শুনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার

১.
কেউ যায় উত্তরে কেউ যায় দক্ষিণে। কেউ যায় পুবে কেউ বা পশ্চিমে। আমাদের শুদ্ধ শুধু যায় তেঁতুলিয়া। কী আছে তেঁতুলিয়ায় যে বারবারই ওকে যেতে হয়! কিসের আশায় বা কিসের আকর্ষণে! সেখানে সমুদ্র নেই, পাহাড় নেই। মরু-জঙ্গল তো দূরের কথা, একটা প্রাচীন ভাঙাবাড়ি কিংবা সৌধ পর্যন্ত চোখে পড়ে না। তবু কেন তার কাছেই ওর এই ছুটে যাওয়া?

কেউ বলবে ক্ষ্যাপামো। কেউ বা বলবে নিশ্চয়ই আছে কোনো ধান্দা! অত দূর শুধু শুধু কেউ যায়! এতো দীর্ঘযাত্রায় অনাহুতই হতে পারে ক্রমাগত সামিল?

ঢাকা থেকে ৪৭০ কিলোমিটার পথ। যেতে যেতে সে-পথ সহজে আর ফুরায় না। তবু কেন ওর এই অক্লান্ত পরিভ্রমণ! কেন রোজার ঈদের পরদিন আনন্দের রেশটুকু ফুরাতে না ফুরাতেই মা ফেলে স্বজন ফেলে আকস্মিক ওর এমন মনসাঁতার?
শুদ্ধর কাছে এর কোনো উত্তর নেই। ব্যাখ্যাও অজানা। চোখ বুঁজলেই শুধু ভেসে ওঠে মহানন্দা। শান্ত সৌম্য এক নদী, কী সুন্দর নিস্তরঙ্গ জল। বইছে নীরবে। সেই যে কবে যৌবনের প্রথম পর্বে একদিন ছুটে গিয়েছিল তেঁতুলিয়া। সে কবেকার কাহিনি। অনার্স ফাস্ট ইয়ার থেকে সবে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে, রেবার সঙ্গে চলছে হৃদয়ের বোঝাপড়া! সে-কারণেই কি, নাকি স্বভাবদোষে মন এমন খিঁচড়ে ছিল যে, সব ফেলেফুলে একদিন উঠে বসেছিল হঠাৎ পঞ্চগড়ের বাসে। তারপর পঞ্চগড় থেকে আবার এক লক্করঝক্কর বাসে পৌঁছে গিয়েছিল তেঁতুলিয়া। তখন বোধহয় ঢাকা থেকে তেঁতুলিয়ায় সরাসরি বাস সার্ভিস ছিল না। তারপর এক নৈশব্দ্য আর নির্জনতার বাথানে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের ডাকবাংলোয় রাতটা কোনোমতো কাটিয়ে একাকিত্বের এক ঘুষি খেয়ে পরদিনই আবার ফিরে এসেছিল ঢাকা। তবে পরের বছর আবারো গিয়েছে, এবং তার পরের বছরও এবং এভাবে ও যেতেই থাকে তেঁতুলিয়া, যেন মহানন্দা ওকে ডাকে, মহানন্দা ওকে ডেকে ডেকে টেনে নিয়ে যায়। যখনই সেখানে যাবার ইচ্ছা ওর মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে, ও টের পায় বুকের ভেতর অলসমন্থর মহানন্দার নিঃশব্দ বয়ে যাওয়া!

অবশ্য এবারের এই বেরিয়ে পড়াটা কিছুতেই হচ্ছিল না। একের পর এক বাঁধা আসছিল। অফিস থেকে তো বটেই, পরিবার থেকেও। সেই মে-জুন থেকেই হবে, যতবার ও যেতে চেয়েছে তেঁতুলিয়া; বস দুজনই জুড়ে দিয়েছে নানারকম তালবাহানা। সামনেই অমুক ব্র্যান্ডের পিচ হবে, তুমি কীভাবে যাওয়ার কথা মুখে আনছো? অথবা অমুক ক্যাম্পেইনটা শেষ করে যাও। জুলাইয়ের শেষদিকে তো যাওয়া প্রায় হয়েই গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার অফিস করে রাতের বাসে ওর কল্যাণপুর থেকে রওনা দেওয়ার কথা, ওমা! তার আগের দিন বিকেলেই খবর এলো রণনদের নাও ডুবে গেছে তুরাগে! তারপর কী আর স্থির থাকে কারো মন? একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে গিয়েছিল কালিয়াকৈরের সেই খালপাড় গ্রামে।
তড়িঘড়ি সেখানে পৌঁছে মুখোমুখি হয়েছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। দুটো নিথর প্রাণহীন বাচ্চাকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল নদীতীরে। বড় বাঁচোয়া যে, ওদের সেই দুজনের মধ্যে রণন ছিল না। তিনবছরের রণনকে ওর বাবা নওরোজ গভীরভাবে আগলে রেখেছিল বুকের মধ্যে। প্রবল স্রোতেও ভেসে যেতে দেয়নি নদীতে। বাঁচলে কী হবে আতংকে কেমন কুঁকড়ে মুকড়ে ছিল রণন বাপের বুকে! নওরোজ, ওর বউ নাজনিন ওরাও কেমন তব্দা মেরেছিল।

