে হঠাৎ ডেকে ওঠে প্যাঁচা। তার আত্মার ভেতরে আরও একা হয়ে যেতে চায় শীত ? ঠাণ্ডা লেগে আরও কড়মড়ে আর শক্ত হয়ে যাওয়া  টিনের চাল অজানা পাখিদের নৈশ মহড়ার শব্দ শোনা যায়। শব্দগুলো ঘরের ভেতরে নিভে আসা হ্যারিকেনের আলোকে আরেকটু চমকে দিতে  প্রার্থনা করে আরেকটু শীত  ? কে জানে কে কখন ভাংতি পয়সার মতো পকেট হাতড়ায় শীতের খোঁজে! ঘরের কোণে মাকড়সা জাল বোনে। কোনো বাড়ির অন্যমনষ্ক একমুঠো বাগানে ঝরে পড়ছে হয়তো নির্জন শিউলি ফুল। আসন্ন দূর্গাপূজার আনন্দের মতো ওরাও জানে শীত আসছে। শুধু আমরাই জানি না! পাপের মতোন বাড়তে থাকা এই শহর প্রান্তরের মানুষ আমরাও হঠাৎ কখনো জানতে চাই কবে আসবে শীতকাল? তবুও সময়টাই কেমন অন্যরকম। আমার মন কেমন করে। বেলা বাড়লে পথের পাশে অনির্দিষ্ট দাঁড়িয়ে থাকে কেউ। কারো আবছা, মলিন স্মৃতি আর বাড়ি ফেরে না। মিঠে রোদ আর হারিয়ে যাওয়া রেলিংয়ের গল্পে হারিয়ে যায় তারা। যেরকম চেনা চায়ের দোকান ঠিকানা পাল্টে হারিয়ে যায় অন্য কোথাও। আচ্ছা, শীতকাল কি শুধুই বিচ্ছেদের স্মৃতি? নীরবতা আর অন্ধকারের অনুভূতি? হয়তো তাই। হয়তো শীত সুখী সময়ের গল্পও। অনেক আলো, অনেক উৎসব আর সম্পন্ন সময়ের আখ্যান। রান্নাঘরে কপি আর আলুতে মাখামাখি করার দিন। সুদিনে তো শুনতে পাই মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সংখ্যা কমে যায়। তাই শীতের জন্য অপেক্ষা। সে অপেক্ষা অক্টোবরের উষ্ণ আবহাওয়ায় ভোরবেলা পথে নেমে ডাকে শীতকালকে।  শীত ঋতুও হয়তো চায় মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষার একটু উষ্ণতায় জড়িয়ে থাকতে। এই সংখ্যা প্রাণের বাংলায় প্রচ্ছদ আয়োজনেও শীতের জন্য অপেক্ষার কথা ‘শীত চায়…’। 

আশ্বিন মাসের প্রায় শেষ ভাগ চলছে এখন। পূজার উৎসব উৎসব গন্ধ চারদিকে। কিন্তু এই থৈ থৈ আনন্দের আবহের মাঝেও আশ্বিনের কোথায় যেন বিচ্ছেদের সুর লেগে থাকে। অকারণে হু হু করে মন। পাতা পোড়ানোর ঘ্রাণ আর দূর থেকে ভেসে আসা পূজার ঢাকের আওয়াজে ফেলে আসা স্মৃতির গল্প গভীর হতে থাকে। বাড়ে শীতের জন্য অপেক্ষা। কিন্তু সেই শীত কোথায় এখন? পৃথিবীজুড়ে উষ্ণায়নের চাপে শীত কোনঠাসা। বাঙালীর জীবনে শীতের সকাল, টেনে নেয়া লেপ, গরম চা, সেলুনের বেঞ্চিতে বসে খবরের কাগজের পাতা উল্টানো, ছাদের রেলিংয়ে শীতবস্ত্র রোদে দেয়া-এসব এখন বিলাসিতা।

বাংলা ক্যালেন্ডার বলে, ছয় ঋতুর কথা। এই ষড় ঋতুতে শীতের আগমন বৈচিত্রময়। প্রকৃতি আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাবে বছরের ১২টি মাস ২মাস করে ৬টি ঋতুতে ভাগ হয়েছে। এই ৬টি ঋতু হলো গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত আর বসন্ত প্রকৃতির উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। শুষ্ক অবয়ব আর হিমশীতল অনুভব নিয়ে আসে শীত। কিন্তু তারপরেও আশ্বিন মাসের উষ্ণ আবহাওয়ায়   বসে সেই শীতের জন্য অপেক্ষার কথা উড়ছে উত্তরের মৃদু হাওয়ায়।

