শুভ জন্মদিন তারেক মাসুদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

`আমি একটা মাদরাসা পড়া গ্রামের ছেলে। যার ছোটখাটো মাদরাসায় আজান দেয়ার কথা অথবা মৌলবি হওয়ার কথা। অথচ যে দুর্ভাগা দেশে সিনেমার কোনো স্কুল নেই সে দেশে আমি সিনেমা বানাচ্ছি। আমি সৌভাগ্যবান নই?’

-তারেক মাসুদ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদ যে আধুনিকতার জন্ম দিয়েছেন , ছোট্ট জীবনে যা দিয়ে গেছেন তা সত্যিই তুলনাবীহিন। তারেক মাসুদের মত স্বাপ্নিকদের চলে যাওয়া বলে দেয়, এই ফাটকাবাজির দেশে স্বপ্নের পাখিরা বেঁচে থাকে না।

তিনি নেই- আসবেন না আর ফিরে। আলোর সরণি ধরে পথ হাঁটতে হাঁটতে পথ হারিয়ে ফেললেন?

কোথায় গেলেন?

কোনো উত্তর নেই- শ্রান্ত গাঙচিলের মতো প্রশ্নগুলো মুখ চেয়ে থাকে। বিষন্ন, বড্ডো বেশি মলিন। কখনো শোকাহত। এবং প্রতিবাদী।

আমাদের দেশটা বামনের দেশ, এখানে মহাকায়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। পলিমাটির ক্ষুদ্র ব-দ্বীপে গর্বিত হবার মতো মানুষ খুব বেশি নেই। এখানে স্বপ্ন মানেই উঁচু তলার অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ আর মিহিন শাড়ির কোলবালিশ।

কিন্তু এর মাঝেও আকাশটা আমাদের ছিলো। কখনো কখনো সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা আলোর পাণিপ্রার্থী হতাম। সেই আলোর নানা নামের মাঝে একটি নাম ছিলো তারেক মাসুদ।

তারেক মাসুদ- কী আশ্চর্য ব্যাতিচার এই নামের মধ্যে। কিন্তু মানুষটা ব্যাতিচারিক ছিলেন না নিশ্চয়ই। তাঁর ছবির কাজ দেখে মনে হতো- তিনি আলোকে ভালোবেসেছিলেন। মায়া-পার্বণে তাই আলোর সঙ্গে মিশে গেছেন ; তিনি চলে গেছেন- এ আমি মিথ্যে বলেছিলাম। তিনি আছেন, আলোর বারান্দায় স্মৃতির ডেপথ অব ফিল্ডে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়।

স্ত্রীর সঙ্গে

তিনি চলে গেলেন- নির্মম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। এ শোকের মূল্য কি? এ শোক কী পারবে, যে অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হয়েছিলো, তাকে ফিরিয়ে দিতে? আমাদের ভবিষ্যত কী তবে নেমেসিসের হাতের মুঠোয়?

বধির হয়ে কেবলই ঘুমাই, চেতনার দরজায় কড়া নাড়ে বিবর্ণ ফুটেজ। জেগে উঠি। ট্রাইপডের উচ্চতা বাড়িয়ে চেষ্টা করি আকাশ দেখার।

আকাশ তখন রোদন করে- ‘ তারেক মাসুদ আর নাই’।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প তখন মৃতপ্রায়। সিনেমাপাগল এক তরুণ তার সিনেমার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। বাণিজ্যিক ছবির দাপুটে বাজার, রুগ্ন সমাজ, অর্থাভাব কিংবা অসহযোগী প্রশাসন- কোনোকিছুই তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে মানুষটি চেয়েছিলেন এ দেশের চলচ্চিত্র আক্ষরিক অর্থেই শিল্প হয়ে উঠবে।

