শুনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার

৩.

শৈশবে অবশ্য বাড়ি থেকে বেরুনোর তেমন সুযোগ হয়নি। এক যা ওই তুরাগ-পার! মা কেমন আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইতেন নিজের কাছে। এমনকি কোনো মেলায় কিংবা হাটবারে হাটেও যেতে দিতেন না। হয়তো বাবাকে ওভাবে হারানোর ফলে একটা আতংক মাকে তাড়া করে ফিরতো সবসময়। কিন্তু হাতেপায়ে যেই না ডানা গজালো, সেটা সিক্স-সেভেনে পড়ার বয়সে হবে, রাতে মাকে ফাঁকি দিয়ে টিভি দেখতে যাওয়ার নেশা ভালোমতোই পেয়ে বসেছিল। তখন বনসুন্দরী গ্রামে কেবল কারেন্ট এসেছে।

সবার বাড়িতে নয়, যারা মোটা দাগের পয়সা ব্যয় করে কিংবা জোর খাঁটিয়ে আনতে পেরেছে শুধু তাদের বাড়িতে। কেউ কেউ সাদাকালো টিভিও নিয়ে এলো। কেউ কেউ কী, মাত্র দু-বাড়িতে আনা হয়েছিল টিভি। দুটোই দক্ষিণপাড়ায়, পাঠান আর চেয়ারম্যানবাড়ি। অনেকটা পথ রাতের খনখনে অন্ধকারে হেঁটে যেতে হতো। মাঝেমধ্যে অবশ্য চাঁদরাতও মিলতো!
চেয়ারম্যানবাড়ির টিভিটা ছিল সরকারের দেওয়া, ইউনিয়ন পরিষদের। বাইরের ঘরের বারান্দায় উঁচু টেবিলে রাখা থাকতো যাদুর বাক্সটা। পুরো খলাভর্তি মানুষ। কিন্তু, কী আশ্চর্য পিনপতন নিস্তব্ধতা! কারো মুখে রা-শব্দ নাই। সবাই হা হয়ে গিলছে-কোরআন-গীতা-ত্রিপিটক পাঠ থেকে একেবারে শেষরাতের পতাকা উড্ডয়ন পর্যন্ত! যা হোক, সেই টিভিতে মাসে একবার পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র হয়, মাঝেমধ্যে চমকপ্রদ কোনো অনুষ্ঠানেরও খবর আসে- মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে আজ ল্যারী হোমসের লড়াই আছে, যাবি? আজ আবহানী মোহামেডানের খেলা দেখাবে রে! চাচাতো ভাইসহ পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ও জুটে যেত। মা আর কত আগলাবেন। কত আর চোখেচোখে রাখা যায়? ও পালিয়েই বেরোতো।
শীতের সময় পরপর দুটো রাত ছিল পাঁচমাইল পথ হেঁটে গিয়ে বাইমাইলের নাটক দেখার। বড়ই জাকজমক করে ঢাকা থেকে শিল্পী এনে আয়োজন করা হতো সে-নাট্যানুষ্ঠানের। একরাতে সামাজিক, আরেকরাতে ঐতিহাসিক। সঙ্গে একঝাঁক ডানাকাটা পরির ঝুমুর ঝুমুর নাচ। সে-আকর্ষণও কম ছিল না! আর হতো কমলারানীর বনবাস! গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায়। মা আর আটকাতেন না তখন। বরং এক-দুবার নিজেও গিয়েছেন দেখতে! গ্রামের লোক যে কী মজে থাকতো সে কমলারানীর বনবাস নিয়ে। আগের দিনের রূপবান যাত্রাপালার মতো! কিন্তু শুদ্ধর এতটুকুও ভালো লাগতো না। মেয়েদের পাটগুলো করে কিনা ছেলেরা! তবু যেত ও। যত না কমলারানীর বনবাস দেখতে, তারচেয়ে যেন ওই আয়োজনটিকে উপভোগ করতেই বেশি!
আরো একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার নেশাও চেপেছিল প্রবল। দলবেঁধে বাসে চলে যেত উল্কা হলে। সিনেমার শুটিং আসার খবর শুনলেও মাথা খারাপ হতো। স্কুল ফাঁকি দিয়ে কতদিন ছুটে গিয়েছে মৌচাকের শাল-গজারিবনের শুটিং দেখতে। অঞ্জু ঘোষকে দেখে সে কি হতাশা! শাবানা কোথায়? ববিতা-কবরী বা অলিভিয়া কোথায়? এ কোথাকার কে? কিন্তু দেখো, যেই না সওদাগর মুক্তি পেল! আফসোসে মাথা কুটে মরা! আরো একটু নজর বুলিয়ে দেখলো না কেন? তারপর মনে মনে কতো আর্তি আরেকবার অঞ্জু ঘোষ আসুক শুটিং করতে! কিন্তু অঞ্জু ঘোষ আর আসে না। রোদ আসে বৃষ্টি আসে ফড়িং আসে প্রজাপতি আসে ঘাসমাড়ানো শিশির আসে, শুধু অঞ্জু ঘোষেরই দেখা নাই!
