শুভ জন্মদিন কবিতার বাউল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

” আমি ঈর্ষা করি, যত দিন না আমার দাফন হবে, আমার ধারনা আমার দাফনের পরও আমি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ঈর্ষা করবো। খোদার কসম আমি রবীন্দ্রনাথকেও ঈর্ষা করি না, ঈর্ষা করি লালন ফকির, হাসন রাজা, কবি জসীমউদ্দিন আর রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ঈর্ষা করি। দুইটি লাইনের জন্য

“ভাল আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।”

 কবির সুমন এভাবেই রুদ্রকে উপস্থাপন করেছেন।

১৯৮৭ সালে এরশাদ ও তার ভাড়াটে কবিরা তাদের বাহাদুরি দেখাতে ঢাকায় আয়োজন করেন কবিতা উৎসব তখন ২৮ বছরের এক অনাহারী যুবক বলে উঠে আট কোটি মাথা নিয়ে খেলে এক খুনি খেলোয়াড়! কি সাহস ছিলো সেই আজন্ম ভবঘুরে যুবকের!

২১ জুন ১৯৯১ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বিদায় নেন এই কাব্যপুরুষ। তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে মানুষ, সমাজ, চেতনার ত্রিকোনো উঠোন আর জীবনের শুভ্র কঙ্কাল। রুদ্রের কবিতা নিজেই এক মহান ইতিহাস। সময়ের চিলেকোঠায় ‘কবিতা’নাম্নি বর্গক্ষেত্রের মধ্যেই রুদ্র মানুষের একাকিত্বতা, নিমগ্নতা, লৌকিক সভ্যতার মানচিত্র এঁকেছেন দক্ষ হাতে।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কবি, কবি এবং কবি। কবির ঊর্ধ্বে আর কিছুই নন তিনি। রুদ্রের কবিতা স্বপ্ন দেখায় কবিতার আড়ালে এক বিশুদ্ধ সময়ের। রুদ্র তার কবিতায় অপ্রতিরোধ্য গতি সৃষ্টি করে সহজেই পৌঁছে গেছেন কালোত্তীর্ণের কাতারে।

‘৭৫ পরের কালে রুদ্র কবিতার পাতায় পাতায় লিখেছে অভিমানের কথা, বিষন্ন রক্তপাতের কথা, মর্মঘাতী আত্ম-পরিচয়ের রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টিকালের খারাপ উদ্দেশ্যের কথা। ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এক সঙ্গে কাজ করতে হবে সবাইকে, ধর্ম বর্ণ নিয়ে নয়, শ্রমে ঘামে মিলে মিশে একসঙ্গে থাকতে হবে সবাইকে, না হয় এই দেশ বাঁচবে না, এমন কথাও লিখেছেন তিনি। রুদ্রই প্রথম লিখেছেন মাতৃভূমির পতাকাকে যেমন আছে বাঙালি হাজার বছর ধরে, কেমন করে মৌলবাদী শকুনেরা খামচে ধরেছে সেই প্রেক্ষাপটকালের কথা, আমাদের স্বাজত্যবোধ কেমন করে মিথ্যা আর ভুল সংজ্ঞার দিকে ঠেলে দিলো পরাজিত রাজনীতি, সেই কথা। এসব তো ইতিহাস। সে ইতিহাস ভালো করে যারা দেখেছে তাঁদের দায় নেই?আমি অবনত ও কুণ্ঠিত, রুদ্রের প্রতি!

শব্দশ্রমিক,অনার্যপুত্র রুদ্র মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতির পথ খুঁজেছেন , আমাদের দেখিয়েছেন সেই পথ আজন্ম ।

স্ত্রী তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে

মিঠেখালির বুকে শুয়ে আছ কবিতার খেয়ালী চাষা ।সব বাঁধা ছিঁড়ে যে কবি বেরিয়ে এসেছেন, তাঁর কাঁধে এখন বাংলা কবিতার জোয়াল!

রুদ্র আজীবন প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরোধী , সনাতন প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ নির্ভর মুক্ত সমাজের ইশতেহার তার পুরো জীবন। নিজে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের জন্য , শিল্পের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ চুকিয়েও সরকারি – বেসরকারী চাকুরী নেন নি, হন নি ব্যবসায়ী। ধর্ম , গোত্র , সম্প্রদায়ের বিভক্তির উর্ধ্বে কেবল মানুষের পৃথিবীর জন্য নিবেদিত তার শিল্পের পক্ষপাত ।

যতই ক্ষোভ আর অভিযোগ থাক, রুদ্রকে নিয়ে তসলিমা লিখেন-

“রুদ্রকে আমি আমার সতেরো বছর বয়স থেকে চিনি। সেই সতেরো বছর বয়স থেকে রুদ্র আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে ছিল। আমাকে যে মানুষ অল্প অল্প করে জীবন চিনিয়েছে, জগৎ চিনিয়েছে- সে রুদ্র। আমাকে যে মানুষ একটি একটি অক্ষর জড়ো করে কবিতা শিখিয়েছে- সে রুদ্র।

