শুভ জন্মদিন কমরেড চারু মজুমদার…

লুৎফুল কবির রনি

বিপ্লবী কে? বিপ্লবী হচ্ছে সে, যে সমস্যা দেখে অন্যের কাছে ছুটে যায় না, নিজেই সমস্যার সমাধান করে এবং নেতৃত্ব দিতে পারে।

– চারু মজুমদার

চারু মজুমদার ও কানু সান্নাল

একটি অসমাপ্ত বিপ্লবের মহানায়কের নাম চারু মজুমদার।রোগা পাতলা চেহারার এই মানুষটি এক অদম্য বিপ্লবী বহ্নিশিখা বহন করতেন তাঁর বুকের ভিতর, ভারতের ইতিহাসকে তিনি আমাদের চিনিয়েছেন কৃষকের সংগ্রামের ইতিহাস হিসাবে এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের কথা সবচেয়ে ভালো ভাবে তিনিই বুঝেছিলেন, তিনিই বুঝেছিলেন যে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে এক নয়া গণতান্ত্রিক সমাজ গড়া, এবং শুধু বুঝেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং নিজের হাতে ভারতবর্ষের সর্ববৃহত কৃষি বিপ্লবের আগুন জ্বালালেন তিনি। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়েরা নেমে এলেন দেশের জন্যে জীবন দিতে, কৃষকের মুক্তির জন্যে সংগ্রাম করতে, এবং তাঁরা হাসি মুখে দেশের মুক্তির স্বার্থে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। গড়ে তুললেন এক নয়া ইতিহাস যা প্রতিনিয়ত দেশের শাসক শ্রেণীকে আজও আতঙ্কিত করে তোলে।

সেই আতঙ্কের কারণেই একদিন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং প্রায় ১২ দিন অকথ্য অত্যাচার চালায় লালবাজারের সেন্ট্রাল লকআপে। সেই অত্যাচারের মুখেও এই শীর্ণ চেহারার মানুষটি অবিচল ছিলেন নিজের আদর্শের প্রতি এবং মানুষের মুক্তির জন্যে নিজের প্রাণ বলিদান দিলেন ২৮ শে জুলাই ১৯৭২ এর সকালবেলা। তাঁর মৃত্যুতে স্বস্তি পায়নি তার সরকার, তাই তো গভীর রাতে শহরের আলো নিভিয়ে মানুষটাকে নিয়ে গিয়ে নিক্ষেপিত করা হলো কেওরাতলার ঘাটে।

মানুষটার নাম, চারু মজুমদার, এবং তাঁর নাম আজও মুখে আনা মানা। কারণ তাঁর হাত ধরেই তো জন্ম নিলো এই দেশের কৃষক বিদ্রোহ, তাঁর চোখ দিয়েই তো জনগণ চিনলেন যে সমস্ত ভোট পার্টিগুলি জোতদার – জমিদার আর পুঁজিপতিদের দালাল, তাদের রং আলাদা, ঢং আলাদা, কিন্তু ভিতরে সব ভোট পার্টিই এক।

চারু মজুমদার – এক নিষিদ্ধ নাম, শাসকের বুকে কাঁপন ধরানো এক ঝোড়ো তুফান, বিপ্লবের এক জীবন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এতোটাই সংক্রামক তার প্রভাব; মৃত্যুর ৪৭ বছর পরেও শাসকশ্রেণী তার উপস্থিতিকে মানুষের মধ্যে খুঁজে বেড়ায়, আক্রমণ শানায় শুধুমাত্র ভয়ের জায়গা থেকে।

চারু মজুমদার

জমিদার-তনয়ের পোশাকটা অনায়াসে ছুঁড়ে ফেলে যিনি কৈশোর জীবনেই সাম্যবাদী ভাবধারায় দীক্ষিত হন, মানুষের মধ্যে কাজ করাটাই নিজের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেন এবং আজীবন সেই সঙ্কল্প থেকে চ্যুত হন না, তিনিই তো অগণিত নিপীড়িত মানুষের মনে এই ব্যবস্থা বদলের স্বপ্নকে প্রোথিত করবেন। তেভাগার লড়াইয়ে নিজেকে তৈরি করে, কম্যুনিস্ট পার্টিতে থেকেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে সমস্তরকমের শোধনবাদী ঝোঁকের বিরুদ্ধে অনলস সংগ্রাম করে যাওয়া সাথীকে মানুষের মন থেকে উপড়ে ফেলা এতোটা সহজ যে নয়, সেটা শাসকশ্রেণী হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।

নকশালবাড়ির ঐতিহাসিক কৃষক সংগ্রামের তাত্ত্বিক নেতৃত্বদানই শুধু নয়, প্রান্তিক মানুষের লড়াইয়ের সেই আগুনকে, সারা ভারতব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার মুখ্য কারিগর কমরেড চারু মজুমদার। ‘বিপ্লবীকে হত্যা করা যায়, বিপ্লবের আদর্শকে নয়’- এই কথাটি এই মানুষটার সারা জীবনের কাজের সাথে মিলে যায়; যিনি আদর্শের জন্য, স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার স্বার্থে, সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ থেকে জীবনের অন্তিম পর্যায়েও সরে আসেননি। তাঁর জীবদ্দশাতেই পার্টির অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, দল ভেঙ্গে কেউ কেউ বেরিয়ে গেছেন, সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছেন চারু মজুমদার; কিন্তু কোন কিছুই তাঁকে বিপ্লবের লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে সক্ষম হয়নি। ‘খতম অভিযান’, ‘কর্তৃত্ব’ প্রভৃতি নিয়ে বিস্তর জলঘোলা ও সমালোচনা হয়েছে, এই নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে, আগামীতেও হবে; কিন্তু প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রের একপেশে, নির্বিচার খতমের বিরোধিতা না করে, এই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ না জানিয়ে, হাজার হাজার বছরের সামাজিক অন্যায় ও অবিচারের বিচার না করে, শুধু ‘চারুবাবুর খতমের লাইন’র বিরোধিতা করার মধ্যে একধরণের সুবিধাবাদ আছে, যা বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ কখনোই নয়। বিতর্ক, সমালোচনা, ব্যর্থতা ইত্যাদির পরেও কমরেড চারু মজুমদার বেঁচে আছেন, থাকবেন সমাজ পরিবর্তনের শেষদিন অবধি, কারণ তিনি বামপন্থী আন্দোলনে শোধনবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের প্রতীক, তিনি সোচ্চারে এই মানুষখেকো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলেন, তিনি আগামী বিপ্লবের অগ্রপথিক শুধু নন, এক অনুসরণযোগ্য অনুপ্রেরণা।

চারু মজুমদার মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক নতুন দিনের, চারু বাবু রবীন্দ্র সঙ্গীত খুব পছন্দ করতেন । তিনি বলতেন

“যে স্বপ্ন দেখতে জানেনা ও অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে জানেনা সে বিপ্লবী হতে পারে না “

চারু মজুমদার ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। মানুষের মনে চারু মজুমদার যে আশার স্বপ্ন খোদাই করে দিয়েছিলেন আজও সেই স্বপ্ন বয়ে চলেছে ইতিহাসের উত্তরাধিকার!

‘হয় আত্মত্যাগ নয় আত্মস্বার্থ, মাঝামাঝি কোনো রাস্তা নেই’

শুভ জন্মদিন কমরেড চারু মজুমদার….
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক….