শুভ জন্মদিন নায়ক রাজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

‘আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি। না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনো দিন আসেনি। ওটা আসেনি বলেই আজকে আমি এতদূর শান্তিতে এসেছি।’

-নায়ক রাজ রাজ্জাক

ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুনে যখন পুড়ছিলো এ উপমহাদেশের মানুষ, সেই উত্তাল সময়ে কলকাতা থেকে স্ত্রী ও শিশুপুত্র নিয়ে এক যুবক পা রেখেছিলেন ঢাকায়। তারপর এক অনিশ্চিত যাত্রা। কে জানত, সেই যুবক এক সময় হয়ে উঠবেন বাংলা চলচ্চিত্রের রাজপুত্র! কিংবদন্তি এই নায়ক রাজ রাজ্জাক।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম নায়করাজ রাজ্জাক। একদিকে কলকাতার উত্তম-সুচিত্রা জুটির আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে পাকিস্তানি উর্দু ছবির দুর্দান্ত দাপট। এই দুইয়ের মধ্য থেকে ঢাকাই ছবির নিজস্ব অবস্থান তৈরি হয়েছিলো যাদের মেধা, মনন ও শ্রমে, নায়করাজ রাজ্জাক সন্দেহাতীতভাবেই তাদের শীর্ষস্থানীয়। যার অভিনয়শৈলী হৃদয় কেড়েছে বাংলাদেশের সব বয়সের মানুষের। সাড়ে তিনশ’ ছবিতে অভিনয় করে হয়েছেন নায়করাজ রাজ্জাক।

“নীল আকাশের নিচে আমি
রাস্তা চলেছি একা।
এই সবুজের শ্যামল মায়ায়
দৃষ্টি পড়েছে ঢাকা”…

নীল আকাশের নীচের শ্যামল মায়ার পথে পথ চলেছেন বাংলাদেশের ষাটের দশকের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক। তিনি ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির উঠোনে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। কখনো ক্লান্ত বিকেলের প্রেক্ষাগৃহে তিনি জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছেন একাত্তরের সৈনিক হিসেবে, কখন জীবনের শেষপ্রান্তে আদর মমতার বৃক্ষ চাদর বাবা হয়ে কাঁদিয়েছেন দর্শক। তিনি হারিয়ে গেলেন সবুজের শ্যামল মায়ায় দৃষ্টিকোন থেকে, রেখে তার অতুলনীয় কীর্তি আর আকাশ সমান চিরঅম্লান অবদান।

নায়ক রাজের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকতার টালিগঞ্জে। তার প্রকৃত নাম আব্দুর রাজ্জাক। জন্মের পর কলকাতায় বেড়ে ওঠা রাজ্জাকের। কখনই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিলো না তার; বরং তার ইচ্ছে ছিলো খেলোয়াড় হওয়ার। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় মঞ্চ নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য তার স্পোর্টস শিক্ষক তাকে বেছে নেন। অনেকটা অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষকের কথায় তিনি অভিনয় করেন। কিন্তু আশ্চর্য্জনকভাবে তার অভিনয় দেখে সবাই মুগ্ধ হন। এই থেকেই তিনি অভিনয়ের আনন্দ পেতে শুরু করেন।

শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক ‘বিদ্রোহীতে’ গ্রামের কিশোর চরিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনয়ে যুক্ত হন। কিন্তু অভিনয়ের কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও প্রধান বাধা ছিলো তার পরিবার। পরিবারের কেউ চাননি তিনি অভিনয় করেন। তবে তার মেঝ ভাইয়ের সহযোগীতায় শেষমেশ স্বপ্ন পূরণ হয়েছিলো তার। টালিগঞ্জের সিনেমাশিল্পে তখন ছবি বিশ্বাস, উত্তমকুমার, সৌমিত্র, বিশ্বজিৎদের যুগ। সেখানে তার অভিনয়ে সুযোগ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না। এর মধ্যে শুরু হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই দাঙ্গাই তার জীবনের সঠিক পথ বাতলে দেয়। দাঙ্গার কারণে কলকাতায় থাকাটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। সেখানে গেলে হয়তো কিছু একটা হবে। এরপর রাজ্জাক ঢাকা এলেন এবং জয় করলেন। অভিনয়ের অধ্যায় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের আরেকটি অধ্যায় শুরু করেন তিনি।

কপর্দকশূন্য রাজ্জাক নিঃস্ব রিক্ত অবস্থায় শরণার্থী হিসেবে পা রেখেছিলেন ঢাকায়। তখন ঢাকার চলচ্চিত্র নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। এই ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকেই তার রাজ্জাক হয়ে ওঠা। জীবনে পাড়ি দিয়েছেন বন্ধুর পথ। কঠিন জীবনসংগ্রামের পর সফল হয়ে তিনি নায়করাজ। অসীম মনোবল, প্রচণ্ড পরিশ্রম আর সাধনার মাধ্যমে তিনি নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। কত কিছু অদল বদল হলো। আধুনিকতার হাওয়া লাগলো পালে, তারপরেও সুবচন দুর্নিবারের মত দেদিপ্যমান তার কর্মকান্ড। আজো তাকে বলা হয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি।

ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে তার সখ্য। মঞ্চের সঙ্গে জড়িত থাকলেও স্বপ্ন ছিল সিনেমাকে ঘিরে। জহির রায়হানের সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ভাগ্য খুলে যায় এখান থেকেই। বেশ কয়েকটি ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর ভাগ্যচক্রে হঠাৎ একদিন নায়ক হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান রাজ্জাক।

লোককাহিনি নিয়ে জহির রায়হান তখন বেহুলা নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ‘বেহুলা’ হবেন সুচন্দা। কিন্তু লখিন্দরের চরিত্রে কাউকেই তার পছন্দ হচ্ছে না। ওই সময়ে যারা একটু নামীদামি শিল্পী, তারা প্রায় পুরো ছবিতেই কংকাল হয়ে শুয়ে থাকতে চাইলেন না। তখনই জহির রায়হান তাঁকে এ ছবিতে নেন সুচন্দার বিপরীতে। সাইনিং মানি ছিলো ৫০০ টাকা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দর্শক এ ছবির মাধ্যমে রাজ্জাককে বরণ করে নেন। রাজ্জাকের ক্যারিয়ারের শুভ সূচনা হয় এভাবেই।এরপর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘আনোয়ারা’ আর তৃতীয় ‘আগুন নিয়ে খেলা’। প্রথম ছবি মুক্তি পাওয়ার আগেই তিনি সুপারস্টার খেতাবে ভূষিত হন। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা দেখে অনেকে আন্দাজ করেছিলেন এই আলো হুট করে বিকট শব্দে পড়া বজ্রপাতের মত ক্ষণস্থায়ী আলো নয়। এই আলোর বিচ্ছ্যুরন কালে কালে ছড়িয়ে পড়বে সময় থেকে সময়ে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তে।

সাদাকালো যুগে তাঁর অভিনীত ছবিগুলোর আকর্ষণে তিনি নায়িকাদের চাইতেও এগিয়ে ছিলেন। কবরী যত দর্শক টেনেছেন তার চাইতে অধিক টানতেন রংবাজ রাজ্জাক। কখগঘঙ , এতটুকু আশা , আর্বিভাব এর সরল-সহজ প্রেমিক কিংবা দর্পচূর্ণ ছবির চাকরের ছদ্মবেশে মনচুরি করা নায়ক তিনি। হেলেদুলে নেচে নেচে গাওয়া ‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’ এই নায়ক এসেছিলেন বেহুলার ভেলায়। জহির রায়হানের বেহুলায় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তারপরও তাতে তিনি ছিলেন শায়িত নায়ক। উঠে দাঁড়ালেন রোমান্টিক ছবির প্রেমিক হিসেবে। স্বাধীনতার পর রংবাজে আবির্ভূত হয়েছিলেন এদেশের বদলে যাওয়া তারুণ্যের প্রতীক হয়ে।

তারপর তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আলোর মিছিলের প্রতিবাদী ভাই বা অবুঝ মনের দ্বৈত প্রেমে সফল রাজ্জাক ছড়িবে গেলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার, মধ্যবিত্তই মূলত সংস্কৃতির ধারক। সেই মধ্যবিত্তের মনে দোলা দেওয়ার মতো কাজ সবাই করতে পারে না। এরা জানে বেশী বোঝে কম। ফলে মানা না-মানার দ্বন্দ্বে থাকে তারা। তাদের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছিলেন রাজ্জাক। ম্যাটিনি থেকে নাইট শো হাউসফুল নোটিশের পেছনে দাঁড়ানো এই নায়ক যখন অস্তমিত হতে শুরু করলেন মানুষও আগ্রহ হারাতে শুরু করলো সিনেমার প্রতি। মনে আছে সমাধি বা অশিক্ষিত ছবির কথা। সেই গান, সেই সুর, সেই লিপ-মিলানো আজ আর চোখে পড়ে না।

চলচ্চিত্র জীবনে তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পাঁচবার তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে নায়ক রাজ রাজ্জাক জাতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন।

জীবনের পুরোটা সময়ে অভিনয়ই ছিলো তাঁর ব্রত। জীবন থেকে নেয়া, আবির্ভাব, নীল আকাশের নিচে; কালজয়ী এমন অসংখ্য চলচ্চিত্রে মূর্ত করেছেন অসাধারণ অভিনয় নৈপুণ্যে।

জীবনের সায়াহ্নে এসেও দূরে ছিলেন না অভিনয় থেকে। অভিনয়ই যে তার রক্তে মেশা।নায়ক রাজ ছিলেন,আছেন,থাকবেন।

এ কথা নিদ্বির্ধায় বলতে পারি– যত নায়ক আসুন, যত মেধা আর শ্রমের মিলন হোক– আর কোনো নায়করাজ আসবেন না আমাদের দেশে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পদ্মা মেঘনা সুরমা যমুনার তীরে তীরে থাকা মানুষের আনন্দ বিনোদনের নায়ক রাজ্জাক, আপনাকে জানাই কুর্নিশ। এই কলহ বেদনা আর সংঘাতময় সমাজে আপনি স্বস্তির নাম।

শুভ জন্মদিন নায়ক রাজ

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]