শুভ জন্মদিন সলিল চৌধূরী

আলী আসগর স্বপন

আলী আসগর স্বপন

বিখ্যাত সুরকার সালিল চৌধুরীর জন্মদিন আজ ১৯ নবেম্বর।
সলিল চৌধুরী তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ সুরকার।তাঁর জন্ম ১৯ নভেম্বর ১৯২২। আসামের এক চা বাগানে । বাবা ওখানকারই চিকিৎসক ছিলেন। বাবা মানুষটি ছিল একেবারে অন্য ধাতের।
যাকে বলে মাটির মানুষ। রবীন্দ্রনাথের সময়ে বেঁচেছিলেন তো। তাই। বাগানের কুলি কামিনদের নিয়ে নাটক করতেন। আর প্রচন্ড রকমের ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন। চা-শ্রমিকদের নিয়ে ছিলেন ভারি উদ্বিগ্ন । বালক সলিল খুব কাছে থেকেই বাবাকে দেখেছিল। জীবনের পরবর্তী ধাপগুলি তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। বাবার সংগ্রহে ম্যালা পশ্চিমা সংগীতের অ্যালবাম ছিল।গানের বীজটি ওই সময়েই রোপিত হয়েছিল। মানে শৈশবে। কিশোর বয়স পেরিয়ে কোলকাতার পড়তে এলেন। বঙ্গবাসী কলেজে । বাবা ডাক্তার। গান করি আর যাই করি- অন্তত বিএ পাশটাতো করতে হবে।গানের পাশাপাশি বাম রাজনৈতির ব্যাপারটাও তখনই যুক্ত হল।তখন ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। খুব কাছে থেকে দুর্ভিক্ষের করুন বিভৎরুপ দেখলেন সলিল। দেখলেন চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘুর্ণি। এসবই গানের কথায় আঁচড় কাটল। আর কাটবে না কেন? শৈশব থেকেই বাবার প্রেরণায় সামাজিক দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন এক মানুষ সলিল। এ সময়ই ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েসান যোগ দিলেন সলিল। নাম লেখালেন ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টিতেও । ওই সময়ে অনেক প্রতিবাদী গান কম্পোজ করলেন সলিল।
থিয়েটার নিয়ে গেলেন গ্রামবাংলার তৃণমূল মানুষের কাছে । সলিলের প্রতিবাদী গানে মানুষ উদ্বেলিত হত।
ধিতাং ধিতাং বোলে
এ মাদলে তাল তুলে
আয় ছুটে সকলে …
আয়রে আয় লগন বয়ে যায়
মেঘ গুর গুর করে চাঁদের সীমানায় …
সলিল গনসঙ্গীতকে বলতেন, “জাগরনের গান”, “চেতনার গান”।
আলী আসগর স্বপন44আসলে সামাজিক বৈষম্য কিছুতেই সইতে পারতেন না মহৎ হৃদয়ের ওই মানুষটি। তাঁর ছিল সাম্যবাদী শিক্ষা। এ ক্ষেত্রে বাবা ছিল পথপ্রদর্শক। সঙ্গীতেও। সলিলের বিরল সৌভাগ্য যে হাতেখড়ি ঘরেই হয়েছিল শৈশবে। অন্যত্র যেতে হয়নি। সেই স্বাধীনতা পূর্ব সময়টায় ওই গানগুলি কি ভাবে যে স্বাধীনতাকামী মানুষকে উদবেলিত করেছিল প্রেরণা যুগিয়েছিল, সেই সঙ্গে মানুষকে দিয়েছিল সুরের সমুদ্রের অবগাহনের অপার আনন্দ। গানগুলো আজও গাওয়া হয় দু বাংলায়। এই একুশ শতকেও। বাঙালি এখানেই ব্যতিক্রম। সে তার স্বপ্ন দেখা ছাড়তে পারে না। সময় পেলে আজও জাপানের কোনও শহরে শহীদ মিনার স্থাপন করে সে।
বাঙালি এখানেই ব্যতিক্রম। বাঙালি আর কারও মত না। ১৯৪৭। ভারত স্বাধীন হল। গনসঙ্গীতের জোয়ার খানিক স্তিমিত হয়ে এল। কী করা যায়। বসে তো থাকা যায় না। এবার রোমানটিক বাংলা গান কম্পোজ করতে লাগলেন সলিল।
