শুভ জন্মদিন নবারুণ ভট্টাচার্য

বাতাসে শব্দ ঘষে বোধ হয় আগুন জ্বালাতে পারতেন কবি, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার নবারুণ ভট্টাচার্য। তাঁর লেখা কবিতা ‘ এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ আজো ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক শোষণ, সামাজিক বঞ্চনা আর স্বৈরাচারী সময়ের বেড়াজালের মাঝে বসে প্রতিবাদের আগুন জ্বালানোর স্বপ্ন দেখাতে পারে। তাঁর লেখা গল্প আর উপন্যাস আক্রমণাত্নক ভাষা আর বিষয়ের চমকে দেয়া ফ্লাড লাইটের আলো হয়ে আমাদের সচকিত করে, ভাবতে বাধ্য করে।
আজ এই সাহিত্যিকের জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বিজন ভট্টাচার্য ও প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্য। পড়াশোনা করেছেন কলকতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল এবং আশুতোষ কলেজে ভূতত্ত্ব নিয়ে। পরে সিটি কলেজে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে। ১৯৭৩ সালে একটি বিদেশি সংস্থায় যোগদান করে ১৯৯১ পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন। কিছুদিন বিষ্ণু দে-র ‘সাহিত্যপত্র’ সম্পাদনা করেন এবং ২০০৩ থেকে চালাচ্ছেন ‘ভাষাবন্ধন’ পত্রিকাটি। এর আগে দীর্ঘদিন ‘নবান্ন’ নাট্যগোষ্ঠী পরিচালনা করেছেন।
নবারুণ ভট্টাচার্য ১৯৬৮ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় তার প্রথম ছোটগল্প ‘ভাসান’ লেখেন। প্রথম কবিতার বই ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’।
কথাসাহিত্যে নবারুণ আলোচনার আসেন ১৯৯৩ সালের প্রথমদিকে ‘হারবার্ট’ উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর। ১৯৯৬ সালে নবারুণের উপন্যাস ‘হারবার্ট’ সম্পর্কে কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর এক লেখায় মন্তব্য করেছিলেন, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় লিখেছিলেন, এই একটা উপন্যাসেই প্রমাণ হয়ে গেছে যে নবারুণ একজন জাত-ঔপন্যাসিক।
সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতন ও ভাঙনের ক্রান্তিকালে নকশাল আন্দোলন, তারুণ্য ও সামাজিক উদ্দেশ্যহীনতার প্রেক্ষাপটে লেখা ‘হারবার্ট’ উপন্যাস তাঁকে ভিন্ন মর্যাদায় ধরে রাখবে। ‘হারবার্ট’-এর লেখনরীতিই এমন যে তা বোধহয় অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ হওয়া সম্ভব নয়। কবিতা ও ছোটগল্পের জন্য নবারুণ অনেক আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন পড়ুয়াদের কাছে; কিন্তু ‘হারবার্ট’ ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছিল। কলেবর তত বড় নয়, কিন্তু এর আবেদন ছিল সুদূরস্পর্শী। বাজারের প্রত্যাশা না করেই তিনি লিখতেন, কিন্তু আঙুলের ডগায় ঝলসে ওঠা নবারুণের ক্ষমতার গুণে বাজারই ছুটে এসেছিল তাঁর কাছে।
নবারুণের গদ্য এবং পদ্যে বারবার ঝলসে উঠেছে মানুষের অধিকারের লড়াইয়ের কথা। ঝলসে উঠেছে ঠিক-বেঠিকের পরোয়া না করা তারুণ্যের আগুনে ঝাঁপ দেয়ার কথা। মানুষ এবং তার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নানা শব্দের অস্ত্রে ভর করে তাঁর লেখাকে আলাদা বৈশিষ্টে আলোকিত করেছে বাংলা সাহিত্যে। তাঁর লেখায় সত্তরের দশকে পশ্চিম বাংলার নকশাল আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছায়াপাত করেছে গভীর ভাবে। তাঁর এই তীব্র প্রকাশভঙ্গী, শব্দের ভেতরে অন্যধরণের চেতনার উদ্ভাষ প্রভাবিত করেছে পরের প্রজন্মের
প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ এর জন্য নবারুণ নরসিংহ দাস (৯৪), বঙ্কিম (৯৬) ও সাহিত্য আকাদেমি (৯৭) পুরস্কার লাভ করেছেন। এই উপন্যাসকে ভিত্তি করে পরে নাটক ও সিনেমাও তৈরি হয়েছে।
নবারুণ ভট্টাচার্যের অন্যান্য রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘কাঙাল মালসাট’, ‘লুব্ধক’, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’, ‘হালালঝান্ডা ও অন্যান্য’, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’‘মহাজনের আয়না’, ‘ফ্যাতাড়ু’, ‘রাতের সার্কাস’ এবং ‘আনাড়ির নারীজ্ঞান’।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ‘মুখে মেঘের রুমাল বাঁধা’, ‘বুলেটপ্রুফ’, ‘জোড়াতালি’ ইত্যাদি।
নবারুণ ভট্টাচার্য ১৯৪৮ সালের আজকের দিনে (২৩ জুন) মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন।

ছবিঃ গুগল