শুধুমাত্র চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মীদের জন্য

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. এম আল মামুন

(তাবুক, সৌদি আরব থেকে): বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে সবচাইতে বেশি সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে কারা? এই সহজ প্রশ্নটির উত্তর আমরা সবাই জানি। করোনা রোগীদের (সন্দেহজনক এবং নিশ্চিতকৃত) চিকিৎসায় নিয়োজিত সকল চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা যে প্রবল ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছেন, তার জন্যে চিকিৎসক হিসেবে আমরা কতটুকু প্রস্তুত? আপনি প্রতিদিনই হাসপাতালে, ক্লিনিকে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা আপনার ব্যক্তিগত চেম্বারে যে সব রোগী দেখছেন, তাদের মধ্যে যে কেউই করোনা ভাইরাস বহনকারী (উপসর্গসহ বা উপসর্গবিহীন) হতে পারে।

উন্নত দেশগুলোতে কর্মক্ষেত্রে যে কোনও ধরণের ইনফেকশন থেকে চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য প্রতিটি হেলথ্ কেয়ার সেটিং-এ একটি নির্দিষ্ট সুসজ্জিত বিভাগ কাজ করে। সেটি হলো “ইনফেকশন প্রিভেনশন এণ্ড কন্ট্রোল” বিভাগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন একজন এপিডেমিওলজিস্ট। এই বিভাগটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ- নিয়মিত চিকিৎসাকর্মীদের ইনফেকশন প্রিভেনশন এণ্ড কন্ট্রোল বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া, সচেতন করা, সতর্ক করা, মনিটর করা, PPE [Personal Protective Equipments] সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা, ইত্যাদি। যেমন, রোগী হ্যাণ্ডেল করতে হলে কখন হ্যাণ্ড হাইজিন অত্যাবশ্যক, হ্যাণ্ড হাইজিন-এর সঠিক পদ্ধতি, কোন্ প্রেক্ষিতে কোন্ PPE পরিধান করতে হবে, পিপিই পরিধান ও খোলার সঠিক ক্রম বা সিরিয়াল, কখন Standard Precaution নিতে হয়, কোন্ ক্ষেত্রে কোন্ Transmission-based Precaution নেয়া জরুরী, কয় ধরণের Transmission-based Precaution আছে, Isolation Precaution গুলো কি কি, ইত্যাদি।

দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশে হাতে গোনা দু’ একটি করপোরেট হাসপাতাল ছাড়া সরকারী কিংবা বেসরকারী কোনও হেলথ্ কেয়ার সেটিংস্-এ “ইনফেকশন প্রিভেনশন এণ্ড কন্ট্রোল বিভাগ”-এর কোনও অস্তিত্ত্ব নাই। চিকিৎসক হিসেবে আমরা কি জানি, N-95 Respirator ব্যবহার করতে হলে আমাদের আগে থেকেই “Fit Test” করা থাকতে হবে? ফিট টেস্ট সম্পর্কে কি আমাদের পরিস্কার কোনও ধারণা আছে? ফিট টেস্ট হলো আপনার মুখমণ্ডলে রেসপিরেটরের ওপরে একটি বিশেষ ডিভাইস পরিয়ে, আপনার নাকের কাছে এক ধরণের তরল কেমিক্যাল স্প্রে করে দেখা হয়, কোন্ সাইজ কিংবা কোম্পানির N-95 Respirator [এই রেসপিরেটর বিভিন্ন সাইজের ও টাইপের হয়] আপনার মুখমণ্ডলের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। অর্থাৎ কোন্ রেসপিরটেরটি আপনাকে airborne infection থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দেবে। এই ফিট টেস্টের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি চিকিৎসাকর্মীকে গলায় ঝুলানোর জন্য একটি আইডি কার্ড দেয়া হয়, যেটাতে লেখা থাকে প্রয়োজনের সময় ঐ চিকিৎসাকর্মী কোন্ সাইজের এবং কোন্ কোম্পানির N-95 Respirator পরবেন। উল্লেখ্য, আপনার মুখমণ্ডলে যদি দাঁড়ি থাকে, তাহলে আপনি বাই ডিফল্ট N-95 Respirator পরার অনুপোযুক্ত। সে ক্ষেত্রে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে Powered Air Purifying Respirator [PAPR]।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ কে বিশ্বমারী [প্যানডেমিক] ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশে উপরোক্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনফেকশন প্রিভেনশন ও কন্ট্রোল বিষয়ক কম্পোনেন্টগুলো হাতে কলমে শেখানোর কেউ নাই। তাই চিকিৎসক হিসেবে আমাদের সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। জেনে রাখুন, Standard Precaution ছাড়াও ‘কোভিড-১৯’ রোগের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসাকর্মীদের আরও দুই ধরণের precaution নিতে বলেছে। Contact Precaution এবং Droplet Precaution । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি এ ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক। সিডিসি চিকিৎসাকর্মীদের নিতে বলেছে Standard Precaution, Contact Precaution এবং Airborne Precaution।