রাতারাতি বাংলা গান বদলে গেল।
কী কথায় কী সুরে … রাতারাতি বাংলা গান বদলে গেল। আসামের চাবাগানে বড় হওয়া এক সুরকার রাতারাতি বাংলা গান বদলে দিলেন। না, মন লাগে না
এ জীবনে কিছু যেন ভালো লাগে না।
লতাজির গাওয়া এই গানটি আরেকবার শুনে দেখুন তো! ভালো” শব্দটি সলিলের নির্দেশে কী ভাবে উচ্চারণ করেছেন লতাজি। শুনুন আরেকবার।
আর কবিতা?
এ নদীর দুই কিনারে দুই তীর কাছে যেতে তাই পারিনি
তুমিও …তুমিও ওপার থেকে যাও চলে যাও। না, মন লাগে না
গানটি আবার শুনে দেখবেন “তুমিও ওপার থেকে যাও চলে যাও” বলার সময় কী ভাবে ক্লান্তি ঝরে ঝরে পড়ছে লতাজির কন্ঠ থেকে। কল্পনা করি, কোলকাতার স্টুডিওতে বসে সলিল চৌধুরী বলছেন, দিদি এভাবে না, কন্ঠস্বরে আরও ক্লান্তি আনুন …তুমিও ওপার থেকে যাও চলে যাও। এক নারীর জীবনের সব দুঃখ এই চরণে … তুমিও ওপার থেকে যাও চলে যাও। এই হল সলিল। আমাদের প্রাণপ্রিয় সলিল চৌধুরি। ঈশ্বরের কাছে থেকে যিনি পেয়েছিলেন গান বাধার অলীক এক প্রতিভা। তাতেই বাঙালিকে আজও মুগ্ধ করে রাখছেন। আজও বাজে,“ও মোর ময়না গো …” নতুন জেনারেশন জানে হাবিবের গান। জুলির গান। ভিডিয়োতে মিথিলা মডেল। সলিলের জীবনে স্পস্ট দু পর্ব।মধ্য-পঞ্চাশ এর পর ভারত কাঁপাতে বোম্বাই যেতে আগ্রহী হলেন সলিল।
তারপরই খুলে গেল আরেক সুরের দুয়ার। সর্বভারত দেখল বাঙালির প্রতিভা।আলী আসগর স্বপন777
আগেই অবশ্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে আলাউদ্দীন খাঁ, রবীশঙ্কর প্রমূখের বাদনে মুগ্ধ হয়েছিল। এবার দেখল এক বাঙালি সুরকারের ফিল্মি গানের চমক। বোম্বের জীবনে প্রথম প্রথম মনে হয় খানিকটা স্ট্রাগল ছিল সলিলের। বাঙালি বিদ্বেষ রাহুল দেব বর্মনের জীবনকে কী ভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল সেসব কথা আমরা অনেকেই জানি। যাক। সেসব অবশ্য আরও পরের কথা। বোম্বে যাওয়ার পর সলিল শুনলেন এক প্রডিউসার নতুন ছবিতে হাত দেবেন। সলিল কাজ চাইলেন। প্রডিউসার আমতা আমতা করলেন। দুজনে নাকি সন্ধের পর সাদা রঙের অ্যাম্বাসেডর গাড়ির ভিতরে বসেছিলেন। তখন বর্ষাকাল। ঝরঝর বৃষ্টি। গাড়ির জানালার কাচে বৃষ্টি। সলিল কৌতুক করে বললেন, আমি তো আপনার ছবি হিট করাব বলে আগেভাগেই সুর তৈরি করে রেখেছি। প্রডিউসার অবাক হয়ে বললেন, বলেন কী। সুর তৈরি করে রেখেছেন! আচ্ছা, ভাইয়া শোনন তো।
সলিল সুর ভাঁজলেন। প্রডিউসার কেঁপে উঠলেন। অভিভূত। সলিলের হাত ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললেন, প্লিজ ভাইয়া গানটা আর কাউকে দিয়েন না … সলিল হেসে বললেন, আরে, আপনার গান অন্যকে দেব কেন?
কোন্ গানটা? লতাজির গাওয়া ….না যেও না রজনী এখনও বাকি … আপনাদের কি গানটার অন্তরার কথাগুলি মনে আছে?
আমি যে তোমারই শুধু জীবনে মরণে …
আহ সুরাটা! সুরের পরতে পরতে একেবারে মৌলিক সলিল …একেবারে মৌলিক সলিল আমাদের সলিল। বাংলার মাটি সুরেও যে …এসব কথা লিখলে চোখ
এবার সলিলের বিশাল কর্মযজ্ঞের।
সলিলের জীবনাবসান সেপ্টেম্বর ৫। ১৯৯৫। মৃত্যু। ৭৫তম জন্মবার্ষিকীর ঠিক আগে।