শুভ জন্মদিন শচিনকর্তা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

গভীর রাত। মুম্বাইয়ের রাস্তায় কয়েকজন পাঁড় মাতালের আড্ডা। সুখ-দুঃখের কথার ভীড়ে এক মাতাল দুঃখ সইতে না পেরে গাইতে শুরু করলো- ‘সুন মেরে বন্ধুরে, সুন মেরে মিতোঁয়া’।

হঠাৎ কাছের একটি বাড়িতে আলো জ্বলে উঠলো। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন। ভদ্রলোক করজোড়ে মাতালদের বললেন- ‘তোমরা যা খুশি তা-ই কর, শুধু গানকে রেহাই দাও। অন্তত এই গানটা তোমরা গেয়ো না, প্লিজ।’ মাতাল তরুণেরা রেগেমেগে জানতে চাইলো- ‘কেন? কে আপনি?’ লম্বা, রোগা লোকটি জানালেন- ‘আমি শচীন দেব বর্মন। তোমরা যে গানটির ইজ্জত লুটছো, আমি সেই গানের অভাগা গায়ক, কম্পোজার!’

পরিবারের সঙ্গে

১৯৩২ সালে ভারতের বিখ্যাত রেকর্ড প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান এইচএমভিতে অডিশন দিলেন শচীন, কিন্তু তাতে সফল হতে পারলেন না। হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না তিনি। তাই একই বছর শচীনের প্রথম রেকর্ড বের হয় হিন্দুস্তান মিউজিক প্রোডাক্টস থেকে। তার রেকর্ডকৃত প্রথম দুটি গান হলো ‘ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে’ ও ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’। এ সময় তিনি পল্লীগীতি গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

কিশোরকুমার। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পর দাদা অশোককুমারের স্টুডিয়োতে বেড়াতে আসতেন কিশোর কুমার।

শচিনকর্তা লিখেছেন, ‘‘আমি তখন ফিল্মিস্তানে কাজ করছি। দাদামণি অশোককুমারের নিজস্ব প্রোডাকশন ‘এইট ডেজ ১৯৪৬’। … এক দিন দাদামণি আমাকে কিশোরের গান শুনতে বললেন। …ওর গলা শুনে আমি মুগ্ধ। তখনই ওই ছবির একটি গান কিশোরকে দিয়ে গাওয়ালাম। প্রথম ‘টেক’-এ-ই একেবারে ‘ওকে’ করতে হলো। আমি তখন দাদামণিকে বলেছিলাম, কিশোরকে আর কলেজে পড়িয়ে দরকার নেই, এই গানের লাইনেই যেন সে চলে আসে।’’

সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে কিশোরকুমার বলতেন, ‘‘মুম্বইতে এসেছিলাম অভিনয় করব, প্রযোজনা করব বলে। গান করার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। বুড়ো লোকটা আমার পিছু নিতেন। রাগ হত। পালিয়ে পালিয়ে যেতাম।’’

কিশোরকুমারের সেই ‘পালিয়ে যাওয়া’ মনটা হঠাৎই উধাও হল এক দিন।—
‘‘গাড়ি করে যাচ্ছি। ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি থেমেছে। হঠাৎই পাশ থেকে আওয়াজ শুনি, ‘আরে কিশোইরা না?’ দেখি, ওই বুড়োমানুষটা দরজা খুলে নেমে আমার গাড়িতে ঢুকে পড়লেন। ড্রাইভারকে বললেন, ‘শহর ছাড়াইয়া গাড়ি লইয়া চল।’

গাড়ি চলতে চলতে এক সময় সবুজ মাঠের ধারে পৌছালো। মানুষটা গাড়ি থেকে নেমে ক্ষেতের মধ্যে চলে গেলেন। হাঁটুর ওপর ধুতি তুলে আল ধরে হাঁটতে লাগলেন। গলায় একটার পর একটা গান।

পিতা পুত্র

আমি কেমন স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে গেলাম। দিকজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কেবল মনে হতে লাগল, এই মানুষটাকেই তো এত কাল খুঁজেছি, আজ থেকে ইনি যা বলবেন, তার বাইরে কক্ষনো যাব না।’’

তিরিশ থেকে ষাটের দশক ছিলো বাংলা গানের ‘সোনার দিন, প্রাণভরে আধুনিক বাংলা গান শোনার দিনও । আর বাংলা গানের সেই সোনার দিনের নির্মাণ যাঁদের হাতে হয়েছিল তাঁদের এক অগ্রজন ছিলেন শচিন দেববর্মণ । আধুনিক বাংলা গানের গায়কীর অনেকটাই তৈরী করে দিয়েছিলেন শচিন দেববর্মণ । হওয়ার কথা ত্রিপুরার রাজা, হয়ে গেলেন আধুনিক বাংলা গানের মুকুটহীন রাজা । ‘সব ভুলে যাই তাও ভুলিনা বাংলা মায়ের কোল’ আজও যে গান তার সুরের মায়ায় আমাদের দুলিয়ে দেয় ।

