শুভ জন্মদিন শিল্পাচার্য

লুৎফুল কবির রনি

‘এখনতো চারদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ!
একটি সাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ!
এই দুর্ভিক্ষের কোনো ছবি হয়না।’
– শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ।

ছোট্ট জয়নুল আবেদীন স্টেটসম্যান পত্রিকার একটা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। বিষয়টা ছিলো একটা গলফ খেলার ছবি হুবুহু এঁকে পাঠাতে হবে। জয়নুল হুবুহু ছবিটা এঁকে ফেললেন। কিন্তু তার কাছে ছবিটা পাঠানোর জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছিলোনা। ভয়ে বাবাকেও কিছু বলতে পারলেননা তিনি। তাই মন খারাপ করে জয়নুল বইখাতার নীচে লুকিয়ে রাখলেন ছবিটা।

বাবা তমিজুদ্দিন সাহেব ছিলেন অনেক গোছালো মানুষ। অগোছালো ছেলের পড়ার টেবিল গোছানোর কাজ তিনিই করতেন। সেদিন সকালে বইগুলো গুছাতে গিয়ে কাভারের নীচে সুন্দরমতন একটা ছবি আর সঙ্গে স্টেটসম্যানের কপিটা পেয়ে গেলেন।

বুদ্ধিমান তমিজুদ্দিনের বুঝতে সময় লাগলো না। ছেলে ভয়ে তাঁকে বলতে পারছেনা! তিনি নিজেই ছেলেকে কিছু না বলে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন ছবিটা।

সেই ছবিটা প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পায়। পুরো ভারতে সেরা ছবি। সব জানতে পেরে ছোট্ট জয়নুল আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন। জড়িয়ে ধরেছিলেন মা-বাবাকে।

ছোট জয়নুলের শিল্পাচার্য হয়ে ওঠার হাতে খড়ি বোধয় সেখান থেকেই শুরু।

জয়নুল আবেদিন ছেলেবেলায় বাঁশ ও বেতের কাজ, নকশিকাঁথা, জামদানি শাড়ির নকশা, কুমারপাড়া ইত্যাদি দেখতে পছন্দ করতেন। এসব দেখে নিজে নিজেই ছবি আঁকতেন। তখনকার সময় ক্লাস নাইন-টেনে র‌্যাপিড বই ছিল। পড়াশোনার ফাঁকে র‌্যাপিড বইয়ের পাতার চারপাশে তিনি ছবি আঁকতেন।

স্কুলের পড়াশোনা তার ভালো লাগত না। ক্লাসে বসে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কখনো প্রকৃতি দেখতেন। একদিন জয়নুল আবেদিন নিবিষ্ট মনে বইতে ছবি আঁকছেন দেখে হেড মাস্টার তার বইটি চেয়ে নিলেন। তার বই এক নজর বুলিয়ে বললেন- ‘বইটি আমার কাছে থাকুক।’

এদিকে জয়নুল বেশ বিব্রত হলেন। ভয়ে স্কুল পালালেন। ক’দিন যেতেই হেড মাস্টার বাড়িতে খবর নিয়ে জানতে পারলেন- জয়নুল স্কুলের উদ্দেশে বের হয় এবং যথাসময়ে বাড়ি ফিরে আসে। পরে হেড মাস্টার নিজেই তাদের বাড়িতে এলেন। তার বাবাকে বললেন- ‘আপনার ছেলে তো স্কুলে যায় না। তার কি কোনো অসুখ করেছে?’

জয়নুলকে ডাকা হলো। তিনি শিক্ষকের সামনে এসে বললেন- ‘ভয়ে স্কুলে যাই না।’

‘কীসের ভয়?’

আবেদিন বললেন- ‘বইতে ছবি এঁকেছি এই ভয়ে।’

তখন হেড মাস্টার হো হো করে হাসলেন। তিনি বললেন- ‘তুমি ছবি এঁকে পালাচ্ছ, আর আমি ওই ছবি দেখে তোমাকে খুঁজছি। আমি তোমার বাবার সামনে বলে যাচ্ছি, তুমি চমৎকার ছবি আঁকো। তুমি যদি ছবি আঁকার জগতে যাও তাহলে খুব ভালো করবে।’

তখন জয়নুল আবেদিনের ভেতর একটি স্বপ্ন তৈরি হয়।

সাধনা মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অনেক দূরে। জন্ম-মৃত্যুর আড়ালে যেমন প্রতিনিয়ত ঢাকা পরে মানুষের অস্তিত্ব, তেমনি কিছু একনিষ্ঠতা, কিছু সাধনা, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর তীব্র স্পৃহা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে তার মৃত্যুর পরেও। তেমনই এক সাধকের নাম, শিল্পপ্রেমিকের নাম জয়নুল আবেদিন।

জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯শে ডিসেম্বর বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ এবং মা জয়নাবুন্নেছা। বাবা ছিলেন পুলিশের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর। তিনি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র।

১৯৫৩ সালে শিল্পী জয়নুল আবেদিন ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। স্পেনে এসে তিনি বেশ বিপদে পড়লেন কারণ স্প্যানিশ ভাষা তিনি জানতেন না, ইংরেজি জানা লোকও সেখানে কম ছিলো। তাই শিল্পী খাবার সময় রেস্তোরাঁয় ঢুকে তার স্কেচ খাতার সাদা কাগজে একপাশে একটি সিদ্ধ করার কড়াই এবং একটি ভাজি করার কড়াই আঁকলেন। তারপর একটি বড় গরু, পাশে গরুর পেছনের রান এঁকে তীর চিহ্ন দিয়ে সিদ্ধ করা কড়াইয়ের দিকে দেখালেন। অর্থাৎ, রানের মাংস রান্না খেতে চান।

একে একে মুরগির ডিম, কপি, আলু যা যা খাবার প্রয়োজন সব এঁকে ফেললেন। স্প্যানিশ ওয়েটারের আর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে শিল্পী কী খেতে চান। তারপর থেকে এভাবেই চলতে লাগলো ছবি এঁকে খাবার অর্ডার দেওয়ার তার এক নতুন পদ্ধতি ।

কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার শিশুদের সঙ্গে জন্মদিনে জয়নুল,১৯৭৬ সালে

জয়নুল আবেদিন এরপর বিদেশে পথ চলতে আর খুব একটা অসুবিধেয় পড়েননি। কারণ সঙ্গে থাকতো তার স্কেচ খাতা আর পেন্সিল। যে কোন ভাষাভাষীর সঙ্গে ছবি এঁকে ভাবের আদান-প্রদান করে নিতেন, ছবির ভাষা দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতেন।

ব্রহ্মপুত্র নদের প্লাবন অববাহিকার অত্যন্ত শান্ত, সুনিবিড় ও রোমান্টিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈশব এবং তারুণ্যের প্রধানতম অর্জন ছিল বলতে গেলে এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের অভিজ্ঞতা। তাঁর শৈল্পিক মানসিকতা নির্মাণে প্রকৃতির প্রভাব ছিলো অসামান্য ও সুদূরপ্রসারী। তিনি বলতে ভালোবাসতেন, “নদীই আমার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক”।

স্কুলের নিয়মিত উপস্থিতি আর পরীক্ষার ফলাফলই যদি ভালো ছাত্র হবার মাপকাঠি হয়, তবে জয়নুল আবেদিন খুব ভালো ছাত্র ছিলেন না। স্কুলে যাওয়ার চেয়ে তার বেশি আগ্রহ ছিলো আপন মনে ছবি আঁকাতে। স্কুলের সময় পেড়িয়ে যেত, আর জয়নুল তাঁর ঘরের বারান্দায় বসে আপন মনে এঁকে চলতেন ফুল, গাছ, পাখি, মানুষ, পশুপাখিসহ দৈনন্দিন পরিবেশের বিস্তর উপাদান। শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি ছিলো তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। কিশোর জয়নুল একবার স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতা শহরে, শুধুমাত্র ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস’র আয়োজন দেখার জন্য।

জয়নুল ভাবতেন, বন্ধুদের সঙ্গে বলতেন, শুধুমাত্র স্কুল-কলেজ পাশ না করলেও বড় মানুষ হওয়া যায়। শিল্পের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ অচিরেই তাঁকে টেনে আনে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার বলয় থেকে। মেট্রিক পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি তাঁর। পরিবারের সবার অমত সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজের শিল্পপ্রেমে আর মায়ের সহায়তায় চলে যান কলকাতায়। সেখানে ভর্তি হন আর্ট কলেজে।

জয়নুল আবেদিন ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতার আর্ট স্কুলে পড়ালেখা করেন এবং গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতার কলেজে পড়ার অর্থ যোগান দিতে জয়নুলের মায়ের সেদিন গলার হার পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। তিনি সবসময় তাঁর ছেলের পাশে থেকেছেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন গেছেন ময়মনসিংহে তাঁর গ্রামের বাড়ি বেড়াতে। গ্রামের এক মুরব্বি দেখা করতে এসে জয়নুল আবেদীনকে বললেন, “কিরে জয়নুল, তুই নাকি বড় শিল্পী হইছস? দে তো আমার ছাতিটায় নাম লেইখ্যা?” জয়নুল আবেদীন খুব যত্ন করে এবং সময় নিয়ে ছাতায় নাম লিখে দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এ ঘটনা রাষ্ট্র হয়ে গেল গ্রামময়। ব্যস,আর যায় কোথায়,গ্রামের প্রায় সবাই যার যার ছাতা নিয়ে হাজির। আর শিল্পাচার্য কি করবেন, অসীম ধৈর্যের সঙ্গে প্রায় সবার ছাতাতেই নাম লিখে দিয়েছিলেন সেবার।

জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম ছিল গণমুখী। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, জীবনের লড়াই, প্রতি পদে বাধা, সেই বাধা উপেক্ষা করে আবার জীবনের জন্য ছুটে চলা ইত্যাদি ছিলো তাঁর শিল্পকর্মের এক বিরাট অংশ জুড়ে। জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে মানুষের শ্রম, শ্রমের বিনিময়ে গড়ে ওঠা সভ্যতার চিত্র। স্থান পেয়েছে মানব জীবনের উত্থান এবং পতনের গল্প।
খাদ্যাভাবে মানুষের মৃত্যু নিসর্গপ্রেমী এই শিল্পীর মনকে নাড়া দিয়েছিল বিপুলভাবে। যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পাওয়া দুর্ভিক্ষ চিত্রকর্মটিতে। তাছাড়া মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্য উঠে এসেছে তাঁর শিল্পকর্মে। তিনি এঁকেছেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি, অস্ত্রহাতে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বিপ্লবী যোদ্ধার ছবি। একইভাবে লক্ষ-কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলার ছবিও জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাঁর তুলিতে। তাঁর এ চিত্রকর্মটি ‘১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা’ নামে প্রকাশিত। ‘নবান্ন’, ১৯৭৪-এ আঁকা ‘মনপুরা-৭০’, ১৯৫৭-এ ‘নৌকা’, ১৯৫৯-এ ‘সংগ্রাম’ তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম।

আমৃত্যু শিল্প সাধনায় নিমগ্ন এই শিল্পী শিল্পের বিকাশের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডে একটি কক্ষে ১৮ জন ছাত্র নিয়ে আর্ট কলেজ গড়ে ওঠে। যা পরবর্তীতে সেগুনবাগিচা এবং তারপরে শাহবাগে স্থানান্তরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জয়নুল আবেদিনের অনুপ্রেরণাতেই ১৯৭৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়।

শিল্পের জন্য শিল্প নয় বরং মানুষের জন্যই শিল্প – এমনই ছিল তাঁর শিল্প সংক্রান্ত দর্শন। যার ফলে তাঁর শিল্পে জীবনবোধ, জীবন সংগ্রামের ছবি ভেসে উঠেছে স্পষ্ট হয়ে। জয়নুল আবেদিনের শিল্প আপাদমস্তক মানুষের কথা বলে।

জয়নুল আবেদিন কথা বললেই দৃষ্টিপথে ভেসে ওঠে নদীর এক বাঁক, গুণটানা মাঝির চাঁদের মতো বাঁকা শরীর, ধানের সোনালি ঝিলিমিলি, টিয়ের ঝাঁক, ডুরে শাড়ি-পরা, ঘোমটা-টানা গ্রাম্য বধূ, হাঁটুতে মুখ গুঁজে থাকা কৃষক, ফুটপাতে পড়ে থাকা কঙ্কালসার মানব-মানবী, শিশু; আর দুর্ভিক্ষের মতোই কালো, ক্ষুধার্ত কাক। যিনি দেশের মাটি ও মানুষকে গভীর ভালোবেসেছেন, শুধু তাঁর মুখের রেখার করতলে কিংবা চোখের চাওয়ায় নিমিষে উদ্ভাসিত হতে পারে স্বদেশের আত্মা। কে না জানে, স্বদেশের প্রতি জয়নুলের ভালোবাসা ছিল কী অকৃত্রিম, কী অপরিসীম, সেই ভালোবাসাই তাঁকে দিয়ে আঁকিয়ে নিয়েছিল তেরশো পঞ্চাশের মন্বন্তরের স্কেচমালা, মনপুরা ৭০ নামক মৃত্যুগন্ধময় এক শিল্পিত স্ক্রল।

শুভ জন্মদিন শিল্পাচার্য, তোমাকে ছাড়া বাংলাদেশ ভাবা যায় না।