শুভ জন্মদিন পটুয়া কামরুল হাসান

লুৎফুল কবির রনি

একটা দেশের মুখ বা পরিচয় বলতে প্রথম কিসের কথা মাথায় আসে? পতাকা, তাই না? কোন দেশের জাতীয় পতাকা সেই দেশের অস্তিত্বের একটা অংশ হয়ে যায়। আরেকটা জিনিস হলো জাতীয় প্রতীক। আমাদেরটা যেমন আমরা সব ধাতব কয়েনের পেছনে দেখি। পানিতে ভাসমান একটা শাপলা, দুই পাশে দুইটা ধানের শীষ, উপরে তিনটা পাটের পাতা আর চারটা তারকা যা সংবিধানের চারটা মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সেকুলারিজম প্রকাশ করে। এই যে আমাদের লাল সবুজ পতাকা আর জাতীয় প্রতীক- এই দুইটা জিনিসের রূপকার বা ডিজাইনার কিন্তু একজন মানুষই- পটুয়া কামরুল হাসান!

কামরুল হাসান নামটা এভাবেই বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এদেশে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পর শিল্প, সংস্কৃতির উন্নয়ন আর সংরক্ষণে যার নাম আসে তিনি কামরুল হাসান, দেশে বিদেশে নন্দিত চিত্রশিল্পী হলেও নিজেকে “পটুয়া” বলেই পরিচয় দিতেন তিনি। আজীবন বাংলার মুখই আঁকতে চেয়েছিলেন তিনি।

কামরুল হাসান ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর বর্ধমান জেলার (বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যাধীন) কালনা থানার নারেঙ্গা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম এ.এস.এম. কামরুল হাসান অর্থাৎ আবু শরাফ (শার্ফ) মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তাঁর ডাকনাম ছিলো সাতন। কামরুল হাসানের জন্মের আগে তাঁর মার পরপর কয়েকটি সন্তানের মৃত্যু হলে তখনকার সংস্কার অনুযায়ী তাঁকে সাতকড়ির বিনিময়ে কেনা হয় বলে তাঁর নাম হয় সাতকড়ি; সংক্ষেপে সাতন। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ হাশিম ও মার নাম মোসাম্মৎ আলিয়া খাতুন।

১৯৩০ সালে কলকাতার তালতলাস্থ ইউরোপীয়ন এসাইলাম লেনে অবস্থিত মডেল এম.ই. স্কুলের ইনফ্যান্ট ক্লাস থেকেই কামরুল হাসানের বিদ্যাশিক্ষার শুরু হয়। এই মডেল স্কুলগুলির পরিকল্পনা করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্যবয়সে কয়েকদিনের জন্য এ স্কুলে পড়েছেন। এ স্কুলে কামরুল হাসান ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। এরপর কামরুল হাসান ১৯৩৭ সালে বাবার আগ্রহে কলকাতা মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়ার সময় তিনি প্রচুর ছবি আঁকতেন। তাঁর তিনরঙা একটি ছবি মাদ্রাসার বার্ষিক ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিলো।

কামরুল হাসান যখন কলকাতা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন তখন পড়ালেখার চাইতে ছবি আঁকায় মেতে থাকতেন বেশি। সে মাতামাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে পরীক্ষা দিয়ে অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পরিবর্তে আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিলেন। পাস করে, ভর্তির ফরম নিয়ে বাবাকে অনুরোধ করেন তিনি যেন তাকে কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে একটি পরিচয় পত্র এনে দেন এবং তা নিয়ে আর্ট স্কুলে গিয়ে প্রিন্সিপাল সাহেবের সঙ্গে দেখা করেন। তখন পরিচয়পত্রের জন্যে তার বাবা তাকে নিয়ে যান খান বাহাদুর ওয়ালিউল ইসলাম সাহেবের কাছে। তিনি খুব স্নেহভরে তার ড্রইং খাতার ওপর চোখ বুলিয়ে তাঁর নিজস্ব প্যাডে কয়েক লাইন লিখে দিলেন। ওয়ালিউল ইসলাম সাহবের উৎসাহদানে, কেবল তিনিই নন তার বাবাও উৎসাহিত হয়েছিলেন। আর এভাবেই ১৯৩৮ সালের জুলাই মাসে কামরুল হাসান কলকাতার ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টস’-এ ভর্তি হন।