শচিনদেবের জন্ম কুমিল্লাতে । পিতা নবদ্বীপ চন্দ্র ঈশাণ চন্দ্র মাণিক্যের মৃত্যুর পর সিংহাসন থেকে বঞ্চিত হয়ে চলে আসেন কুমিল্লাতে । সেখানেই জন্ম শচিনদেবের । বাল্য ও কৈশোরে দিনগুলো কাটে কুমিল্লাতেই, কলেজ শিক্ষাও ।

সুরের তাগিদে তিনি নৌকার মাঝি মাল্লাদের সঙ্গে কত যে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। ‘কে যাসরে ভাটি ঘাঙ বাইয়া . . . আমার ভাই ধনেরে কইও নাইওর নিত আইয়া’ . . . তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর একটি, যা রচিত হয়েছিলো তখন। তিনি এদেশের লোকালয়ের সঙ্গে এতো মিশে গিয়েছিলেন যে তাঁর সুরের মূল সম্পদ আহরিত হয়েছিলো বাংলার ভাটিয়ালি বাউল, কীর্তন, জারি থেকে। তিনি নিজের মুখে বলেছেন পূর্ববঙ্গের এমন কোন অঞ্চল নেই, এমন কোন নদী নেই যেখানে আমি যাইনি, ঘুরিনি।

জীবন সায়াহ্নে শচিনদেব আত্মকথায় বলেছিলেন “কেন জানিনা জ্ঞান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির টান অনুভব করে মাটির কোলেই থাকতে ভালোবাসতাম । আর বড় ভালো লাগত সেই সহজ সরল মানুষগুলোকে, গুরুজনরা যাদের সাধারণ লোক। যাইহোক, অসাধারণের দিকে না ঝুঁকে আমি ওই সাধারণ লোকের মাঝেই নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে এক হয়ে গেলাম শৈশব থেকেই।

মহারাজ মানিক্য বাহাদুরের স্মৃতিতে ধুলাবালি পড়ে সমাধিও হয়তো খোয়াই নদীর ঢেউয়ের তালে মিশে গেছে কিন্তু সিংহাসন হারানো নবদ্বীপচন্দ্রের পুত্র শচীন দেব বর্মন সুরের আলোয় সারা পৃথিবী আলোকিত করেছেন এবং করে যাবেন।

গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি থেকে

গান তুলছেন

‘‘ঘরে আরও লোকজন ছিলেন। এক ভদ্রলোক আমার সামনেই তার হাতের ছোট টিনের স্যুটকেস খুলে ওঁকে দেখালেন নোটের গোছা। শচীনদা ওঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে বললেন, তুম জিতনা রুপাইয়া দেখাও, হাম তুমারা পিকচার নেহি করেঙ্গা।’’

ভদ্রলোক এর পরও অনেক কাকুতিমিনতি করে শেষে হাল ছেড়ে চলে গেলেন।
ঘরের মধ্যে বসা এক জন তখন বললেন, ‘‘সাতসকালে এতগুলো টাকা ছেড়ে দিলেন!’’
কর্তা উত্তর দিলেন, ‘‘কুয়া জানো? পাতকুয়া? পাতকুয়া থেকে সব জল তুলে নিলে কুয়া শুকিয়ে যায়। কুয়াতে জল জমবার সময় দিতে হয়। মিউজিক ডিরেকশনও তাই। টাকার লোভে এক গাদা ছবিতে কাজ করলে আমি ফুরিয়ে যাব। আমার ইয়ারলি কোটা আছে। তার বেশি আমি কাজ করি না। আমার এ বছরের কোটা কমপ্লিট। যে যত টাকাই দিক, এ বছর আর নয়।

অথচ এই মানুষটিই যখন কাজের মধ্যে, তখন তিনি আর নিছক সঙ্গীতকার নন, ধ্যানরত তপস্বী!