Contact Precaution -এর মানে হলো আপনাকে শরীর ঢাকতে হবে নন-স্টেরাইল গাউন দিয়ে এবং হাতে পরতে হবে নন-স্টেরাইল হ্যাণ্ড গ্লাভস্। Droplet Precaution মানে আপনাকে মুখে পরতে হবে সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ফেস শিল্ড বা বিশেষ ধরণের চশমা [Goggles]। আর Airborne Precaution মানে হচ্ছে সার্জিক্যাল মাস্কের পরিবর্তে আপনাকে পরিধান করতে হবে N-95 Respirator। তবে এ ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই আগে থেকে করা ফিট টেস্টে উত্তীর্ণ হতে হবে, আর পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী হলে ক্লিন শেভড্ হতে হবে।

PPE পরিধানের ক্ষেত্রে কোনটার পর কোনটা পরবেন? কিংবা খুলে ফেলার সময় কোনটা আগে খুলবেন, কোনটা পরে খুলবেন? পিপিই পরিধান ও খুলে ফেলারও একটা নির্দিষ্ট ক্রম বা সিরিয়াল আছে। চিকিৎসক হিসেবে এটি জানা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। PPE পরার সময় হ্যাণ্ড হাইজিন করে নিয়ে প্রথমে গাউন, তারপর ফেসমাস্ক, তারপর ফেসশিল্ড বা বিশেষ চশমা [Goggles], শেষে হ্যাণ্ড গ্লাভস্।

আর খুলে ফেলার সময় সবচাইতে আগে খুলতে হবে হ্যাণ্ড গ্লাভস্। কারণ, রোগীর সেবা দিতে গিয়ে এই হ্যাণ্ড গ্লাভস্-ই হয় সবচেয়ে বেশি কন্টামিনেটেড। এরপর খুলতে হবে ফেসশিল্ড বা বিশেষ চশমা [Goggles], তারপর গাউন। সবশেষে খুলতে হবে মাস্ক, এবং সেটা রোগীর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে, কারণটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। PPE খোলার পর হ্যাণ্ড হাইজিন করে নিতে ভুলবেন না। আর হ্যাঁ, ব্যবহারের পর PPE-গুলো যেখানে সেখানে না রেখে, নির্দিষ্ট ‘ইনফেকশাস্ মেডিকেল ওয়েস্ট’ বিন বা ব্যাগ-এ ফেলে ঢাকনা দিয়ে রেখে রাখুন।

আরেকটি কথা। যে কোনও জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্টের রোগীর সঙ্গে কথা বলা শুরু করার আগেই ভিজুয়াল ট্রায়াজের মাধ্যমে উপসর্গগুলো সনাক্ত করুন এবং রোগীকে সার্জিক্যাল মাস্ক অফার করুন। তারপর নিজে পিপিই পরিধান করে নিয়ে রোগীর সঙ্গে কথা বলুন এবং সেবা দিন।

আরব্য মরুভূমির দেশ সৌদি আরব-এর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আমি প্রায় একযুগ ধরে কাজ করছি একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল এক্সপার্ট হিসেবে। এখানকার প্রতিটি হাসপাতালে, এমনকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও সুসজ্জিত “ইনফেকশন প্রিভেনশন এণ্ড কন্ট্রোল” বিভাগ রয়েছে। সেই ২০০৯ সালের এইচ-ওয়ান এন-ওয়ান প্যানডেমিক-এর এবং ২০১২ সালের মার্স করোনা [মিডিল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনা] মহামারীর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং প্রশিক্ষিত এখানকার প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মী। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা এখন মোকাবেলা করছি কোভিড-১৯ প্যানডেমিক-এর।

কোভিড-১৯ প্রতিরোধে এবং চিকিৎসায় নিয়োজিত বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল চিকিৎক এবং চিকিৎসাকর্মী নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন, সুরক্ষিত থাকুন।

ছবি: গুগল

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউ এস সিডিসি

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল এক্সপার্ট, সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]