শুভ জন্মদিন কবি পাবলো নেরুদা

লুৎফুল কবির রনি

‘আমার কবিতা নিয়ে ওরা কী বলবে
যারা আমার রক্ত ছুঁয়ে দেখেনি?’

-পাবলো নেরুদা

ঘটনাটি একটি সস্তা দরের সরাইখানার। যেখানে মদ পানীয় ইত্যাদি আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিলো। সন্ধ্যার পরে লোকেরা গিয়ে সেখানে জমায়েত হতো। আড্ডা হতো, সুরা পান হতো। দরিদ্র শ্রেণীর নাচিয়ে মেয়েরা নাচ গান করতো। বিভিন্ন ধরনের লোকজনের যাতায়াত ছিলো সেখানে। গুণ্ডা শ্রেণীর লোকেরাও আসতো। তাদের সঙ্গে অবশ্যই তাদের চরিত্রটিও আসতো। ফলে মাঝে মধ্যেই লেগে যেত মারপিট।

কবি পাবলো নেরুদার বয়স তখন কম। অল্প স্বল্প কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। তার ক্রেপুস্কুলারিও নামক কবিতার বইটি বের হয়েছে কিছুদিন আগে। একদিন কয়েকজন পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে বসে সেই সরাইখানায় সুরা পান করছিলেন। নাচ-গান শুরু হয়েছে। তখনই দু’জন গুণ্ডা প্রকৃতির লোকের মধ্যে বচসা বাঁধে। একজন বেশ গায়ে পড়েই অন্যজনকে আক্রমণ করে এবং হাতাহাতি শুরু করে দেয়। হাতাহাতির সঙ্গে সঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজও ছিলো, তা বলা বাহুল্য।

মুহুর্তেই সরাইখানার পরিবেশ বাজে হয়ে উঠতে লাগলো। বন্ধুদের নিয়ে গল্পগুজব করতে সন্ধ্যার পরে যারা এসেছিলেন তারা ভীত ও বিব্রত হয়ে উঠলেন। কিন্তু কারো সাহস হলো না আগ্রাসী গুণ্ডাটিকে গিয়ে কিছু বলতে। কারণ সবার দেহেই প্রাণ একটি এবং ধড়ের উপর মাথাও একটি। নাচিয়ে মেয়েরা প্রাণভয়ে সরাইখানার পেছনে গিয়ে লুকালো। নেরুদা সহ্য করতে পারলেন না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আগ্রাসী গুন্ডা দু’টির সামনে গিয়ে তাকে বললেন, ‘হারামজাদারা, সরাইখানার পরিবেশ নষ্ট করছিস কেন? মানুষ এখানে এসেছে আনন্দ করতে, তোদের মারামারি দেখতে নয়’।

দু’টি লোকই তার দিকে বেশ অবাক হয়ে তাকালো। তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না ঘটনাটিকে। বেটে খাটো লোকটি এগিয়ে আসে। নেরুদা এতই রেগে ছিলেন যে এক ঘুষি বসিয়ে দিলেন বক্সিং করা পেটানো শরীরের গুন্ডাটির মুখে। অগ্র পশ্চাৎ কিছুই ভাবলেন না। লোকটি পড়ে গেলো মাটিতে। লোকটির প্রতিপক্ষ তখন তাকে বাগে পেয়ে কিছু কিল ঘুষি মেরে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। অপর গুণ্ডাটি এবার এলো নেরুদার সঙ্গে ভাব জমাতে। নেরুদা তাকেও কর্কশ ভাষায় তিরস্কার করলেন। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে-ও বেরিয়ে গেলো।

উপস্থিত সবাই ভেবেছিলো হয়তো লোকটি নেরুদাকে একহাত দেখে নেবে। কিন্তু ঘটনা হলো উল্টো এবং বিস্ময়কর। সবাই বেশ ধন্যবাদ জানালেন নেরুদাকে। আপ্যায়ন করতে চাইলেন। নেরুদা যখন বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করে তাদের সঙ্গে নিয়েই বের হলেন সরাইখানা থেকে, তখন তারা দেখলেন অনতিদূরে এক গলির ধারে সেই দ্বিতীয় গুন্ডা লোকটি দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তাকে লাগছে আরো ভয়ংকর।

নেরুদার বন্ধুরা ভাবলেন এবার আর বাঁচার উপায় নেই। লোকটি হয়তো ভেতরে কোনো ঝামেলা করতে চায়নি। কিন্তু বাইরে তৈরী হয়ে বসে আছে। এবার আর নিস্তার নেই তার। নেরুদাকে দেখেই লোকটি এগিয়ে এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে রাস্তার এক কোনে নিয়ে বললো, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি। আসুন একটু আলাপ করি। ভয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন কবি। কিন্তু তিনি যেন সমস্ত সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার বন্ধুরাও ভয়ে কাঁপতে লাগলেন। নেরুদা ভাবলেন ভয় প্রকাশ করা যাবে না, তাই লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলেন। কিন্তু রোগা কবির ধাক্কায় ওরকম শক্তিশালী লোক কি টলে?

