শুভ জন্মদিন সংগীতের ঈশ্বর মোজার্ট

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

উলফগ্যাং এমাদিউস মোজার্ট, জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত মিউজিশিয়ান এবং কম্পোজার। মোজার্ট মারা গিয়েছিলেন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, বলতে গেলে একেবারেই নিঃসঙ্গ, হতদরিদ্র অবস্থায়।

জগতজুড়ে জীবনে একবার না একবার সবাই যেই মোজার্টের নাম শুনেছে, সেই মোজার্টের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে হাজির ছিলেন মাত্র পাঁচ-সাতেক মানুষ। তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিলো বেশ কয়েকজন মৃত ব্যক্তির সঙ্গে একই কবরে কোন প্রকার নামফলক ছাড়াই!

মোজার্ট জীবনের প্রথম সিম্ফনী রচনা করেন মাত্র আট বছর বয়সে, যে বয়সে আমরা মিউজিক কি, সেটাই বুঝিনি।

মোজার্ট যখন সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে জার্মানী এসে প্রথম রোমান এম্পেররে যোগ দেন, তখন তাঁর সঙ্গীত প্রতিভায় সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন সেখানকার তৎকালীন প্রধান অপেরা কম্পোজার এন্তোনিও সালিয়েরী। তবে মোজার্টের প্রতিভায় সালিয়েরী যতোটা না মুগ্ধ হয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি হয়েছিলেন ঈর্ষান্বিত। খুব অল্পবয়সী একটি ছেলে এভাবে ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা নিয়ে সৃষ্টি করছিলো একের পর এক মহাকাব্যিক অপেরা- সালিয়েরীর সেটা সহ্য হয় নি।

সালিয়েরীর কূট-কৌশলের কারণে মোজার্ট কখনোই সম্রাটের সুনজরে আসতে পারেননি। শুরু হয় দৈন্যতার জীবন। মোজার্টকে না জানিয়ে মোজার্টের স্ত্রী সালিয়েরীর কাছে ভিক্ষা চেয়েছিলেন, তিনি যেন সম্রাটের কাছে মোজার্টের নতুন সৃষ্ট সিম্ফনী নিয়ে সুপারিশ করেন। সালিয়েরী রাজি হন, কিন্তু বিনিময়ে তিনি স্বয়ং মোজার্টের স্ত্রী’কে বলেছিলেন তাঁর অফিসে এসে তাঁর শয্যাসঙ্গী হতে।

নিরুপায় হয়ে মোজার্টের স্ত্রী রাজি পর্যন্ত হয়েছিলেন শুধুমাত্র ব্যাপারটা গোপন রাখার শর্তে। কিন্তু যে’ই মুহূর্তে মোজার্টের স্ত্রী কন্সটাঞ্জ নগ্ন হলেন, সালিয়েরী দরজার বাইরে থাকা গার্ডদের ভেতরে আসতে বলেন, যেন সবার কাছে তিনি মোজার্টের স্ত্রীকে চরিত্রহীনা প্রমাণ করতে পারেন। সফলও হয়েছিলেন সালিয়েরী। সেদিনের সেই মজলিশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়েছিলেন মোজার্টের স্ত্রী।

মোজার্ট অর্থাভাবে, ধারদেনায় জীবন চালিয়েছিলেন খুব কষ্ট করে। যে প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি, সে প্রতিভাই কাল হয়েছিলো মোজার্টের। শিকার হয়েছিলেন ঈর্ষার, মিথ্যার এবং ছলনার।

অসাধারণ সুন্দর ভিয়েনা শহর মোজার্টের একাকীত্বে, রোগে ভুগে মারা যাবার দিন কেউ কাঁদেনি, বৃষ্টি হয়েছিলো হয়তো খুব। ঈশ্বর বুঝেছিলেন। তাঁর পাঠানো অসাধারণ মানব সন্তানটির করুণ পরিণতিতে হয়তো প্রকৃতি কেঁদেছিলো।

