শুক্রবারের গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাহিদা আরবী ছুটি

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

অস্ট্রেলিয়া আসার পর শুক্রবার আমার জন্য আর আলাদা কোনো মানে বহন করেনা। ফ্রাইডে নাইট বলতে যা বোঝায় এই দেশগুলোতে, তার কোনো কিছুই আমি করিনা। গত ১১ বছর ধরে এই দেশে থাকলেও নাইট ক্লাব, ডে ক্লাব কোনোকিছুতেই আমার কখনো যাওয়া হয়নি।এই দেশের প্রায় সব অফিসেই -সপ্তাহ শেষে ম্যানেজার – এমপ্লয়ী তাদের যার যার দূরত্ব ভুলে, একসঙ্গে ড্রিংক করতে যায় শুক্রবার সন্ধ্যায়। এমনকি তাদের সঙ্গেও আমার কখনো কোক ফান্টা পান করতে যাওয়া হয়নি।

আব্বুর সঙ্গে ছোট্ট আমি

না না, আমি এমন কোনো ভদ্র- ফেরেশতা তুল্লো মানুষ না। মানুষ শব্দ থেকে ‘নুষ’ বাদ দিলে যা থাকে, আমি আসলে তাইই। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমি এমন ঝাকানাকা দেশে নিরস জীবন যাপন করি।

আমি যখন দেশে ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম, তখন শুক্রবারে সব বন্ধুবান্ধবরা ক্যাম্পাস এ আড্ডা দিতে যেতো বিকেলে। আমি অনেক আড্ডাবাজ মানুষ হলেও, সেই আড্ডাও আমার মিস হতো। কারণ শুক্রবারে আমি ‘মেয়ে’ মানুষ হয়ে যেতাম। নিজেকে মানুষ দাবি করা এই আমি, শুধু সেদিন মেয়ে মানুষ হয়ে যেতাম কিভাবে, সেই গল্পটা আজ বলি।

এক.
আমি আমাদের পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য। তাই বাকিদের তথাকথিত নিয়মে আগে বিয়ে হয়ে যায় এবং তারা যার যার সংসারে স্বাভাবিকভাবে ব্যস্ত হয়ে যায়। সবাই প্রায় দেশের বাইরে সেটলড। শুধু বাকি থাকা এই আমি, ভালোবাসাসহ এক দায়িত্ববোধের মধ্যে পরে গিয়েছিলাম।
সেই দায়িত্ববোধ বিশাল কিছু ছিলোনা – শুধু শুক্রবারে আব্বুর কবরেস্থানে যাওয়া। কবরে মানুষ যায় জেয়ারত করতে – কিন্তু মেয়ে মানুষ হয়ে বাংলাদেশে কবরস্থান যাওয়া তখন এতো সহজ ছিলোনা।

শুক্রবার দুপুরে খেয়েই আমি রওনা দিতাম জুরাইন কবরস্থানে – কখনো কখনো সেখানে মিলাদ, জানাজা ইত্যাদি চলতে থাকতো। তখন আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে হতো… এমনিতেই মেয়ে মানুষ, তার উপর হিজাব/বোরখা পরা নেই , চোখে পানি নাই, আমাকে দেখেই মনে হতো কবরস্থানে আসাটা খুব আনন্দের বিষয়।তাই হুজুর আমাকে কঠিন নির্দেশ দিয়েছিলো, আমি যেনো অবশ্যই সবার সামনে ঢেঙ ঢেঙ করে, আমার চেলা বেলা নিয়ে কবরস্থানে ঢুকে না পরি..