যৌথজীবন আমরা যাপন করতে পারিনি। কিন্তু যত দূরেই থাকি, আমরা পরস্পরের কল্যাণকামী ছিলাম। রুদ্রের সামান্য স্খলন আমি একদিনও মেনে নিইনি, রুদ্রের দু’চারটে অন্যায়ের সঙ্গে আমি আপোস করিনি- পরে সময়ের স্রোতে ভেসে আরো জীবন ছেনে, জীবন ঘেঁটে আমি দেখেছি, রুদ্র অনেকের চেয়ে অনেক বড় ছিল, বড় ছিল হৃদয়ে, বিশ্বাসে। রুদ্রের ঔদার্য, রুদ্রের প্রাণময়তা, রুদ্রের অকৃত্রিমতার সামনে যে কাউকে দাঁড় করানো যায় না।”

অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা ফলে আলসারে পেয়ে বসেছিলো তাকে। পায়ের আঙ্গুলে রোগ বাসা বেঁধেছিলো। ডাক্তার বলেছিলো পা বাঁচাতে হলে সিগারেট ছাড়তে হবে। তিনি পা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর তাই স্থান হলো হলি ফ্যামিলির ২৩১ নম্বর কেবিনে। ৯১ সালের ২০ জুন সুস্থ্য হয়ে পশ্চিম রাজাবাজারের বাড়িতে ফিরেও গেলেন। কিন্তু ২১ জুন ভোরে দাঁত ব্রাশ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ।

দুজনে

পৃথিবী, নারী, স্বপ্ন, সংগ্রাম আর শিল্পের প্রতি নিমগ্ন কবিতা-কারিগর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ; বড় অসময়ে অবহেলায় চলে গেলে বাউল , ভাল থেকো তোমার আকাশে। আজও বেদনার বেনোজলে ,দ্রোহের স্পর্ধায় তোমার কাছেই আসি বার বার।

মাত্র ৩৫ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাতটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, কাব্যনাট্য এবং ‘ভালো আছি ভালো থেকো ’ সহ অর্ধ শতাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন।

১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতার বই ‘উপদ্রুত উপকূলে’। প্রথম বইয়ের ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতা সকলের মনোযোগ কেড়ে নেয় ও পাঠক সমাজে সাড়া জাগায়। রুদ্র’র দ্বিতীয় বই ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। তারপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘মানুষের মানচিত্র‘ (১৯৮৪), ‘ছোবল’ (১৯৮৬), ‘গল্প’ (১৯৮৭), ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ (১৯৮৮) ও ‘মৌলিক মুখোশ’ (১৯৯০)। এছাড়া প্রকাশিত হয় গল্পগ্রন্থ ‘সোনালি শিশির’। আর তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় নাট্যকাব্য ‘বিষ বিরিক্ষের বীজ’।

ইসহাক খান ও মিনার মাহমুদের সঙ্গে

এক বেপরোয়া বোহেমিয়ান। নানা কৃত্রিমতা ও ভণ্ডামিতে ভরা আমাদের নাগরিক সমাজের লোক নন। ছটফটে, অধৈর্য, বেহিসেবি, বাউণ্ডুলে, নিজের-আখের-না-গোছাতে চাওয়া, নিজের সম্পর্কে যত্নবান হওয়ার ইচ্ছে পোষণ না করা, দামাল।শিল্প ত তাই বলে যাকে আকড়ে ধরে বাঁচতে হয়।

শুধু লেখায় নয়, যাপনে বিশ্বাসী। তার লেখা মনে হয়েছিলো, যাপন-ভিত্তিক। সে যাপন অনেকেরই পছন্দ হবে না। তাতে তার কিছু যেত আসত না।

“জন্মদিনে আ”মি মৃত্যুকে ভয় পাই
জীবনের প্রচন্ড করতালির ভেতর
শুনি মৃত্যুর নিঃশব্দ চারন।”

বড় অসময়ে অবহেলায় চলে গেলে বাউল , ভাল থেকো তোমার আকাশে। আজও বেদনার বেনোজলে ,দ্রোহের স্পর্ধায় তোমার কাছেই আসি বার বার।

শুভ জন্মদিন বাউল

দ্রোহের, প্রেমের স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই রুদ্র

কাঁধে কালো ব্যাগ, রুদ্র হেঁটে যাচ্ছে মঞ্চের দিকে, সম্মিলিত মানুষের দিকে, কবিদের তুমুল আড্ডায় রুদ্র তার তাবৎ মৃত্যুকে আড়াল করে দুর্বিনীত হেসে উঠছে আজও।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]