শুভ জন্মদিন কবি বিনয় মজুমদার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

ভালোবাসা দিতে পারি , তোমরা কি গ্রহনে সক্ষম ?
লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝরে যায়
হাসি ,জ্যোৎস্না , ব্যথা ,স্মৃতি অবশিষ্ট কিছুই থাকে না ” ।

— কবি বিনয় মজুমদার

‘দারুচিনি আসলে গাছের বাকল’

‘সবচেয়ে ভালো জ্যামিতি ময়ূরের পেখমে’

এমন আরো অদ্ভুত সব এক পঙতির কবিতা’র রচয়িতা কবি বিনয় মজুমদার। ‘পরাবাস্তব জীবনানন্দ’ পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতা যখন আরো একটু বৈচিত্রের খোঁজে হাঁসফাঁস করে মরছিলো, তখন ব্যক্তিগত আবেগে মোড়ানো স্বতন্ত্র ভাষায়, বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি ভালোবাসা নিংড়ে বাংলা কবিতার পথে নতুন বাঁকের সৃষ্টি করেন এই ক্ষণজন্মা কবি।

কবি বিনয় মজুমদার মিয়ানমার’র মিকটিলা জেলার টোডো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বিপিনবিহারী মজুমদার, মায়ের নাম বিনোদিনী। তাদের ছয় সন্তানের মধ্যে বিনয় ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।

ঘরের ভেতর থেকে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। মশারিতে আগুন লেগেছে। কে লাগিয়েছে আগুন?

আগুন লাগিয়েছেন এক আগুন কবি। বিনয় মজুমদার। মা-বাবা বাইরে গল্প করছিলেন রাতের মশারি টাঙিয়ে। গল্পের বিষয় ছিলো বিনয়। তাদের ছোটছেলে যে কিনা সাহিত্যে, গণিতে প্রায় একলব্য হয়ে উঠছিলেন সেই সময়। তাদের অবর্তমানে কে দেখবে এই দুর্দান্ত প্রতিভাবান অবিবাহিত, বেকার, অস্থির ছেলেটিকে? তাদের আর সব সন্তানেরা যে যার জায়গায় স্থির।

চিন্তা শুধু বিনয়কে ঘিরে। সেই বিনয় হঠাৎ বিড়ি খেতে খেতে ছুড়ে দিলেন হাতের জ্বলন্ত দেশলাই মশারির গায়ে। বাড়ির আশ্রিতা মেয়েটি চিৎকার করে উঠলো। বিনয়ের বড়ভাইকে ডাকা হলো। শাস্তি হিসেবই হয়তো-বা এবারেও বিনয়ের ঠিকানা হলো মানসিক হাসপাতাল। কেন সেদিন আগুন লাগিয়েছিলেন বিনয়! নিজেই কখনও-বা বলেছেন, তিনি হাঙরদের অত্যাচার সহ্য করেছিলেন। হাঙর বলতে তিনি সমাজের যাদের বুঝিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধেই কি আগুন জ্বালাতে চেয়েছিলো তার মন, নাকি শুধুই মানসিক বৈকল্য। আমরা তো বহু সময় সঠিক ক্ষেত্রে রাগ প্রয়োগ করতে না পেরে অন্য জায়গায় প্রকাশ করি।

বিনয় মজুমদার প্রায় আটবারের কাছাকাছি মানসিক হাসপাতালে গেছেন। প্রায় ৩০ থেকে ৩১ বার তার মাথায় দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক শক। এরপরেও বিনয় নিজে বলছেন এতোকিছুর পরেও আমি সুস্থ চিন্তা করতে পারি। নিজেকে পাগল বলে মনে করি না। তাই কেউ পাগল বললে আমার খারাপ লাগে। নিজেই ব্যঙ্গ করে বলতেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের পাগলাগারদ সমূহের পরিদর্শক আমি’।

অথচ এই মানুষটি কী দক্ষতার সঙ্গেই না মেডিকেল কলেজের এজরা ওয়ার্ডে থাকাকালীন জটিল কাব্যিকদর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন! এজরা ওয়ার্ডের দেয়ালেও লিখেছেন কিছু কবিতা। জীবন তাকে উপলব্ধি দিয়েছিলো বলেই হয়তো লিখেছিলেন, ‘ক্ষত সেরে গেলে ত্বকে/পুনরায় কেশোদগম হবে না কখনও’।

সত্তর দশকের কাছাকাছি যখন গোবরা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তখন পাশে পেয়েছিলেন কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটককে। সেখানে ঋত্বিক ঘটকের লেখা ‘জ্বালা’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনব অভিনয় করেছিলেন। সেখানে বসেও নাকি বিনয় পত্রিকা বের করেছিলেন। ঋত্বিক ঘটক বিনয় মজুমদার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি সাম্প্রতিক কালের এক কবির সম্পর্কে আশা রাখি, যিনি কবিতার জন্য যথার্থ জন্মেছেন। আমার মনে হয়, একালে বাংলাদেশে এতো বড় শক্তিশালী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কবি আর জন্মাননি। তিনি হলেন বিনয় মজুমদার।’

আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিনয় মজুমদারের একটি গবেষণাপত্র দেখে এতোই অবাক হয়েছিলেন যে, সেটিকে তিনি মহাফেজখানায় রাখার সুপারিশ করেছিলেন। ছবিশিবপুর ইঞ্জিনিয়ার কলেজের কৃতী ছাত্র বিনয় বি.ই ডিগ্রি পাওয়ার পর অজস্র ভালো ভালো চাকরি, অধ্যাপনার কাজ বারবার ছেড়েছেন কারণ, কবিতা তাকে পেয়ে বসেছিলো। যে মানুষ কখনও ভাবেনি সে কবিতা লিখবে। তিন বলছেন, ১৯৫৯ সাল তার চিন্তা-ভাবনা করে শুয়ে শুয়ে কেটে গেলো। ১৯৬০ সালে তিনি ঠিক করলেন, শুধুমাত্র কবিতাই লিখবেন। প্রকাশ পেলো তার প্রথম কবিতার বই ‘নক্ষত্রের আলোয়’। না ঠিক তেমন আলো পেলো না সেই বই। এরপর যখন ‘ফিরে এসো, চাকা’ প্রকাশ পেলো কলকাতার সাহিত্য সমাজ বিনয়কে চিনে নিলেন।

শোনা যায়, ঠিক এই সময়ে তিনি কফিহাউসে গায়িত্রী চক্রবর্তীকে দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের কৃতী ছাত্রী। গায়িত্রী চক্রবর্তীকে নিয়েই বিনয় বেশ কিছু কবিতা লিখেছিলেন। তারপর গায়িত্রী চক্রবর্তী বিদেশে চলে যান বিনয় বোধহয় সেই অনুভূতিতেই লিখেছিলেন ‘ফিরে এসো চাকা’। চাকা মানে চক্রবর্তী।

প্রথম জীবনে বিনয়ের এক সহপাঠীর বোন শ্যামলী ঘোষের সঙ্গে তার প্রেম ছিলো। জাতিগত কারণে এই বিয়ে বন্ধ হয়। এটা বিনয়ের জীবনে একটা দাগ হয়ে থেকে যায়। অবিবাহিত জীবনের অন্ধগলিতে তিনি হয়তো-বা শরীর পেয়েছেন নারীর, প্রেমিকা পাননি। গায়িত্রী চক্রবর্তী যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, তিনি বিনয়কে বাংলার দান্তে বলে মেনেছেন।

বিনয়কে প্রশ্ন করা হলে উড়িয়ে দিয়েছেন কোনো প্রেমের কথা কিন্তু কবিতাতে লিখেছেন-

‘আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো।
তোমার গায়ের রঙ এখনো আগের মতো , তবে
তুমি আর হিন্দু নেই , খৃষ্টান হয়েছো ।
তুমি আর আমি কিন্তু দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছি ।
আমার মাথার চুল যেরকম ছোটো করে ছেঁটেছি এখন
তোমার মাথার চুলও সেইরূপ ছোটো করে ছাঁটা ,
ছবিতে দেখেছি আমি দৈনিক পত্রিকাতেই ; যখন দুজনে
যুবতী ও যুবক ছিলাম
তখন কি জানতাম বুড়ো হয়ে যাব ?
আশা করি বর্তমানে তোমার সন্তান নাতি ইত্যাদি হয়েছে ।
আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে ,
তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে ,
চিঠি লিখব না ।

আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায় ।

আর কখনও কখনো গভীর প্রশ্ন করা হলে বলতেন, সে কথা গোপন থাক!

এক সাক্ষাৎকারে কবি বলছেন, ‘ফিরে এসো, চাকা’ এই একখানিই তার কবিতার বই। এরপর নাকি সব পয়মাল! নিজের কবিতা সম্পর্কে এতো শক্ত মন্তব্য ক’জন করতে পারেন। জীবন তাকে অসহায়তা থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিলো আরও। কাঁপা হাতে নিজেই নিজের ঘরের তালা খুলতেন কেউ সাহায্য করতে এলে তা নিতেন না। শেষে মিডিয়ার মানুষদের দেখলে লাঠি নিয়ে তাড়া করতেন। মাঝে মধ্যে ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখতেন আর কেউ ডাকলে বলতেন, ‘আমি আমার অন্ধকার মায়ের কোলে ন্যাংটো হয়ে শুয়ে আছি, দরজা খুলব না’।