মানুষ কাঁদেনি। মানুষ জীবদ্দশায় চেনেনি মোজার্টকে, তাঁর শিল্পকর্মকে। দুয়ার থেকে দুয়ার ধার খুঁজতে থাকা মোজার্টকে তারা  তাড়িয়ে দিয়েছে।

মোজার্টের মৃত্যুর রাতে ভিয়েনার রাস্তায় কেউ মন খারাপ করে মোজার্টের কোন সুর তুলেনি ভায়োলিনে। অথচ আজ ভিয়েনার তারা-জ্বলা রাত্রিতে মোজার্ট ছাড়া আর কোন রূপকথা নেই। যে মানুষটা মোজার্টের নামই শুনেনি কখনো, সে-ও নিজের অজান্তে মোজার্টের বেশ কয়েকটা সিম্ফনি শুনে ফেলেছে চলচ্চিত্রে, নানান কফি শপে কিংবা কোন প্রদর্শনীতে ছবি দেখতে দেখতে। মৃত্যুর এতো বছর পর এসেও ২০১৬ সালে সর্বাধিক বিক্রিত অ্যালবামের মালিক কোল্ড প্লে কিংবা বিয়ন্সে নয়… মোজার্ট।

অর্থনৈতিক সঙ্কটে থাকা অবস্থায় মোজার্ট একবার জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে গিয়েছিলেন চাকরির উদ্দেশে।একটি প্রেমপত্রটি তিনি স্ত্রীর উদ্দেশে লিখেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকা অবস্থায়। পত্রটি শুরু হয়েছিল এই ভাবে:

প্রেয়সী,

‘যদি শুধু আমি তোমার একটা চিঠি পেতাম, তাহলে শান্তি লাগতো……

আমি নিশ্চিত এখানে (ফ্রাঙ্কফুর্টে) আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবো, তবে তুমি যেরকম মনে করছো, ব্যাপারটা অতটা সহজ হবে না। আমাকে এখানে সবাই চেনে এবং সম্মান করে এটা সত্যি, কিন্তু তারপরও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। দেখা যাক কি হয়। একজনের সাথে একটা চুক্তি হওয়ার কথা চলছে। হলে কিছু টাকা অগ্রিম পাবো……… পরে কাজ শুরু করতে হবে।’

চিঠির শুরুতে আরও কিছু জাগতিক কথাবার্তা রয়েছে। এগুলো শেষ হওয়ার পরেই মোজার্ট আসল কথা বললেন। তার আসল কথা ঠিক একজন কবির কথার মত:

‘তোমার কথা যখনই আমার মনে হয় তখনই নিজেকে একটা বাচ্চা ছেলের মত আনন্দিত লাগে। কোনো মানুষ যদি তখন আমার মনের ভেতরটা দেখতে পেতো, তাহলে লজ্জার ব্যাপার হত। তোমাকে ছাড়া এখানে সবকিছুই ভয়ানক শীতল লাগে আমার- বরফের মত শীতল। মানুষ আমাকে জানে এবং মানে, কিন্তু এসব আমার গায়ে লাগে না। শুধু যদি তুমি আমার সাথে থাকতে তাহলে আমার আর কিছু লাগতো না। এখন সব ফাঁকা- পুরোপুরি শুন্য আমি। প্রিয়তমা, আমার আত্মা তোমার। আমি তোমার চিরকালের মোজার্ট।’

চিঠি এখানেই শেষ না। শেষটুকু আরও সুন্দর:

‘পরসমাচার – চিঠির শেষটুকু লিখতে গিয়ে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। চোখের পানি চিঠির উপরেও পড়েছে। কিন্তু আমি কাঁদবো না। কারণ কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি- তুমি আমার গালে চুমো খাচ্ছো। সেই চুমো উড়ে আসছে আমার দিকে………… শত শত চুমো। আমি এখন এদের ধরবো………মাত্র তিনটা ধরেছি…… হা হা হা। আরও আসছে……’।

শুভ জন্মদিন সংগীতের ঈশ্বর

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]