তারপর যখন কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এলো, তখন যেন পেয়ে গেল স্বাধীনতার অবাধ স্বাদ। যেখানে খুশি যখন ইচ্ছে ছুটে বেড়াও, কেউ নেই দেখার। এটা ঠিক, বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে এসে প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা পেয়েছিল, তবে পেলে কী হবে, তখনই বুঝেছিল স্বাধীনতা উপভোগের সঙ্গে টাকার একটা গভীর সংযোগ আছে, মায়ের পাঠানো কষ্টের টাকা পড়াশোনার বাইরে অন্য কোনো বিলাসিতায় খাঁটাতে বিবেকে বড় বাধতো। এমনকি পুরি-ফুচকা খেতেও। কত কষ্ট করে যে মা যোগাড় করতেন লেখাপড়ার খরচ। সে এক বিষাদসিন্ধু।
বাবা কিছু জমিজমা রেখে গিয়েছিলেন ঠিকই, টাকাপয়সা রেখে যেতে পারেননি সামান্যও। তিন-তিনটি কোলের বাচ্চাকে নিয়ে সে কী বেসামাল অবস্থা মায়ের! একদিকে দারিদ্র অন্যদিকে চাচারা লেগেছিল জমি-দখলের ষড়যন্ত্রে। কপর্দকহীন অবস্থায় মাকে আদালত পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে। কখনো জমিচাষ বা বন্ধক রেখে, কখনো গাভী পেলে দুধ বেচে বা শিম লাউ সবজি বাজারে পাঠিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করতেন বেচারা। ঘরের উগোরতলায় কাঠের ছোট্ট কুঠি বানিয়ে মুরগিও পালতেন! মুরগির ডিম, মুরগি বেচেও উপার্জন হতো দু-পয়সা! মায়ের সেইসব দীর্ঘশ্বাস-ঝরানো টাকা দিয়ে বেড়ানোর কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠতো। আস্তে আস্তে যখন বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে থিতু হলো, বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হয়েও খুঁজে পেল এক-দুটো টিউশনি, তখন তখনই কেবল ওর বেড়ানোর নেশাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।
হ্যাঁ। সে বড় পাগলামো দিন ছিলো। বড় এলোমেলো খাপছাড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও হলে সিট পাচ্ছে না! এ-ছাত্রনেতা সে-ছাত্রনেতার কাছে দৌড়াচ্ছে! কিন্তু মহসিন হলে সেসব ছাত্রনেতাদের নিজেদেরই বেল নেই। জাসদ-বাসদের অঙ্গ-সংগঠন বলে কথা! নিজেরাই অস্তিত্বের সংকট নিয়ে ধুঁকছে। সিট চাও তো যেতে হবে ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের নেতাদের কাছে! আর ছাত্রদলের নেতাদের তখন পোয়াবারো অবস্থা! বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধানে হওয়া নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাদেরই দল বসেছে ক্ষমতায়! সবাই তখন মেতে উঠেছে মালপানি কামানোর ধান্দায়। কে মিল গড়বে কে গার্মেন্টস দেবে তারই চলছে কমপিটিশন! তাছাড়া বাবার কথা মনে পড়লেই ওদের কাছে যাওয়ার রুচিটা আর থাকতো না। মনে হতো বাবার রক্তের সঙ্গে বুঝি বেইমানি করা হবে। তারচেয়ে ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা- নাহ! তা পারতো না অবশ্য শুদ্ধ, মুক্তা ফলাতে!
সারাক্ষণ একটা কিসের হাহাকার রিক্ততাবোধের বোবাকান্না ওর ভেতরে গুমরে মরতো! একটু যে কাউকে আঁকড়ে ধরে বাঁচবে তরুলতা, তেমন বোধিবৃক্ষও ছিল না হাতের কাছে। রেবার আচরণগুলোকে তখন কেমন অদ্ভুত আর খটখটে লাগছিল। এটাও ঠিক যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ও আর রেবার খোঁজখবর তেমনভাবে রাখতে পারেনি। আসলে রাখা সম্ভব হয়নি। কীভাবে সম্ভব হবে? পকেটে থাকতো না পয়সা। তার ওপর ছিল না মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁই। আজ এর সঙ্গে তো কাল ওর সঙ্গে ডাবলিং করে থাকতে হতো, কতো রাত হলের মসজিদে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে! আধাঘুম নিয়ে ক্লাসে ঝুমতো! মাঝেমধ্যে একটু ভালো করে ঘুম দিতে চলে যেত খালার বাসা মিরপুর দশ নম্বরে! তাও কী ঘুমানোর জো ছিল? বদমেজাজি খালুর সঙ্গে খালার ঝগড়া লেগেই থাকতো! কী যে খিস্তিখেউড় খালুর! সে-সবের তোড়ে নিজেকে কেমন কেন্নোর মতো লাগতো তখন। মনে হতো খালাখালু বুঝি ওকে নিয়েই ঝগড়া করছে। চোরের মতো মাথানিচু করে বেরিয়ে আসতো সে-বাড়ি থেকে।(চলবে)

ছবিঃ গুগল

পড়ুন শুনো তবে মহানন্দা ১ 

> পড়ুন শুনো তবে মহানন্দা ২