শুভ জন্মদিন কবি শামসুর রাহমান

লুৎফুল কবির রনি

শৈশবে তাঁর দেখা প্রথম চিত্রশিল্পী বাবুবাজারের নঈম মিঞা। ছেলেবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে নঈম মিঞার দোকানের সামনে দাঁড়াতেন তিনি। তুলি দিয়ে কাচের ওপর ছবি আঁকতেন নঈম মিঞা। সেগুলো বিক্রি করতেন। নঈম মিঞার কাছে ছবি আঁকার পাঠ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু একদিন নঈম মিঞা ছোট বালকটিকে ধমক দিয়ে বিদায় করে দিলেন। কারণ তাঁর জীবনের প্রথম শিল্পের ওস্তাদ নঈম মিঞা চাননি শিল্পের নেশায় এই শিশুর জীবনও তার মতো খুকখুক কাশির ও ধুকধুকে কষ্টের হয়ে উঠুক। নঈম মিঞার মতো পরবর্তী জীবনে তাঁর বাবাও চাননি তাঁর ছেলে কবি হোক। কবিতা লিখলে জীবনে বিত্তবৈভবে সফল হওয়া যায় না, তাই অভিভাবকরা কেউ কবি হতে তাঁকে উৎসাহিত করেননি।

কিন্তু নঈম মিঞা এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে উৎসাহ না পেলেও তাঁর সৃষ্টিশীল মন থেমে থাকে নি। সকল বাধাকে অতিক্রম করে তিনি হয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম কবি। আর বাংলাদেশের অন্যতম এই কবি হচ্ছেন শামসুর রাহমান।

হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘১৯৬০ বাঙালি মুসলমানের আধুনিক হয়ে ওঠার বছর; তাঁদের কবিতার আধুনিকতা আয়ত্তের বছর।’ কেন? কারণ, শামসুর রাহমানের প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বের হয় ১৯৬০ সালে। ‘বইটির নামই বিকিরণ ক’রে নতুন চেতনা, এবং কল্পনাকে সরল রোমান্টিকতা-আশাউচ্ছ্বাস থেকে বিরত করে এক জটিল গভীর  আলোড়নের মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেয়।’

মেধা-মনন জুড়ে কবির রবিঠাকুর আছেন,
উপরন্তু বস্তুবোধের শিল্পসহ বাঁচেন।
প্রগতিকে মান্য করে ঋদ্ধ পথিক যিনি,
তাঁর প্রকৃতির বিশিষ্টতা হয়তো কিছু চিনি।

কবি শঙ্খ ঘোষের কাব্য দর্শন কবিতায় এসেছে এভাবে শামসুর রাহমান।

খান সরওয়ার মুরশিদ যখন তাঁর সম্পর্কে বলেন, শামসুর রাহমানের কবিতায়, ‘আধুনিক মানুষের অভ্যুথ্যানের সব পর্ব, আবেগগত বুদ্ধিগত তত্ত্বগত সব দিক ধরা পড়েছে’। তখন তিনি যথার্থই বলেন। আধুনিকতার ব্যাখ্যায় বাস্তবতা এবং প্রতিবেশচিন্তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; সমান গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক মানুষের বুদ্ধি ও তত্ত্বগত অবস্থানের বিশ্লেষণও। শামসুর রাহমান তা করতে পেরেছেন তা স্বার্থকভাবেই।

শামসুর রাহমানের পরিচয় কিন্তু ভিন্ন। আধুনিক কবিদের অভিভাবক বুদ্ধদেব বসুর প্রতি পরবর্তীকালে তিনি অপার মুগ্ধতায় লিখলেন বটে শব্দে আমরা বাঁচি এবং শব্দের মৃগয়ায়/আপনি শিখিয়েছেন পরিশ্রমী হতে অবিরাম, কিন্তু এর বহু আগে কলাকৈবল্যবাদী দর্শন ছেড়ে তিনি নেমে পড়েছেন কবিতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে।

কবিতা তাঁর কাছে আর শুধু শব্দের বেসাতি হয়ে রইল না, কবিতা হয়ে পড়লো বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনন্য কথকসমাজবদলের হাতিয়ার। গুলিটা লাগল যেন আসাদের বুকে নয়, শামসুরের আসাদের শার্ট-এর মারফতে সারা বাঙালি জাতি বুঝে গেল গুলিটা আসলে লেগেছিল বাংলাদেশের বুকে যে বাংলাদেশের তখনো জন্ম হয়নি। নিজ বাসভূমে বইটিতে গ্রন্থিত ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি সংঘটিত গণমিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত আসাদের ওপর লেখা কবিতাটির প্রথম স্তবকগুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিম্বা সূর্যাস্তের/জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়। এই কবিতাটিতে বোন আছে, জননী আছে, ডালিমগাছ আছে, আর অমোঘভাবে ফুটে উঠল এ সত্য যে আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা। এ পর্যায়ে শামসুরের কবিতা আর বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাস একটি আরেকটির পরিপূরক।

শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থগুলোর শিরোনামে একের পর এক এরই প্রতিফলন হলো : বন্দিশিবির থেকে, দুঃসময়ের মুখোমুখি, বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে এবং কিছুটা স্বপ্নগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ গ্রন্থটি। বায়ান্নোর আর্তি ফুটিয়ে তুললেন বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতায়, আর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লিখলেন, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা শীর্ষক অনন্য কবিতাটি। এর পরের কবিতাটি স্বাধীনতা তুমি সমগ্র বাংলা কাব্যে স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত একটি ঝলক: স্বাধীনতা তুমি/রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/স্বাধীনতা তুমি/কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো/ মহান পুরুষ…।

তাঁকে হুমায়ুন আজাদ নিঃসঙ্গ শেরপা বলেছিলেন। কিন্তু শামসুর রাহমান ঠিক জীবনানন্দ ধাঁচের নিঃসঙ্গতা কবিতায় আনেননি, বরঞ্চ পারিবারিক মায়ার একটি প্রলম্বিত ছায়া তাঁর কবিতায় টানা আছে। জীবনবোধ ও দর্শনে জীবনানন্দের মতো মৌলিক তিনি হয়তো ছিলেন না, কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো শাশ্বত কাব্যশক্তি হয়তো তাঁর ছিলো না, কিংবা আল মাহমুদের মতো কাব্যকথনের আচমকা মোচড় তাঁর কবিতায় পাওয়া দুষ্কর, কিন্তু বাঙালি রাজনীতিসচেতন মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের নাগরিক জীবনের মূল্যবোধের শিকড়ের ঠিকুজি শামসুর রাহমানের কবিতায় একান্তভাবে পাওয়া যায়। জীবনভর মধ্যবিত্তের দিন কালাতিপাত হয় বঞ্চনা আর বিপর্যস্ততার মধ্যে, থাকে স্বপ্নভঙ্গ আর সব হারানোর বেদনা।

এই নারকীয় নগর প্রতিবেশেও আকাশে ওঠে দুর্মর চাঁদ; ‘বাউন্ডুলে ময়লা ভিখারী আর লম্পট জোচ্চোর গ-মূর্খ আর ভন্ড ফকির অথবা অর্ধমগ্ন ভস্মমাখা উন্মাদিনী বেহেড-মাতাল’ অধ্যুষিত এ-শহরে কখনো ‘রজনীগন্ধার ডালে কাগজের মতো চাঁদ বুনে স্বপ্নের রূপালি পাড়’ নগরসভ্যতার ভালো-মন্দের সংমিশ্রণে শামসুর রাহমানের মনোবিশ্ব।

অতৃপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো মহাকালের গর্ভ থেকে ধূলিধূসরিত একটি বিস্মৃতপ্রায় জাতিসত্তার বোধকে লেখনী দিয়ে বার বার জাগিয়েছেন যে মানুষটি তিনি শামসুর রাহমান – এক নিঃসঙ্গ শেরপা।

বায়ান্নোর রক্ত ও অশ্রুরঞ্জিত বাংলা ভাষাকে বর্ম করে তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন । বাংলা ভাষার অস্ত্র উঁচিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন দুঃসময়ের মুখোমুখি।

এ ভূ-খন্ডের অখন্ড ইতিহাস যেন তার কবিতার পাতা।
আমাদের যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সুচারু, যা কিছু সংবেদনশীল, যা কিছু মহৎ, যা কিছু শ্রেষ্ঠ— সেসব কিছুর এক অসমান্য সমন্বয় ঘটেছিল শামসুর রাহমানের মধ্যে।

ধর্মান্ধদের প্রলয়সংগীতে উন্মত্ত পাকিস্তানি জমানায় তিনি আধুনিকতার পতাকা দৃঢ় হাতে উত্তোলিত রেখেছেন। তবে চারদিক থেকে ধেয়ে আসা কালো হাওয়াকে মোকাবেলা করেই গেয়েছেন মুক্তির , জীবনের গান ।

আবেগহীন , মমতাহীন বেজান নগরে রেখে গেছেন কবিতার এক সুদূরপ্লাবি নগর, যার অনন্ত নাগরিক শামসুর রাহমান । প্রয়াণ শব্দটি কখনও এই মানুষটিকে ছুঁয়ে যাবে না