মুম্বইয়ে শচীন কর্তার খুব প্রিয় মহিলা শিল্পী ছিলেন লতা  ‍মুঙ্গেশকর। লতার কথা উঠলেই তিনি বলতেন, ‘আমায় হারমোনিয়াম দে। লতাকে এনে দে। আর আধা ঘন্টা সময় দে। আমি সুর করে দিচ্ছি |’ লতাজির ওপর এতটাই ভরসা করতেন যে গীতা দত্ত প্রথম পছন্দ হলেও যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন লতাজির উপর। তাঁর মতে, ‘ওই মাইয়া আমায় জাদু করসে। ওরে ছাড়া আঁধার দেহি আমি.’ পরে এই লতাজি-ই প্রচন্ড অপমান করেছেন শচীন কর্তাকে। কোনো সুরকার কখনও নিজের তৈরি স্বরলিপি কাছ ছাড়া করেন না। শচীন কর্তা-ও এটাই করতেন। কিন্তু লাতাজি যখন সুরের দুনিয়ার মধ্য গগনে তখন বেয়াড়া আবদার করেছিলেন। তাঁর দাবি, গানের নোটেশন তাঁর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে তিনি সুর এদিক-ওদিক করে নেবেন। এই দাবি মানা কোনো সুরকারের পক্ষে সম্ভব? বিশেষ করে শচীন কর্তার মতো রাজবংশীয় ঘরানার মানুষ। যিনি বরাবরের স্বাধীনচেতা।

সুরের স্বরলিপির দখলদারি নিয়ে প্রথম দ্বন্দ্বের শুরু। কর্তা লতাজিকে ভালো করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, এই আবদার মানা সম্ভব না। জিদ্দি লতাজিও অনড় তাঁর চাহিদা থেকে। নিরুপায় কর্তা বাধ্য হয়ে লতাজির বদলে নিলেন তাঁর বোন আশা ভোঁসলেকে। সেই সময় শচীন দেবের মতো অনেকেই লতাজিকে তাদের গান থেকে বাদ দিয়েছিলেন। এই ধাক্কায় মন ভেঙ্গে গিয়েছিলো কর্তার।

এর কয়েক মাস পরেই ঘটল দ্বিতীয় ঘটনা. দেব আনন্দ আর শচীন কর্তার জুটি প্রথম থেকেই সুপারহিট। দেব আনন্দ পরিচালনায় আসার পর ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ বানাবেন বলে ঠিক করলেন। সুর দেবার জন্য ডাক পড়লো শচীন কর্তা আর পঞ্চমের। চিত্রনাট্য শোনার পর দু’জনে দু’জনের মতো করে সুর শোনালেন। পঞ্চমের গান বেশি পছন্দ হলো দেবের। তিনি শচীন কর্তাকে খুব নরম গলায় জানালেন, ‘এই ছবিতে পঞ্চমের সুর বেশি ভালো মানাবে। তাহলে পঞ্চম সুর দিক |’ হাসিমুখে সম্মতি দিলেন কর্তা। ছেলের উন্নতি দেখলে কোন বাবা না খুশি হয়?

আগ্রহ নিয়ে একদিন রেকর্ডিং রুমে ছেলের সুর-ও শুনতে এলেন। পঞ্চম সেদিন ‘দম মারো দম’ গান তোলাচ্ছিলেন আশাজিকে। দু’লাইন শোনার পরেই রাগে মুখ লাল এস ডি বর্মনের। চেঁচিয়ে উঠে পঞ্চমকে বললেন, ‘আমি এই গান তরে শিখাইছি? মাঠের গান ভুলে, বাংলার গান ভুলে, তুই ইংরিজি গানের নকল কইরা সুর করস! আমার সব শিক্ষা বৃথা গেল। তুই আমার কুলাঙ্গার ছেলে।’ রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে কর্তা যখন মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলেন, সবার দেখে মনে হলো, রাজা যুদ্ধে হেরে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

রেকর্ডিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসে ক’দিন গুম হয়ে বাড়ি বসে রইলেন। তারপর শুরু করলেন ‘মিলি’ ছবির গান। সুর দিতে দিতেই paralytic attak হলো কর্তার। কোমায় আচ্ছন্ন বাবার মাথার কাছে বসে ‘মিলি’র গানে সুর দিচ্ছেন পঞ্চম। এই সময় কলকাতায় ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা চলছে। কর্তা আজন্ম ইস্টবেঙ্গল-এর সাপোর্টার। দল হারলে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতেন। কর্তার অসুস্থতার সময় ইস্টবেঙ্গল ৫-০ গোলে হারালো মোহনবাগানকে। পঞ্চম সেই খবর চেঁচিয়ে কর্তার সামনে বলতেই কোমায় আচ্ছন্ন এস ডি চোখ খুলেছিলেন একবারের জন্য! তারপর সেই যে চোখ বন্ধ করলেন, আর খোলেননি। চলে যাওয়ার দিনটি পর্যন্ত – ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫।

তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে
তবু আজও তাঁর সুরে পদ্মায়, গঙ্গায় ঢেউ ওঠে, নামে! শচীনদেব বর্মন। আজ তাঁর জন্মদিন।শুভ জন্মদিন কর্তা।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]