শুনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার

২.
বনসুন্দরী থেকে কোনাবাড়ি দিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মেইন রোডে বেবিট্যাক্সিটা উঠতেই শুদ্ধ আশ্বস্ত বোধ করে, যাক! এবার তাহলে সত্যি সত্যি যাওয়া হচ্ছে! আর কোনো পিছুটান নেই, নেই কোনো বাঁধাও। কোনাবাড়ি থেকে মৌচাক, মৌচাক থেকে শফিপুর, শফিপুর থেকে চান্দ্রা। তারপর মওকা বুঝে তেঁতুলিয়া বা পঞ্চগড়ের বাস যদি পায় তো ভালো, তা না হলেও ক্ষতি নেই, উত্তরের যে কোনো বাসে উঠে পড়লেই হলো! তেঁতুলিয়ায় কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে যাওয়া যাবে। এই নিশ্চিন্তির সুবাসে ওর মন কেমন এলেবেলে হয়ে উঠে এবং এটা ওর প্রতিবারই হয়, এই যে কোথাও বেরিয়ে পড়বার সময় মনখুশির এই প্রস্রবিণী, জানে না এটা ওর আনন্দ নাকি মুক্তির উজান-টান!

কবে থেকে ঠিক কোন সময়ে ওর মনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার এই প্রসবযন্ত্রণা তৈরি হয়েছিল- ও বলতে পারবে না। শুধু মনে আছে, ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে মাঝেমধ্যে, সম্ভবত সেটা সাপ্তাহিক ছুটির দিনই হবে, ভোরবেলায় রেলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অথবা বাবার কোলে চেপে কাছেপিঠেই কোথাও চলে যাওয়ার কথা! অবশ্য কখনো-সখনো বিকেলেও যাওয়া হতো সূর্যাস্তের আগেভাগে। রক্তলাল সূর্যের আভায় শহরতলির পশ্চিম আকাশ তখন মায়াময় হয়ে উঠতো। একসময় বাবাছেলে দুজনই বসে পড়তো ঘাসের শয্যায়। বাবা কী এক ভাবনায় তন্ময় হয়ে পড়তেন। তারপর ঝটিতিই আবার আঁধার ঘন হয়ে আসতেই দ্রুত উঠে বাসায় ফেরা হতো। তবে চাঁদনিরাতে বিলম্বিত হতো এই ঘরে ফেরা। সেই অধ্যায় থেকেই বোধহয় জোনাকির আলো আর তারার মিটিমিটি আলো হৃদয়ের কুঠুরিতে চির-দেদিপ্যমান হয়ে রইলো। এসবই দূর-শৈশবের কথা, সেই যখন ওরা ঢাকার কুর্মিটোলায় থাকতো স্টাফ কোয়ার্টারে- বাবা ছিলেন এয়ার ফোর্সের ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার।
কুর্মিটোলা-বাসের সে-সুখস্মৃতি অবশ্য খুব বেশিদিন জুটেনি কপালে। অপ্রত্যাশিত এক আঘাতে ওদের সুখের সংসারটা ভেঙে তছনছ হয়েছিল। অপ্রত্যাশিত তো বটেই, দুঃস্বপ্নেরও অতীত। তখন ওর বয়স কত হবে! চার কী সাড়ে চারবছর! ১৯৭৭ সালের ঘটনা সেটা। হারাতে হলো বাবাকে। সে বড় আকস্মিক এক আঘাত এবং প্রলয়ংকারী। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে যে মা ওদের ছোট ছোট তিনভাইবোনকে নিয়ে আবারো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন সেটাই মিরাকেল! ভাগ্যিস মা শক্ত হাতে হাল ধরতে পেরেছিলেন! তা না হলে যে কোন চুলোয় ছিটকে পড়ে জ্বলতে হতো কে জানে!
তবে বাবার এই মৃত্যুকে শুদ্ধ কখনোই কোনোদিনও মেনে নিতে পারেনি। শুধু শুদ্ধ কেন, সংসারের প্রতিটি মানুষই- মা, বড় আপা স্বাগতা প্রত্যেকেরই এ এক গভীর অন্তর্দহন। সবচেয়ে ছোট নওরোজ অবশ্য তখন কোলের শিশু, দেড়বছরও হয়নি। তাই ওর মনের ওপর বাবা হারানোর প্রভাবটা তেমন সুগভীর হয়নি। কিন্তু শুদ্ধর অবচেতন মনে যেন চিরস্থায়ী হয়ে গেছে হারানোর সেই তীব্র যন্ত্রণা। সবসময়ই মনে প্রবলভাবে ছুঁয়ে থাকে! অমন একজন অসমসাহসী মানুষ- যিনি দেশকে ভালোবাসতেন প্রাণের চেয়েও বেশি, দেশ-স্বাধীনের জন্য যুদ্ধ করেছেন, স্বপ্নও নাকি দেখতেন দেশ নিয়ে কতকিছু, দেশটা দেখো একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে! সেই মানুষটিকেই কিনা… না না, এ ভ্রান্ত! এ নৈরাজ্য!