শ্যালো নৌকায় চড়ে ওরা যাচ্ছিল রণনদের নানাবাড়ি। যে নৌকোর ৩০/৪০ জন যাত্রী নেওয়ার ক্ষমতা, সেটা কি আর প্রায় একশোজন যাত্রীর ভার বইতে পারে? দমকা হাওয়ায় ঘুরেটুরে ডুবে গেল তুরাগে। সেদিন যেমন রণনদের আর নানাবাড়ি যাওয়া হলো না, পরদিন তেঁতুলিয়া যাওয়ার প্রোগ্রামও বাদ দিতে হলো শুদ্ধকে। সকালবেলা মা, নওরোজ দুজনই বাঁধা দিল ঢাকা-ফিরতে। একদিন অফিস না করলে কী হয়। মা বাড়িতে কোরআন খতম দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ওই অবস্থা ফেলে বিকেলে যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসবে, মনের ভেতর থেকে সামান্যও সায় পাচ্ছিল না। তাছাড়া রণনও এমন এক কা- করেছিল যে, ওর বাৎসল্যকে ও ঠিক অগ্রাহ্যও করতে পারেনি। অতটুকু ছেলে কী বুঝলো, সারাক্ষণই শুদ্ধর গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো তো রইলোই! কোল থেকেই নামলো না! তবে আজ সাতসকালে কী সুন্দরভাবেই না ওকে চলে আসার সময় উইশ জানিয়েছে। বাড়ির গেট থেকে বাইরের রাস্তা অবধি আসার পথে, যতবার ও পিঁছু তাকিয়েছে, রণন বারবার ওর কচি হাত নাড়িয়ে টা টা দিচ্ছিল।

রণনকে টাটা দিতে গিয়েই বেবিট্যাক্সিতে ওঠার আগে শেষবারের মতো পেছনদিকে তাকিয়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিল শুদ্ধ। সে এক অপার্থিব দৃশ্য! নভেম্বরের তৃতীয়দিনের সকালটা গাঢ় কুয়াশা উপচানো, সেই কুয়াশারই আবছায়ায় একপাশে রণন দাদীর কোলে; আর একপাশে শিশু গাছের মাথায় কুয়াশার অবগুন্ঠন সরিয়ে যেন হেসে উঠতে চাইছে আড়মোড়া ভাঙা সূর্যটা যেন যাত্রাকালে শুদ্ধকে জানাতে চাইছে অন্তরের শুভাশীষ।

বেবিট্যাক্সিতে চড়ার পর থেকেই হালকা শীত অনুভব করছিল শুদ্ধ। দুপাশটা খোলা বলে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছিল ভুরভুরিয়ে। তারপরও মনের ভেতরটায় কিসের এক রোমাঞ্চকর উত্তেজনা টের পাচ্ছিল। বোধহয় শেষ পর্যন্ত যে বাড়ি থেকে বের হতে পেরেছে সেই খুশির আনন্দেই হবে! কেননা জুলাইয়ের সেই নৌকাডুবি কান্ডর পরও বাঁধার জট কিছুতেই খুলছিল না। আগস্টে যখন যাবো যাবো যাচ্ছি যাই করছিল, তখনই সতেরোই আগস্ট ঘটে গেল সেই অভাবনীয় কান্ড। সারা বাংলাদেশে একযোগে ঘটানো হলো সিরিজ বোমার বিস্ফোরণ! প্রতিটি জেলাতেই একই সময়ে মৌলবাদীদের এই মরণকামড়! ভাবা যায়!

সারা দেশটাই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল। নিথর পাথর। বেশ কয়েকজন হলো আহত-নিহত। এমন থমথমে পরিস্থিতিতে বেড়ানোর কথাটা মনে আনাও তো পাপ। তারপরও ওর মন চেয়েছে বেরিয়ে পড়তে। পারেনি, বাস্তবতা ওকে এক পাও এগোতে দেয়নি। পরের কটা দিন-মাস যে কী এক ভয়াবহ অস্থিরতায় কেটেছে বলে কাউকে বোঝাতে পারবে না। না কাজেকর্মে বসেছে মন, না বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করেছে কাছে-দূরে কোথাও। সারাক্ষণই অন্তরজ্বলুনি, এক ছটফটে যন্ত্রণা।

সেই বিবমিষার ক্ষণ কাটিয়ে যে ও অবশেষে এই নভেম্বরের হিম হিম ঠাণ্ডায় বেরিয়ে আসতে পেরেছে বাড়ি থেকে: এই বেরিয়ে পড়ার মধ্যে আসলেই কোথায় যেন একটা মুক্তির আস্বাদ আছে, অপার্থিব আনন্দ আছে!  (চলবে)