আমার চেলা বেলা ছিল দুইজন – একজন আমজাদ আরেকজন সজীব। আমজাদ সবার কবর খুড়তো এবং কবরের ফিনিশিং টাচ দিতো আর সজীব সব কবরগুলোর পাশে গাছ লাগাতো এবং সেসব গাছে পানি দিতো। আমি রিকশা থেকে নামতেই ওরা দৌড়ে আসতো – বলতো ‘ছুটি আফা, আজকে কঠিন খানাদানার ব্যবস্থা হইসে , অমুকের মায়ের কবরে মিলাদ এরপর তেহারি ছিলো সিন্নি। আপনার জন্য সামান্য রাখসি ,চলেন খাবেন?’ হুজুর মুচকি মুচকি হাসতেনা এবং বলতেন -‘এই দুই পাগল শুক্কুরবার সকাল থিকা আপনার জন্য অপেক্ষা করে’…

তবে হুজুর মাঝেমধ্যে ঘ্যান ঘ্যান করে বলতো – ” আপা, শুধু শুক্কুরবার যদি একটু হিজাব পড়তেন , তাইলে মনে হয় ভালো হইতো ” …
আমজাদের হাতে সব সময় থাকতো শাবল, আর মেজাজ থাকতো তিরিক্ষি। কে জানে সারাক্ষন হয়তো সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে ওকে কাজ করতে হতো বলেই মেজাজ ঠিক থাকতোনা …
আমজাদ তখন দাঁত কিড়মিড় করে বলতো – ‘বাপের লিগা ভালোবাসা বুকের মইধ্যে থাকে হিজাবের নিচে না’… ওর হাতে শাবল থাকার জন্যই হোক আর যেকারোনেই হোক হুজুর আর কথা বাড়াতোনা। ওর এই কথা আমার আজও কানে বাজে …

তিনজনের এই টিম নিয়ে আমার শুক্রবার পুরো বিকেলটা কেটে যেতো।

দুই.
একদিন রিকশা থেকে নামার পর, এক বোরখা পড়া মহিলা দৌড়ে আসে… উনি আমজাদের মা। আমজাদ তখন দূরে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে বিড়ি খাচ্ছে। সেই মহিলা বললো -‘ তুমার কথা শুনসি মাগো , আমজাদ শুক্কুরবারে রাইতে খাওনের টাইম এ তোমার গীত গায়’..

আমি হাসতে হাসতে বললাম কি গীত গায়? ওর মা তখন ও’র ভাষায় বললো-
“মা প্রত্যেইইক শুক্কুরবারে পরীর লাহান এক আফা আসে হের্ বাপের কবর জিয়ারতে , জিয়ারতে আইসা সবাই কাঁন্দে আর এই আফা হের্ স্যান্ডেল আমার হাতে দিয়া বাপের ক্ববর জোড়ায় ধইরা শুইয়া থাকে, দেকলে মনে ওয় বাপেরে জড়ায়া ধইরা রইসে … মাইয়া মানুষ কবরের উপর পইড়া থাকে , হুজুর কিসু কয়না – এই আফার জিয়ারত ওইন্ন জিনিস’ …

আমার জিয়ারত মোটেও অন্য জিনিস ছিলো না – আর দশটা সাধারণ জিয়ারত এর মতনই – হুজুর দোয়া পড়তো, তারপর আমজাদ নতুন মাটির প্রলেপ দিতো, সজীব পানি এনে দিতো আর আমি গাছে পানি দিতাম. আব্বুর পাশের দুইটা কবরেও দিতাম – আমজাদ আর সজীব মহা বিরক্ত হতো …

আমি ‘প্রত্যেইইক শুক্কুরবার’ যেতাম সেটাও ভুল কথা – মাসের বিশেষ দিনগুলোতে শুক্রবার পড়লে যেতাম না. তখন আমার টিম আমাকে রিপোর্ট করতো, হুজুরের ফোনে আমজাদ সজীবের নামে বিচার দিতো। সজীব পানি দিতে সামান্য গাফলতি করেছে, আমি পরেরবার যেয়ে যেন ওকে অবশ্যই ঠুয়া দেই।

সজীবের মাথা সবসময় কামানো থাকতো -১৩/১৪ বছরের কিশোর সজীবের মাথায় আমি কোনোদিন চুল দেখিনি। তাই বেশি দুষ্টামি করলেই আমি ওকে চোখ রাঙিয়ে বলতাম – ‘সজীব তুই কিন্তু একদিন সত্যি সত্যি আমার হাতে ঠুয়া খাবি।’ সজীব মাড়ির সবকয়টা দাঁত বের করে হাসতো – ওর চোখ দেখলেই বোঝা যেতো ওর খুব ঠুয়া খেতে ইচ্ছে করে আমার হাতে। সেই সজীবকে মাথায় হাত বুলিয়ে রিকশায় উঠার সময় বলতাম – ‘গাছগুলোতে পানি দিতে গাফলতি করবিনা আমি কিন্তু ঠিক টের পাবো সামনের শুক্রবারে’…

পরিশেষে:

Allah the Most Knowledgeable, knows what is most correct and best.