বাবা যেদিন হারিয়ে যান, তার আগের গভীর-রাতে নাকি পুরনো এয়ারপোর্টের দিক থেকে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। সে-গুলির শব্দ শুনে বাবার চোখে সারারাত একফোঁটা ঘুম আসেনি। কীভাবে আসে ঘুম! পচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পর থেকে তো একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই যাচ্ছিল! সেসব ঘটনার ঘূর্ণিজালে কার যে কখন কোন সমন আসে, তার কি কোনো ঠিকঠিকানা ছিল? কী এক আতংক নাকি বাবাকে তাড়া করে ফিরতো! গুলির শব্দ শুনে সে-রাতে বাবার দু-চোখে ঘুম না আসার আরো কারণ ছিল! সেদিনই বিকেলে একটা হাইজ্যাক করা জাপানি বিমান জোর করে অবতরণ করানো হয়েছিল এয়ারপোর্টে। সেটা নিয়ে বিমানবাহিনীতে তৈরি হয়েছিল দুটি গ্রুপ। এক গ্রুপ চাইছিল হাইজ্যাক করা বিমানটিকে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে দেবে না, আর একদল ছিল এর বিপক্ষে। গোলাগুলিটা কি সেকারণেই?
সকাল হতে না হতেই বাবা আলোআঁধারির ঘেরাটোপে, নাস্তা না সেরেই বেরিয়ে গেলেন এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। সেই যে যাওয়া তো চিরতরেই যাওয়া, আর ফেরা হলো না। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একসময় শুরু হলো খোঁজাখুঁজি! কোথায় আছেন বাবা, কাদের কাছে, আদৌ বেঁচে আছেন কীনা- না, কোনো হদিসই মিললো না তার। দুতিন মাস পর এলো শুধু কুর্মিটোলার সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার ছাড়ার চূড়ান্ত নির্দেশ, সেই সঙ্গে ছোট্ট এক চিঠি। দেশোদ্রোহিতার কারণে বাবাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। ঝড়োগতিতেই ঢাকার জীবনের পাততাড়ি গুঁটিয়ে চলে আসতে হলো দাদাবাড়ি গাজীপুরের বনসুন্দরীতে।
দাদা ছিলেন না। দাদিও অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতেন বিছানায়। চাচা-চাচিদের আশ্রয়েই শুরু হলো নতুন করে গ্রামজীবন, কঠিন জীবনসংগ্রামও। মা অল্পদিনের মধ্যেই চাচা-চাচিদের ছায়াতল থেকে বেরিয়ে নিজের মতো করে সংসার সাজালেন। সে-সময়ে অবশ্য নানাজানও পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মার। তা না হলে হয়তো তার পক্ষে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোটা অসম্ভবই হতো। মা যত ঝড়-কষ্ট গিয়েছে, নিজের মাথার মধ্যেই রাখতে চেয়েছেন। কখনো ওদের তিনভাইবোনের গায়ে সেই কঠিন জীবনের আগুনের উত্তাপের আঁচ লাগতে দিতে চাননি সামান্যও। বরং, গ্রামে এসে যেন শুদ্ধ প্রকৃতিকে পেল আরো নিবিড়ভাবে। পাখির ডাকে ওর ঘুম ভাঙে, ঝিঁঝিঁর স্বরে ঘুমিয়ে পড়ে! বেড়ে উঠতে থাকে রোদবৃষ্টি আলোছায়ার অপার লীলায়। বিশেষ করে তুরাগনদের সঙ্গে যে কখন ওর সম্পর্কটা গাঢ় থেকে আরো প্রগাঢ় হয়ে উঠলো, ও টেরই পেল না। তুরাগই যেন গড়ে দিল মনের প্রকৃতি, আজকাল অন্তত ওর কাছে সেটাই মনে হয়।
বর্ষায় যে কী ঢলঢলানি রূপ ছিল সে নদনটের। মনে হয় যেন সব ভাসিয়ে নেবে, এমনিতরো  স্রোতধারা। দু’পার ছাড়িয়ে জলের তোড় ছাপিয়ে পড়তো একপাশের কোপাকান্দির বিলে যেমন, আরেকপাশের ঢংকার বিলেও। তখন চারদিকে তাকালে একটা আসমুদ্র আদিমতা যেন খলবলিয়ে উঠতো। এমনকি শীতেও জিইয়ে থাকতো ওর লাবণ্য। আজকের মতো এমন চিপসানো হাড়সর্বস্ব চেহারা ওর কখনোই হতো না। ঋতুতে ঋতুতে রূপ পাল্টানো তুরাগকে দেখে যে কত কথাই ঢেউ ভাঙতো মনে- কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে ওর অন্তহীন পথচলা, কোন উৎস থেকে ও বইছে নিরন্তর, এই যে নৌকায় নৌকায় বসে থাকে মাঝি, তীর দিয়ে যারা দারি টেনে যায়- তাদের কি ঘরদোর নেই? প্রশ্নে প্রশ্নে ওর ছোট্ট মন কল্পনার অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতেই বুঝি খুঁজে পেল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়বার এই বোধনটুকু! (চলবে)

ছবিঃ গুগল

> পড়ুন শুনো তবে মহানন্দা ১