লোকটি নেরুদার দিকে একটু ঝুঁকে তাকালো আর তখনই কবি দেখতে পারলেন লোকটির মুখে কোনো হিংস্র ভাব নেই। সে নম্রভাবেই জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি পাবলো নেরুদা? নেরুদা বললেন, হ্যাঁ। লোকটি তখন মুখ কাচুমাচু করে বললো, কী অধম আমি! আপনাকে অপমান করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন। আমি যে মেয়েটিকে ভালোবাসি সে আপনার কবিতার খুব ভক্ত। আমরা দু’জনে আপনার কবিতা পড়েই ভালোবাসতে শিখেছি। আপনার কবিতার জন্যই আমি সেই মেয়েটির ভালোবাসা পেয়েছি।

এরপর সে তার পকেট থেকে তার প্রেমিকার একটি ছবি বের করে বললো, আপনি এই ছবিটি একবার স্পর্শ করুন। তাহলে আমি তাকে বলতে পারবো পাবলো নেরুদার হাতের স্পর্শ আছে ছবিটিতে। ছবিটি যখন নেরুদা স্পর্শ করলেন তখন লোকটি নেরুদার লেখা কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলো। কবিতা আবৃত্তি শুনে নেরুদার বন্ধুরা এগিয়ে এলেন। দেখলেন অদ্ভুত দৃশ্য। নেরুদা যখন বন্ধুদের সঙ্গে চলে যাচ্ছিলেন তখনও লোকটি কবিতা আবৃত্তি করে যাচ্ছে।

এরকম একজন কবি ছিলেন পাবলো নেরুদা, যিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়াবেগকে স্পর্শ করতে পারতেন। তাদের সুখ, দুঃখ ও স্বপ্নকে নাড়া দিতে পারতেন। হাজার হাজার খনি শ্রমিকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যখন কবিতা পড়তেন তখন নিঃশব্দে সেই শ্রমিকেরা কবিতা পাঠের তালে তালে তাদের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ওঠানামা করতেন। ভাঙ্গাচোরা ঘরে, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে, হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে বসে সাধারণ খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষেরা নেরুদার মুখে তার কবিতা শুনতো তন্ময় হয়ে।

কবিতা শোনার পর অঝোরে কাঁদতেন অনেক শ্রোতা। দক্ষিণ চিলির পাররালে নামে এক গ্রামে ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই জন্ম নিয়েছিলেন এই কবি। সাধারণ এক রেল শ্রমিকের পরিবারে তার জন্ম। কবিতায় তিনি দুঃখী, নিপীড়িত ও নির্যাতীত মানুষের মুক্তির জন্য লিখেছেন। এ কাজে নিজের জীবনই উৎসর্গ করেছেন। কবিতায় বাস্তববাদ এড়িয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত মানসিকতা তার ছিলো না।

প্রায় চার দশক আগে নেরুদা মারা গেছেন৷ মারা যাবার আগের কয়েক মাস নেরুদার ড্রাইভার ছিলেন মানুয়েল আরায়া৷ তিনি এবার অভিযোগ করেছেন, প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত নেরুদা যখন সান্টিয়াগোর সান্টা মারিয়া ক্লিনিকে, তখন পিনোচেটের এজেন্টরা তাঁকে পেটে ইনজেকশন দিয়ে বিষ ঢুকিয়ে হত্যা করে৷ নেরুদা ছিলেন সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দে-র সমর্থক, যাঁকে ১৯৭৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়৷ অর্থাৎ নেরুদা মারা যাবার ঠিক বারো দিন আগে৷

স্ত্রীর সঙ্গে নেরুদা

নেরুদার মৃত্যুর পরে ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনী তার দু’টি বাসগৃহ লুটপাট করে। তার অমূল্য সব সম্পদ, সংগৃহীত পুরনো বই, নথিপত্র, পাণ্ডুলিপি, পাবলো পিকাসোর দেয়া ছবি ইত্যাদি সব কিছু নষ্ট করে ফেলা হয়। এরপর বাড়িতে পানির সব কল খুলে রেখে সমস্ত কিছু জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। যাতে সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। কিন্তু ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর সেই চেষ্টা সার্থক হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে নেরুদাকে মোছা সম্ভব নয়।

পিনোচেট তাঁর শবযাত্রা নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও চিলির মানুষ তাদের প্রিয় কবিকে শেষবার দেখার জন্য কারফিউ অগ্রাহ্য করে রাস্তায় নেমেছিলো৷ এ সেই নেরুদা৷ এ তাঁর মরদেহ৷

পাবলো নেরুদা, তুমি আছো তাই, আমরা স্বপ্ন বুনে যাই।যখন ঘুমিয়ে থাকি, নেরুদা যেন জাগিয়ে তোলে আর বলে ‘পশুরা জেগে আছে মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করার জন্য আর তুমি এখনো ঘুমোচ্ছো’। আমাদদের উন্মত্ত তারুন্যে তিনি লড়তে শিখিয়েছিলেন সাম্যবাদের জন্য।

তিনি মিছিলে, প্রতিবাদে এবং আগুনের হলকায় আমাদেরকে শোনান এমন গান যা দুঃসময়েও অবিরাম গাওয়া যায়।

পাবলো নেরুদা (১২ জুলাই, ১৯০৪ – ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো।

প্রিয় কবির জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ছবি: গুগল