কামরুল হাসানের বাবা ধার্মিক ব্যক্তি হওয়ায় পুত্রের শিল্পকলা চর্চার বিরোধী ছিলেন। কিন্তু কামরুল হাসানের প্রবল আগ্রহের কারণে তিনি তাকে আর্ট স্কুলে পড়ার সম্মতি দেন এই শর্তে যে, তাঁর পড়াশুনার যাবতীয় খরচ তার নিজেকেই বহন করতে হবে। তবে পুত্রের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিলো। এছাড়া শিল্পকলা সম্পর্কে কামরুল হাসানের পরিবারের এই দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরবর্তীকালে কিছুটা পরিবর্তন আসে। বিশেষত মন্বন্তরের সময় (১৩৫০/১৯৪৩) গেজেট পত্রিকায় প্রকাশিত জয়নুল আবেদিনের স্কেচ দেখে তার বাবা শিল্পকলার প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে কামরুল হাসানকে কবরের নকশা আঁকার কাজ দিয়ে তাঁর বাবা তাকে কিছু আয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা ছিল না। নিয়মিত উপার্জনের জন্য কামরুল হাসান এক পুতুল তৈরির কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে সেলুলয়েডের পুতুলের চোখ আঁকতে হতো তাকে। প্রখর আলোয় ওই চোখ আঁকতে গিয়ে কামরুল হাসানের নিজেরই দৃষ্টিশক্তি খানিকটা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কামরুল হাসান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’-এ যোগ দেন। সুভাষচন্দ্র বসুর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েই তিনি এই দলের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ শুরু হলে এই নিয়ে চিত্রশিল্পীরা ছবি আঁকেন। কলকাতার কমিউনিস্ট পার্টি দুর্ভিক্ষ নিয়ে আঁকা চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কামরুল হাসানের চিত্রও এই প্রদর্শনীতে ছিলো। ‘মণিমেলা’ ও ‘মুকুল ফৌজ’ এই দুই শিশুকিশোর সংগঠনের সঙ্গে কামরুল হাসান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘মুকুল ফৌজ’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। কামরুল হাসানের সাংগঠনিক দক্ষতায় মুকুল ফৌজের কার্যক্রম দ্রুত প্রসার লাভ করে।

ভারত বিভাগের পরে, কামরুল হাসান ঢাকাতে আসেন রাজধানী। ১৯৪৭ সালের শুরুর দিকেই কলকাতা আর্ট স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হকসহ আরও অনেকে ঢাকায় এসে একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছিলেন। কামরুল হাসান তখনও ছাত্র। কিন্তু শিক্ষকদের এসব আলোচনা-পরিকল্পনার কথা তিনি জানতেন। তাঁদের সঙ্গে কামরুল হাসানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো এবং আর্ট স্কুলের বাইরে নানা কাজে তিনি তাঁদের সঙ্গী ছিলেন। ফলে কামরুল হাসানও এসব আলোচনা পরিকল্পনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সবার সহযোগিতায় অবশেষে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। যার নাম দেওয়া হয় ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্টস'( বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট)। এই আর্ট

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই বিখ্যাত পোস্টার

ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদেরকে যেমন আন্দোলন করতে হয়েছে তেমনি এই প্রতিষ্ঠানকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য পরিশ্রমও করতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী হাসান অনেক রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন যা স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

