শুভ জন্মদিন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

লুৎফুল কবির রনি

“মাস্টার’দা সবাইকে ডেকে যার যার দায়িত্ব বুঝিয়ে ছড়িয়ে পড়তে বললেন। আমি সহ আরো জন-দশেকের দায়িত্ব ছিলো দামপাড়া পুলিশ লাইনের আশপাশে রাত ১০ টার মধ্যে উপস্থিত থাকা। আমারা যথাসময়ে মিলিটারী পোশাক পরে উপস্থিত হলাম। সঙ্গে ছিলো দু’খানা শাবল, আলমারি ভাঙার জন্য। কথা ছিলো রাত ১০টায় আরেক গ্রুপ পাহাড়ে উঠে প্রহরীদের আটক করবে এবং বন্দে মাতরম’ চিত্‍কার করবে। এই চিত্‍কারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যারা জঙ্গলের চারদিকে ছিলাম তারাও একযোগে বন্দে মাতরম বলে চিত্‍কার করে পাহাড়ে পৌছাবো। দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছি।

তখনো জানি না আমাদের মিশন কতটুকু সফল হবে। জীবনের প্রথম এ ধরনের একটি অপারেশন করছি। এমন সময় হঠাৎ করে ওপর থেকে বন্দে মাতরম চিত্‍কার শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমরা যারা জঙ্গলে ছিলাম তারা একযোগে বন্দে মাতরম চিত্‍কার দিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে পড়লাম। শত্রুরা আমাদের চিত্‍কার শুনে ভাবল, আমরা হয়তো সংখ্যায় অনেক। ফলে তারা ভয়ে পালালো। পুলিশ লাইনের ভেতরে ঢুকে শাবল দিয়ে আলমারি ভেঙে রাইফেল, বারুদ নিয়ে নিলাম। আর যা প্রয়োজন হবে না তাতে আগুন লাগিয়ে দিলাম। সে দিন আমারা সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলাম বলেই পুলিশ লাইন আক্রমণ সফল হয়েছিলো। আমাদের হাতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র এসেছিলো, যা পরে জালালাবাদ যুদ্ধে কাজে লাগানো হয়।”

এক সাক্ষাতকারে ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের বিখ্যাত অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী।

যুদ্ধ, মহামারি, মন্বন্তর, দাঙ্গা, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ হাজারো ঘটনা একজন মানুষ প্রত্যক্ষ করে গেছেন এক জীবনে। বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে সমান্তরালভাবে বয়ে চলেছিল যেন তাঁর জীবন।

তিনি বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। কালের সাক্ষী এই মানুষটি ছিলেন সমকালীন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সমানভাবে সক্রিয়। বয়সকে তুচ্ছ করে কারও কাঁধে ভর না দিয়ে এখনো তিনি প্রতিবাদ করে গিয়েছিলেন।

“দেশকে ভালো বাসো। স্বদেশের মানুষের জন্য শ্রম দাও, দেশ বদলে যাবে।”
-বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী।

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী শুধু একটি নাম নয়; এই নামটি জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাঙালির চেতনার সঙ্গে। সূর্যসেনের সহযাত্রী, বিনোদ বিহারী চৌধুরী কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সেই ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে নাম লিখিয়েছিলেন। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নিজ জীবন সঁপে দিতে দ্বিধা করেননি।

ত্রিশের দশকের বিপ্লবীদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শেষ যোগসূত্র ছিলেন বিনোদ বিহারী চৌধুরী। ১০৩ বছর বয়সে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু যে সেই যোগসূত্র চিরকালের জন্য ছিন্ন হলো তা নয়, ত্রিকালদর্শী এক মহান বিপ্লবীকেও হারাল এপার-ওপার বাংলার দেশপ্রেমিক মানুষ। মৃত্যুর আগে সম্মানিত হয়েছিলেন তার স্বদেশভূমি বাংলাদেশে আর ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রথীন্দ্র নারায়ণ বসু শ্রদ্ধা-সম্মাননা জানাতে গিয়ে বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনার সৃষ্টিসুখের আদর্শে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ফিরে পাবে এগিয়ে চলার পথ, গড়ে তুলবে সুস্থ সমাজ, কণ্ঠে তুলবে এক জাতি এক প্রাণ একতা মন্ত্র।’

ছাত্রজীবনের প্রায় পুরোটা সময় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর কেটেছে কারাগারে।১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন মাষ্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিনোদ বিহারীসহ বিপ্লবী দলের বীর সৈনিকেরা। ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে যুদ্ধ হয় মাষ্টারদার বিপ্লবী বাহিনী এবং ব্রিটিশ আর্মি ও পুলিশের সঙ্গে। সেই যুদ্ধে শহীদ হন অনেক বিপ্লবী । বিনোদ বিহারীর কণ্ঠনালীতে গুলি লাগে। বেশ কিছুদিন গোপনে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। আর তখন তাঁকে মৃত কিংবা জীবিত ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

অকুতোভয় এই বিপ্লবীর আজ জন্মবার্ষিকী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, প্রণাম, স্যালুট । শুভ জন্মদিন বিপ্লবী। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হউক।

 

ছবি: গুগল