এই হলেন বিনয় যার ভেতর জুড়ে ছিলো এক মিহিন শিশুমন। আকাশবাণী থেকে ঠিক করা হলো তাঁকে নিয়ে আসা হবে। বিনয়ের কবিতাজীবনের কিছু চিহ্ন থাকুক সেখানে। বিনয় তখন তীব্র মিডিয়াবিমুখ। তাই আকাশবাণী তাদের চিহ্ন আড়াল করে গাড়ি পাঠালেন। ঠাকুরনগর থেকে তাকে কলকাতায় আনা হলো চোখ দেখানোর নাম করে। কিন্তু আকাশবাণীর গেট দেখেই ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন। কিছুতেই তাকে নিয়ে যাওয়া যায় না। তারপরে সেসময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা তাকে অনেক বুঝিয়ে কৌশলে নিয়ে গেলেন রেকর্ডিংয়ের ঘরে। সেখানে বিনয় তখন সম্পূর্ণ এক কবি। এতোক্ষণের যা বিরোধ সব তার কেটে গেলো কবিতার পাঠে। কথায় মগ্ন হয়ে গেলেন। শুধু কবিতা পড়তে পড়তে মাঝে বলে উঠলেন, খিদে পেয়েছে। আমি এখন খাবো।

ক্যান্টিন থেকে খাবার আনানো হলো। বিনয় খাবার খেলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আবার যদি কবিতা পড়তে ডাকা হয় উনি আসবেন কিনা। উত্তরে বাংলার বিনয় বলছেন, যদি এভাবে ভাত খেতে দাও আবার আসবো কবিতা পড়তে। ভাতের বদলে কবিতার বিনয় বেঁচেছিলেন এভাবেই।

অথচ জীবনের প্রারম্ভেই যাকে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন থেকে গণিতের অধ্যাপনা আর জাপান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য চাওয়া হয়েছিলো। সেই তিনি যিনি ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের আওতায় রুশ সরকারের টাকায় করেছেন অনুবাদ। সেই বিনয় কবিতার বদলে চেয়েছেন শুধু ভাত।

বিনয় মজুমদার ছেলেটাকে সবাই মংটু বলে ডাকে। দারুণ ছবি আঁকে ছেলেটা, সঙ্গে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেয় মানুষজনকে। সারাদিন কিছু পড়াশুনা করে না। বড়রা চিন্তায় থাকে, এই না শাস্তি পায়। অথচ ম্যাজিশিয়ান ছেলেটা সব পেরে যায় স্কুলে গিয়ে। ছেলেটার ডাক নাম মংটু। জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মায়ানমারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ছেলেটি বাবার সঙ্গে পায়ে হেঁটে পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে অবিভক্ত ভারতে আসে। কলকাতায় যখন তাকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য আনা হলো তার আগে সে বাংলাদেশে নবম শ্রেণিতে পড়তো কিন্তু মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি করার সময় হেডমাস্টার তাকে অষ্টম শ্রেণীতে চাইলেন। তাই করা হলো। কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী সেই ছেলে রাস্তায় আসতে আসতে বাবাকে জানিয়ে দিলো, কিছুতেই সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়বে না। সে নবম শ্রেণীতে পড়বে। শেষপর্যন্ত তাই হলো। তিনি বিনয় মজুমদার।

এই বিনয় পাগলপ্রেমিক, অশ্লীল, প্রতিভাবান, গণিতজ্ঞ, শক্তিশালী কবি, নিঃসঙ্গ— সব সম্বোধনকে অন্তরে নিয়ে বিনা প্রতিরোধে একটি লাঠিকে অবলম্বন করে একা এক কুঠিতে নিজেকে নির্বাসন দিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন অনেককিছুই। তাই জড়, উদ্ভিদ আর জীবকে কোথাও এক মাত্রায় বসিয়েছিলেন। বিয়ে করেননি কিন্তু কোনো এক সিদ্ধান্তে গিয়ে বলেছিলেন, শিবরাম চক্রবর্তী আমার গুরু, তার স্ত্রী যদি কল্পনা হয় আমার স্ত্রী তবে রাধা আর ছেলে কেলো। বিনয়ের কথা ধরেই বলি একথার গভীরতা তবে গোপনই থাক।

‘মায়ের ইসোফেগাসে ক্যানসার হয়েছিল , ফলে
কোনো কিছু গিলে খেতে পারতনা , জল
খেতে পারত না ।
পীযুষ ডাক্তার
গ্লুকোজ ইঞ্জেকশন দিত দুই হাতে ।
তাতে আর কি বা হয় , না খেয়ে পনেরো দিন থেকে
মা- ও মারা গেল ।
মরবার আগে একবার
আমার বাবাকে মা তো কুকুর বলেছে ।
মরবার আগে মা আমার
বাড়ির চাকরটির পা- ও ধরেছিল ।
এর নাম মৃত্যু , মহাশয় ।’

এভাবেই তাঁর কবিতায় এসেছে মৃত্যু।২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর কবিতার বিনয় ঘুমিয়ে পড়লেন। আর জাগলেন না। জাগিয়ে রাখলেন আমাদের।

শুভ জন্মদিন কবি বিনয় মজুমদার !

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]