সে সময়কার পরিস্থিতি শিল্পকলা চর্চার অনুকূল ছিলো না। পুরান ঢাকায় রক্ষণশীল সর্দারদের আধিপত্য ছিল প্রবল। এদের কারণে গোঁড়া মৌলভী ও পীর নামধারী কিছু ধর্মব্যবসায়ী ফতোয়া দেবার অবাধ অধিকার লাভ করেছিলো। লালবাগের এমন এক ধর্মব্যবসায়ীর ঘাঁটি থেকে কেবল ছবি আঁকার বিরুদ্ধে ফতোয়াই দেওয়া হয়নি, রাস্তায় রাস্তায় পোস্টারও সাঁটা হয়েছিলো। শুধু চারুশিল্প নয়, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায়ও তখন বাধা আসত এসব মহল থেকে। বিশেষ করে রবীন্দ্র সংগীতের আসর বসলে হামলার আশংকায় বাইরে তরুণদের পাহারা বসাতে হতো। এ ধরনের পরিবেশে ১৯৫০ সালে মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যায়। উগ্র মুসলমানদের হাত থেকে হিন্দু সম্প্রদায়কে বাঁচানোর জন্য কামরুল হাসান স্থানীয় যুবকদের নিয়ে ওয়ারি এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেছিলেন। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই ১৯৫০ সালে এখানকার শিল্পীরা আর্ট ইনস্টিটিউটের বাইরে শিল্প আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে গড়ে তোলেন ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’। জয়নুল আবেদিন এই গ্রুপের সভাপতি এবং কামরুল হাসান সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ধর্মীয় অনুভূতি যে মানুষের মুক্তি ঘটাতে পারে না, তা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে পৃথিবীকে দেখেছিল। এ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালি হচ্ছে এমনই সংস্কৃতি-সচেতন জাতি, সে মুখের ভাষার জন্য প্রাণ পর্যন্তস্ন বিসর্জন দিতে পারে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের তা-ই দেখায়।

কামরুল হাসানের রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে আমরা মুক্তিযুদ্ধকালে শিল্পীর সেই বিখ্যাত ছবি দেখি ইয়াহিয়াকে নিয়ে- ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’, যে পোস্টার উজ্জীবিত করেছিল লাখ লাখ বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে। কামরুল হাসানের রাজনৈতিক সচেতনতানির্ভর আরও ছবি দেখি ‘ইমেজ ৭৪’ নামক সিরিজটিতে। এগুলোতে জাতির জনক হত্যার পরবর্তী সময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির যে উত্থান এবং তার ফলে দেশের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া নৈরাজ্যের চিত্র তুলে ধরেন তিনি এসব ছবিতে। এ ছাড়া আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। মৃত্যু-পূর্ববর্তী সময়ে তার আঁকা ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার ইতিহাসে এক প্রামাণ্য দলিল।

১৯৭৭ সালের ১ ডিসেম্বর কামরুল হাসান তার খেরোখাতায় লিখছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী বিরোধিতা করেছিল তারা দেশি বা বিদেশি যে-ই হোক না কেন, তাদের জন্য আমার হৃদয়ে কোনো স্থান সেই। এই মানসিকতার মধ্যে উগ্রতা নেই, ভ্রান্তি নেই; স্রেফ সহজ ও সরল অনুভূতি। বাঙালি মনের অনুভূতি।’

কামরুল হাসান দেখিয়ে গেছেন বাঙালি শিল্পীর শিল্পচর্চার চরিত্র কেমন হওয়া উচিত। এবং শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি প্রতিটি শিল্পীর যে কিছু দায়িত্ব আছে- তাও তিনি দেখিয়ে গেছেন তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।কামরুল হাসানের মতো শিল্পীর আদর্শের কারণেই হয়তো মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো এমন এক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে সংগঠিত হয়; আবার যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির জন্য বাঙালি শিল্পী সমাজ হয় সরব।

তবে কষ্টের বিষয় হল আমাদের শিল্পী সমাজের মেরুদণ্ডহীনতা , চাটুকারিতা এই মহান মানুষটিকে দেখে যেতে হয় নি , না হলে বেঁচে থেকে তাঁকে এই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতেন ।

শুভ জন্মদিন পটুয়া

ছবি: গুগল