নেকড়ের উদ্যত থাবা থেকে তিনি আফ্রোদিতি- উদ্ধারে ব্রতী। একশীর্ষ-বহুশীর্ষ নাগের মুখে তিনি ছুঁড়ে দিয়েছেন তার কবিতার অব্যর্থ মন্ত্র;

“আমার কবিতা করে বসবাস বস্তি ও শ্মশানে
চাঁড়ালের পাতে খায় সূর্যাস্তের রঙলাগা ভাত,
কখনো পাপিষ্ঠ কোন মুমূর্ষু রোগীকে কাঁধে বয়ে
দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যায় আরোগ্যশালায়।
(নিজের কবিতা বিষয়ে কবিতা)

১৯৭২ সালের জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় বেরিয়েছে শামসুর রাহমানের ‘স্যামসন’। মুক্তিযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, কিন্তু ন’মাস ধরে পুরো দেশটাকে বন্দিশিবির বানানোর ক্ষোভ তখনও যায়নি। ‘ক্ষমতামাতাল জঙ্গি হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা, তোমাদের হোমরা-চোমরা সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?’ এই ক্রোধ ও ক্ষুব্ধ স্বর প্রাত্যহিকতার জগৎ থেকে তুলে নিয়ে কবিতায় সাজানো হয়েছিল। ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলেন নবজাত রাষ্ট্রের প্রধান কবি কণ্ঠটি। অসহায় অন্ধ শৃঙ্খলিত মিল্টন-বর্ণিত প্যারাডাইস লস্টের ‘স্যামসন’-এর তুলনায় এ এক অন্য স্যামসন প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে। তখন সত্যই ছিল প্রদীপ্ত হওয়ার সময়। ১৯৭১-এ মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়ে এটাই ছিল প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা, সার্থকতমও। এর আগে বাংলা কবিতায় এই স্বর শোনা যায়নি :

‘আমাকে করেছো অন্ধ, যেন আর নানা দুষ্কৃতি
তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমারচোখে। স্মৃতি
তাও কি পারবে মুছে দিতে? যা দেখেছি এতদিন_
পাইকারি হত্যা দিগ্গি্বদিক রমণীদলন আর ক্ষান্তিহীন
রক্তাক্ত দস্যুতা তোমাদের, বিধ্বস্ত শহর, অগণিত
দগ্ধ গ্রাম, অসহায় মানুষ, তাড়িত, ক্লান্ত; ভীত
_এই কি যথেষ্ট নয়? পারবে কি এসব ভীষণ
দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন?
দৃষ্টি নেই, কিন্তু আজো রক্তের সুতীব্র ঘ্রাণ পাই,
কানে আসে আর্তনাদ ঘনঘন, যতই সাফাই
তোমরা গাও না কেন, সব কিছু বুঝি ঠিক।

একদা এ শহর ছিল একটা বিভাগীয় রাজধানী। ১৯৪৭–এর পর বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল ঢাকা, আর ঢাকাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের মানুষগুলো যেভাবে আস্তে আস্তে নিজেকে চিনতে চিনতে বাড়তে বাড়তে নিজেরা বিকশিত হচ্ছিল; জাতিসত্তার বিকাশ ঘটছিল; রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টি হচ্ছিল; অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মানবিক মূল্যবোধ বাড়ছিল; অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছিল—এর প্রতিটি স্তরেই শামসুর রাহমান নিজেকে দেখেছেন, রেখেছেনও। রাহমানের স্বপ্ন ও স্মৃতির শহর ঢাকা। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নানা প্রেক্ষাপটে এ শহর বিকশিত হওয়ার প্রতিটি স্তরে কবি তাঁর স্পর্শ রেখে গেছেন।

আমাদের যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সুচারু, যা কিছু সংবেদনশীল, যা কিছু মহৎ, যা কিছু শ্রেষ্ঠ— সেসব কিছুর এক অসমান্য সমন্বয় ঘটেছিল বাংলা কবিতার যুবরাজ শামসুর রাহমানের মধ্যে।

কবি শামসুর রাহমান আমাদের গর্ব; যার বুক আর বাংলাদেশের হৃদয়ে কোনো তফাৎ নেই, থাকতে পারে না! তাঁর জন্মদিনে শুধু বলব আমি তারায় তারায় রটিয়ে দিব তুমি আমাদের ।

শুভ জন্মদিন বাংলা কবিতার রাজপুত্তুর,স্বপ্নকথক