শীতকাল প্রতিবারই ফিরে এসে ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি ডেকে আনে। এই যে লিখতে লিখতে ঢুকে পড়লাম কোনো শীতকালের বিকেলে পাড়ার গলিতে ক্রিকেট খেলায়! একটা মাত্র ভাঙ্গা ব্যাট, বলটার অবস্থাও করুণ, তবু সূর্যের নিভু নিভু আয়ুতে সেই খেলা ফুরায় না। বাড়ি থেকে ডাক ভেসে আসে-বাসায় আসতে হবে না? উত্তরে বলি-লাস্ট ওভার। এই যে এখন এক অদ্ভুত খেলার ভেতরে ঢুকে পড়েছি যখন যে কোনো সময় শুনতে পাবো ‘হাও ইজ দ্যাট?’ আম্পায়ার গম্ভীর মুখে আঙুল তুলে দেবে, তখনও মনের মধ্যে টের পাই, শীতের ভোরে গলির ভেতরে ঘড়বাড়িগুলো গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো । ডেকে যেতো মাঠাওয়ালা, আসতো খবরের কাগজ দরজার তলা দিয়ে। আকাশ হয়ে থাকতো ফটফটে নীল।

শীত হয়তো এখনও বহু দূরে। কেউ হয়তো লেখা পড়তে পড়তে ভাববেন, শীতের গীত এত আগে কেন! আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে, তাপমাত্রা এখনও কমতে শুরু করেনি। তবু রাতগুলোকে কেমন একা মনে হয়। ভোরবেলা বৃষ্টি নামে আকাশের পাড়ায় রীতিমতো হাঁকডাক করেই।গাছপালার গায়ে শীতের অপেক্ষার পোস্টার পড়ে।  তাই শীতের জন্য অপেক্ষা করতে তো দোষ নেই। চলে যেতে বাধা নেই মনের ভেতরে সিঁড়ির পর সিঁড়ি টপকে স্মৃতির পাতালপুরীতে। সেই কবে এক শীতকালে সে-ও নির্জন দুপুরে কথা বলেছিলো কারো সঙ্গে। বড় বড় চোখ ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছিলো তার শীতের সব নির্জনতা। আবার সে চলে গিয়েছলো সব স্মৃতি ফেলে। তাদের শূন্য বাড়িতে আত্নহত্যা করেছিলো শীতের হাওয়া।

এখন  এই শীতের শুরুতে হয়তো হালকা কুয়াশার পরত পড়তে শুরু করেছে গ্রামে। ম্লানমুখ, রক্তহীনতায় ভুগতে থাকা রুগীর মতো বিকেল মিশে যাচ্ছে কুয়াশা অথবা পাতা পোড়ানোর ধোঁয়ায়। কতকাল আগে কোনো বাড়ির ঘরে ঘরে জ্বলছে হ্যারিকেন, দূরে কোন পাড়া থেকে ভেসে আসছে কীর্তনের সুর। আকাশে ফুটে উঠছে একটি দুটি তারা। শীত কখনো কখনো বধির করে দেয়। টুপটাপ ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ শুধু চারপাশে। শোনা যায় রাত্রিচর পাখিদের ডানা ভাঙ্গছে শীতরাতের মৌনতা। জীবনানন্দ দাশ বোধ হয় এমনি সব রাতের কথা ভেবে লিখেছিলেন: ‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;/ বাইরে হয়ত শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা।’

ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার আগে গত শীতে যে পরিযায়ী পাখিটা নিবিড় প্রতিশ্রুতি রেখে গিয়েছিলো, এবার নিশ্চিত আসবে সে। আরও গভীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসবে। গত শীতে পিকনিকে প্রেমিকাকে ছুঁতে চাওয়া হাত এবার হয়তো সফল হবে। কারো না কারো সঙ্গে হয়তো এই শীতে দেখা হলে বিস্ময়কে দাঁড় করিয়ে রেখে পার্কে বসবে কেউ। কড়া চিনি দেয়া দুধ চা নিয়ম ভেঙ্গে ঢুকে পড়বে গল্পে, হাই তুলবে পথের কুকুর গভীর আলস্যে। বিক্রি হবে শীতের পোশাক, আলো ঝলমল কেকের দোকান সেজে উঠবে বড়দিনে। শীতের প্রেমিকদের সীমাহীন অপেক্ষা। অপেক্ষা আছে বলেই মুহূর্তরা আসে।শীতও চায় এমন সব গল্পে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে সেই একা প্যাঁচাটির মতো।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ ইন্সটাগ্রাম, গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box