শুভ জন্মদিন ফ্রানৎস কাফকা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কীসব বিচিত্র, আপাত-অর্থহীন, মানসিক ও শারীরিক নৃশংসতার ঘটনা অবলীলায় ঘটে যেতে থাকে কাফকার বিভিন্ন রচনায়। কখনো মনে হয় পুরো বিষয়টা মঞ্চস্থ হচ্ছে একটা টানা দুঃস্বপ্নের ভেতরে। তাঁর গল্পের চরিত্রেরা যেন অন্ধকারে হাতড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের জীবনের মানে।  হঠাৎ আবার মনে হতে পারে পুরোটাই ঠাট্টা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরের ইউরোপিয়ান সমাজে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাবোধের এক গদ্যকবিতা, তীব্র ব্যাঙ্গে তছনছ করা সমাজচিত্র।

কাফকার সংক্ষিপ্ত জীবন ছিলো খ্যাপাটে, যন্ত্রণাপীড়িত, আত্মবিশ্বাসহীন, নিজের প্রতি ঘৃণায় ভরা। নিজের অদ্বিতীয় মেধার পূর্ণ স্বীকৃতি তাঁর নিজের সামান্য একচল্লিশ বছরের জীবদ্দশায়ও তিনি পাননি। আজ ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিনে প্রাণের বাংলার বাংলার পক্ষ থেকে রইলো ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।
কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আজ বলা যায়, তিনি ছিলেন এক রহস্যময় সাহিত্য প্রতিভা। নিঃসঙ্গ ইউরোপিয়ান ভবিষ্যদ্বক্তা, যার সৃজনী-ক্ষমতাকে তাঁর সমকালীন লেখকেরা উপেক্ষা করেছিলেন। তিনি নিজের পরিবার থেকে শুরু করে কর্মস্থলে ছিলেন উৎপীড়িত। কিন্তু মনের ভিতরে ছিলো তাঁর  সন্তসুলভ চিন্তার গভীরতম প্রদেশ। সেখানেই বসবাস করে তিনি যেন দেখতে পেয়েছিলেন একদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে, সোভিয়েত গুলাগ আসবে, আমলাতন্ত্র পৃথিবী জুড়ে আরো পোক্ত হবে এবং আধুনিক মানুষের জীবন জটিল থেকে আরো জটিলতর হয়ে উঠবে।

১৮৮৩ সালের ৩ জুলাই ফ্রানৎস কাফকার জন্ম তখনকার অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগ শহরে। কাফকা ছিলেন মধ্যবিত্ত, ইহুদি সম্প্রদায়ের সন্তান। তাঁর বাবা হারমান কাফকা। কিছুদিন সেনাবাহিনীতে, কিছুদিন ভ্রাম্যমাণ সেনলসম্যান  হিসেবে কাজ করে হারমান কাফকা তাঁর স্যুভেনির আর কাপড়চোপড়ের দোকান চালু করেন প্রাগে। তাঁর অফিসে কাজ করতেন ১৫ জন কর্মচারী। তাঁর ব্যবসার লোগো ছিলো দাঁড়কাক (চেক ভাষায় kavka)। কাফকার মা ছিলেন ইয়ুলি কাফকা ছিলেন ইয়াকব লোউভি নামের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর কন্যা।

১৮৯৩-এ এলিমেন্টারি স্কুল ছেড়ে কাফকা প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারে জার্মান মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হন।১৯০১-এ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে কাফকা চলে আসেন প্রাগের জার্মান কার্ল-ফার্দিনান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরু করেন রসায়ন বিষয়ে পড়াশোনা। কিন্তু দুই সপ্তাহ পরে তিনি আইনের ছাত্র হয়ে যান। আইন নিয়ে পড়াশোনা তাঁর পছন্দ ছিল না, কিন্তু বাবা খুশি হয়েছিলেন, কারণ আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।প্রথম বছরের পড়া শেষ হতেই কাফকার সঙ্গে পরিচয় হয় ম্যাক্স ব্রডের। ম্যাক্সও ছিলেন আইনের ছাত্র। শুরু হয় কিংবদন্তিতে রূপ নেওয়া এক আজীবন বন্ধুত্বের। ম্যাক্স ব্রডই প্রথম খেয়াল করেন খুব কম কথা বলা, লাজুক ধরনের এই ছেলেটির মেধা ও প্রজ্ঞা অগাধ। জীবনভর কাফকা খুব উৎসুক পাঠক ছিলেন।সেই মানুষটির রচনাই আজকের পৃথিবীতে সাহিত্যানুরাগী মানুষের কাছে এক অপার বিষ্ময় হয়ে আছে।

ডাক্তারি শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কাফকা পড়ার চল আছে তেমনি শ্রেণীবৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও কাফকাকে নিয়ে লেখা হয়েছে কয়েক শ বই আর তেমনই ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণবাদী চোখ দিয়ে কাফকার প্রতিটা লাইন, এমনকি প্রতিটা শব্দের, আর কমা, সেমিকোলন ব্যবহারেরও ব্যাখ্যা হয়েছে বহুবার। তবে শেষমেশ কাফকার যে ছবিটি পাঠকের কাছে রয়ে যায় তা যন্ত্রণা আর দুঃখ-কষ্টের।

কাফকা নিজেও বলেছিলেন, তাঁর কোনো কোনো লেখা ‘সত্যিই একদম ব্যক্তিগত স্বভাবের কিছু হিজিবিজি কাটা বা খসড়া নোট টোকার বেশি কিছু না’; কিন্তু জীবনকে সাহিত্যে পরিণত করার তাঁর যে মূল লক্ষ্য ছিলো, সেখানে তিনি ঠিকই ঐ ব্যক্তিগত পর্যায়কে অতিক্রম করে, সমগ্র মানব-অস্তিত্বের মৌলিক চেহারাটিই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন ‘পৃথিবীকে তার শুদ্ধ, সত্য ও অপরিবর্তনীয় রূপে তুলে ধরতে’ (ডায়েরি, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৭)।

৩৪ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন কাফকা৷ বলা যায়, তাঁর প্রায় সারাটি জীবনই কেটেছে অসুস্থতায়। ভীষণ বিষণ্ণতা এবং সামাজিক উদ্বেগের মধ্য দিয়ে তার পথচলা৷ মারা যান ৪১ বছর বয়সে৷ মৃত্যুর কিছুকাল আগে নিজের যাবতীয় পাণ্ডুলিপি এবং না পাঠানো চিঠি ও স্মৃতিচারণামূলক বই দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘকালের বন্ধু, সাহিত্যিক ও প্রকাশক মাক্স ব্রডকে৷ দেয়ার সময় একটা অনুরোধও করেছিলেন – সব কিছুই যেন তাঁর মৃত্যুর পর ধ্বংস করে ফেলা হয়৷ বন্ধু তা করেননি৷ কাফকা বেঁচে থাকতে তাঁর খুব কম রচনাই প্রকাশিত হয়েছিলো৷ মৃত্যুর পরই সিংহভাগ প্রকাশিত হয়৷ ফ্রানৎস কাফকার সাহিত্যকর্মই তাঁর লেখক সত্তাকে চিরজীবী করেছে৷

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]