আজ অসময়ে ঝরেপরা সেই সিনেমাপাগল মানুষটির জন্মদিন।

তারেক মাসুদ সাধারণ জীবন-যাপন করেননি। তিনি যে জীবন বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল একসঙ্গে যোদ্ধার এবং প্রেমিকের।
সিনেমার জন্যে, তিনি সিনেমার মতোই জীবন-যাপন করেছেন। সিনেমায় আমরা যেমনটা দেখি – ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্র ও ঘটনা, যুদ্ধ ও প্রেম – যেমনটি বাস্তব দুনিয়ায় ঘটে না, তারেক মাসুদ তেমন জীবনচর্চায় বিশ্বাসী ছিলেন। চলচ্চিত্রের চারকোনা পর্দাকে ভালোবেসে তিনি যেন এক সরলরৈখিক প্রেমের ও লড়াইয়ের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। ধার্মিকেরা যেমন তাঁদের ‘কেবলা’ বা মোক্ষ বেছে নেন এবং জীবন কাটিয়ে দেন সেদিকে লক্ষ করে, তারেক তরুণ বয়সেই সেটি ঠিক করে নিয়েছিলেন – তিনি সিনেমার পর্দায় মানুষের গল্প বলবেন। শুনতে যেমন সহজ শোনাচ্ছে, এ কিন্তু তা নয় – এ ছিলো তাঁর এক কঠিন পথ। চলচ্চিত্রের আয়ত পর্দাকে ভালোবেসে জীবন-যাপন করেছিলেন তিনি, অর্থ-সম্পদ, পরিবার, প্রতিষ্ঠা সবকিছু ছেড়ে এদেশে সিনেমার বিকাশের জন্যে লড়েছেন।

তারেক মাসুদের জন্যে সিনেমা ছিলো জীবন, সিনেমা ছিলো তাঁর ধর্ম। তাই সিনেমার হেন কোনো ক্ষেত্র নেই যাতে তিনি অংশ নেননি। চলচ্চিত্র পরিচালকের হ্যাট পরে ‘ডিরেক্টর’ লেখা সংরক্ষিত চেয়ারে বসে বা দাঁড়িয়ে তিনি সিনেমার সঙ্গে তাঁর জীবনের বোঝাপড়া শেষ বলে মনে করেননি। সিনেমার পর্দায় একটি মনমতো ইমেজকে ফোটানোর জন্যে যা যা দরকার তা যেমন তিনি কনে বিদায়-দেওয়া পিতার মতো ধৈর্য ও ঔদার্য নিয়ে আয়োজন করেছেন, এ ইমেজ যেন দর্শকের মনে গিয়ে পৌঁছুতে পারে, অন্তত তার চোখের রেটিনায় প্রক্ষেপিত হয়, সে জন্যেও তিনি জীবনপাত করেছেন। আর এ দর্শক, যাঁর কাছে তিনি তাঁর ছবিকে পৌঁছাতে চেয়েছেন, তিনি কেবল ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত চাকুরে বা ব্যবসায়ী নন।ভুরুঙ্গামারীর কৃষক, ছাগলনাইয়ার শ্রমিক বা ধামরাইয়ের মুদি দোকানির কাছেও তিনি তাঁর ছবি পৌঁছাতে চেয়েছেন। মুক্তির গান থেকে তাঁর এ প্রদর্শন-অভিযাত্রা শুরু, তাঁর শেষ ছবি রানওয়ের ক্ষেত্রেও তিনি তা চালিয়ে গিয়েছেন। মাইক্রোবাস নিয়ে, তরুণদের একটা দল নিয়ে, কখনো ক্যাথরিন ও শিশুপুত্র নিষাদকে নিয়ে ২০১০-এর বেশিরভাগ সময় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন ঢাকার বাইরে বহু জায়গায় রানওয়ের প্রদর্শনী করে।

আদম সুরত, মুক্তির গান থেকে মাটির ময়না, রানওয়ে অন্তর্যাত্রা সময়ের প্রেক্ষাপটকে ক্যামেরবন্দি করার নান্দনিকতা তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা পরিচালকদের আসনে বসিয়ে দেয়। ভালোবাসা তার জন্য!

শুভ জন্মদিন তারেক মাসুদ। বাংলা চলচ্চিত্র আপনার দেখানো পথেই সারাবিশ্বে রাজত্ব করবে একদিন। অবশ্যই করবে। আমরা সেদিনটার অপেক্ষায় রইলাম।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]