শুভ জন্মদিন নাজিম হিকমত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

‘সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালবাসা| সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না।’-নাজিম হিকমত লিখেছিলেন কথাগুলো।

জেলখানার কবি তিনি। সারাটা জীবন তিনি সাধারণ মানুষের জন্য লড়েছেন, কবিতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বিদ্রোহের আগুন, আন্দোলন করেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে গিয়ে জীবনের বেশিরভাগ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে জেলে। নাজিম হিকমত শুধু তুরস্কের কবি নন, তিনি পৃথিবীর কবি, সমস্ত শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কবি। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে পৃথিবীর নানা দেশে, নানা ভাষায়।

বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যিকদের নিয়ে যদি ভাবা যায়, তবে নাজিম হিকমতের নামটি ছাড়া যেন শতাব্দীটা পূর্ণ হয় না।

মাতৃভাষা তুর্কিতে ছাড়া অন্য কোন ভাষাতে তিনি লেখেননি। তা সত্ত্বেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার কবিতা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সাহিত্যে হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর। তারপর গোটা জীবন তিনি লিখে গেছেন। শুধু কবিতাই নয়, লিখেছেন বহু নাটক, ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও চিত্রনাট্য। করেছেন সাংবাদিকতাও।

নিজের কবিতার অনুবাদ নিয়ে ১৯৬১ সালের দিকে লেখা একটি কবিতায় নাজিম লিখেছিলেন, ‘তিরিশটি-চল্লিশটি ভাষায় আমার লেখা প্রকাশিত, কিন্তু আমার তুরস্কে, আমার তুর্কি ভাষায় আমার লেখা নিষিদ্ধ।’ ১৯৫১ সালের ২৫ জুলাই তুরস্কের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ, স্বৈরাচারি মানবতা বিরোধী সরকার তাঁর নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিয়েছিলো।

নাজিম হিকমতের জন্ম সম্ভ্রান্ত পরিবারে হলেও তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন সাধারণ মানুষের মুক্তিসংগ্রামে। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন-
মানুষকে জড়িয়ে আমার বাঁচা,
মানুষেরই জন্যে আমার ভালোবাসা
আমি ভালোবাসি গতির তরঙ্গে ভাসতে
ভালোবাসি ভাবতে
আমি সংগ্রামকে ভালোবাসি…

কবি নাজিম হিকমত ১৯০২ সালের ১৫ জানুয়ারি অটোমান সাম্রাজ্যের (বর্তমান গ্রীস) সালোনিকাতে জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা সেখানকার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, মা ছিলেন শিল্পী। আর দাদু ছিলেন তুরস্কের একজন সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষ। শিল্পী মা ও দাদুর উৎসাহে চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখেন তিনি। ১৭ বছর বয়সে তার কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯১৮ সালে তুর্কিস নেভাল একাডেমি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯২১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য নাজিম ইস্তাম্বুল ছেড়ে গোপনে চলে যান আনাতোলিয়ায়।

১৯২১ এর শুরুর দিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া এই কবি সোভিয়েত ইউনিয়নকে কাছ থেকে জানার তাগিদে ছুটে যান সুদূর জর্জিয়ায়, তারপর সেখান থেকে মস্কোতে। সেখানকার কম্যুনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় সৌভাগ্যক্রমে পরিচিতি লাভ করেন সর্বহারা অধিকার বঞ্চিত মানুষদের পথপ্রদর্শক সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠাতা, কার্ল মার্কস ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের সঙ্গে।

১৯২৪ সালে তুরস্ক স্বাধীন হবার পর দু’চোখ ভরা সুদিনের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। লেগে পড়েন দেশ গড়ার কাজে। কিন্তু নাজিমের দেখা স্বপ্ন ছিল তুরস্কের জন্যে ভীতির কারণ। ‘স্বাধীন সার্বভৌম’ শব্দগুলো তুরস্কের জন্য ছিলো লোক দেখানো। শুধু শোষকেরই পরিবর্তন হয়েছিলো এই যুদ্ধের মাধ্যমে। কারণ, এই স্বাধীনতা ছিলো না গণমানুষের জন্যে, বরং আইনের ছত্রছায়ায় মানুষকে শোষণের আরও একটি দলিল ছিলো মাত্র।

এমন অবস্থায় নাজিমের জ্বালাময়ী কবিতা ছিল সরকার তথা শাসকদের জন্যে হুমকিস্বরূপ। তাই তাকে আটকানো অতীব জরুরি হয়ে উঠলো। নাজিমকে পাঠানো হলো জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কিন্তু তাদের কোনো অভিসন্ধিই পূরণ হয়নি। নাজিমের কলমও থেমে থাকেনি। জেলের অন্ধকার নাজিমের স্বপ্নকে স্পর্শও পর্যন্ত পারেনি।

জেলখানায় বসে তিনি লিখেছেন বিপ্লবী সব কবিতা। অশুভ শক্তিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন- ‘মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয়, ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে।’ মানুষের প্রতি, স্বপ্নের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ আত্মবিশ্বাস। তাইতো তিনি বলেছিলেন- ‘দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে।’

১৯২২ সালে তিনি রাশিয়ার কমিউনিস্ট ইউনিভার্সিটি অব দ্য টইলার্স অব দ্য ইস্ট এ অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে সারা বিশ্ব থেকে আসা লেখক ও শিল্পীদের সাথে সাক্ষাৎ হয় হিকমতের। এসময় মায়াকভস্কির সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তার।

১৯২৪ সালে তুরস্ক স্বাধীন হওয়ার পর আবারো তিনি তুরস্কে যান । সেই বছরেই বামপন্থী একটি ম্যাগাজিনে কাজ করার দায়ে গ্রেফতার হন তিনি। পরে তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। ১৯২৮ সালে তিনি পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসার অনুমতি পান। এর পর পরবর্তী দশ বছরে তিনি পাঁচ বার জেলে গেছেন। এসময় তার নয়টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। নিপীড়িত মানুষের দু:খ দুর্দশা এবং সাম্রাজ্যবাদের শোষণমূলক কর্মকান্ড তার কবিতায় উঠে আসে। ১৯৩৮ সালে তিনি আবারো গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে যে তার কবিতা সামরিক বাহিনীকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করছে। ছাত্রদেরকে বিপ্লবের প্ররোচনা দিচ্ছে। বিচারে তাকে আটাশ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। জেলে থাকার এই সময়টিতে নাজিম লিখেছেন অজস্র কবিতা ও গান।

১৯৪৯ সালে নাজিম হিকমতের মুক্তির জন্য একটি আন্তর্জাতিক কমিটির মাধ্যমে চিলির বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা, দার্শনিক জ্যা পল সার্ত্র, সঙ্গীতশিল্পী পল রবিনসনের মতো দিকপালেরা তার মুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি আঠারো দিনের জন্য অনশনে যান। সেই বছরই হিকমত পাবলো নেরুদার সাথে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলে দীর্ঘ ১৩ বছর পর তিনি মুক্তি অর্জন করেন। এর মধ্যে তাকে দুবার হত্যার চেষ্টা করা হয়।

জেলখানার চিঠিতে বলেছেন-
‘জল্লাদের লোমশ হাত যদি কখনও আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরায়,
নাজিমের নীল চোখে
ওরা বৃথায় খুঁজবে ভয়।’

তার কবিতা র্তুকী থেকে ইংরেজিতে, পরে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]