মুসলমান মহিলাদের কবরস্থানে প্রবেশাধিকার একটা কন্ট্রোভার্সিয়াল ব্যাপার। আমি আমার জানাটুকু শেয়ার করছি। ভুল হলে, ক্ষমা করে এবং রেফারেন্স দিয়ে সঠিক করে দিবেন আশা করছি।

শুরুর দিকে আমাদের নবীজি মহিলাদের কবরস্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার কারণ ছিল : মেয়ে মানুষ স্বভাবতই একটু বেশি ইমোশনাল, কবরস্থানে তারা আবেগপ্রবণ হয়ে মৃত মানুষের জন্য শব্দ করে কান্না করতে পারে। মেয়েদের গলার স্বর হাই পিচের হয় – তাই কান্নায় শব্দ হবে এটাকে স্বাভাবিক ভাবে নেয়া হয়েছিলো। মৃত আত্মীয়ের জন্য নীরবে কান্না করতে হয় , তাদের জন্য শব্দ করে কান্না ইসলামে নিষিদ্ধ এবং তা কবরের আজাব বাড়ায়। তাছাড়া জাহিলিয়ার যুগে শব্দ করে কান্না করা এক ধরণের আচার ছিলো… আরেকটা কারণ হলো , কবরস্থান খুব নীরব এবং আইসোল্যাটেড জায়গা। মেয়েদের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়না সেখানে।

পরবর্তীতে, মেয়েদের করস্থানে প্রবেশাধিকারের উপর নবীজি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন – তখনও দুইটা কারণ স্পষ্ট করে বলা হয় –
প্রথমত, মরতে সবাইকে হবে , কবরস্থানে গেলে মৃত্যু চিন্তা আসবে , পরকালের চিন্তা আসবে। পরকালের চিন্তা শুধু ছেলেরা করবে কিন্তু মেয়েরা না – এই ডিসক্রিমিনেশন ইসলাম ধর্মে নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে- হজরত আয়েশা সিদ্দিকা নিয়মিত তার ভাই আব্দুর রহমান এর কবরে জিয়ারত করতে যেতেন, হজরত ফাতেমা জোহরা তার চাচা হজরত হামজা’র কবর জিয়ারতে যেতেন।

দ্বিতীয়ত, কবরস্থানে সবাই তার মৃত আত্মীয়স্বজন এর জন্য দোয়া করতে যায়, কোনো চিল করতে যায়না। এই দোয়া করাটা খুব জরুরি – এই দোয়া তার মৃত আত্মীয়ের উপর আজাব কমানোর দোয়া, মাফ চাওয়ার দোয়া। যেটা কাজে লাগলে লাগতেও পারে (only Allah will decide) এবং সন্তানের দোয়া সবচেয়ে বেশি এফেক্টিভ । কিন্তু সেই দোয়া এমন হবেনা – যে, ‘আব্বু আমি অনেক কষ্টে আছি, আমাকে কষ্ট মুক্ত করে দা’ মৃত মানুষ শুনতে পায়না, দোয়া কবুল করার মালিক আল্লাহ এবং দোয়া আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে।

আমার বয়স তখন অল্প ছিল, কবরস্থানে যাওয়া না যাওয়া কতটুকু পাপ পুন্য সেই হিসাব আমার জানা ছিলোনা। তারউপর আমার বাবার কবর জিয়ারত করার মতন সেসময় আর কেউ ছিলোনা। তাই আবারো বলছি,

‘Allah the Most Knowledgeable, knows what is most correct and best’.

সবাইকে হ্যাপি ফ্রাইডে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]