শুভ জন্মদিন সুবীর নন্দী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

সুবীর নন্দীর নিয়মানুবর্তিতা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সহনশীলতার কথা তুলে ধরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গৌতম রয়। তিনি লিখেছেন, ডাক্তারের সহকারী সিরিয়াল আসার আগেই খাতির করে তাকে ভেতরে যেতে বললেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে না করে দিলেন। অপেক্ষারত রোগীরাও বললেন তিনি আগে গেলে তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তিনি আবারও বিনয়ের সঙ্গে বললেন, তার অসুখ ইমার্জেন্সি নয়, তিনি অপেক্ষা করতে পারবেন। নিজের সিরিয়াল যখন এলো, তখনই তিনি ডাক্তারের কক্ষে গেলেন। ততোক্ষণে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে…আমি শুধু দেখেছি তার ভদ্রতা ও বিনয়।

 সুবীর নন্দী জন্মেছিলেন ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দীপাড়ায়। তার বাবা ডাক্তার সুধাংশু নন্দী ছিলেন সংগীতপ্রেমী আর মা পুতুল রানীও বাড়িতে ঘরোয়াভাবে গান গাইতেন। তাই ছোটবেলা থেকেই সুবীর নন্দী পারিবারিকভাবেই গানবাজনার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। বাবার চাকরি সূত্রে নন্দীর শৈশব কেটেছে চা বাগান এলাকাতে। পড়েছেন সেই চা-বাগান এলাকারই খ্রিষ্টান মিশনারীর একটা স্কুলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করার পর পড়াশোনার জন্য চলে যান হবিগঞ্জ শহরে। সেখানে ভর্তি হন হবিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুলে, তারপর পড়েছেন হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজে।

 সংগীত যে একটা গভীর সাধনার ব্যাপার সেটা সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীদের দেখলে বোঝা যায়। গানের পাশাপাশি তিনি ব্যাংকেও চাকরী করতেন, কিন্তু গানের সাধনায় তিনি কখনো কমতি রাখননি। প্রথমদিকে গান করার সময় জর্দা দিয়ে অনবরত পান খাওয়ার অভ্যাসের কারণে কিছু শব্দের উচ্চারণ নিয়ে সমস্যায় পড়তেন। একদিন প্রখ্যাত সুরকার সত্য সাহার সামনে বসে তিনি গান গাইছিলেন। কিন্তু একটা শব্দের উচ্চারণ ঠিকঠাক কোনোভাবেই হচ্ছিল না। সত্য সাহা তাকে বললেন, “হবে কীভাবে? সারা দিন মুখে পান দিয়ে রাখলে উচ্চারণ বের হবে?” তারপর থেকে নাকি আর কখনো তার মুখে পান দেখা যায়নি।

সুবীর নন্দী আধুনিক বাংলা গানের এক কিংবদন্তী শিল্পী, সুরের রাজকুমার। দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে তিনি গেয়েছেন প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি গান। আধুনিক বাংলা গানের জাগরণ পর্ব বলা হয় গত শতকের ষাটের দশককে। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমাদের দেশে ছিল ভারতীয় বাংলা আধুনিক গানের শিল্পীদের বিস্তর প্রভাব। ঠিক সেই সময়ে আবির্ভাব ঘটে সুবীর নন্দীর মতো কয়েকজন গুণী শিল্পীর যারা যাবতীয় প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের সংগীত প্রতিভা ও সাধনাকে কাজে লাগিয়ে সূচনা করেছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের নতুন এক অধ্যায়ের।

‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি ,আমায় আর কান্নার ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই ‘ – জীবন বোধের মূল সুর স্পর্শকরা এই শাশ্বত গানের শিল্পী সুবীর নন্দী ।বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাস রচনা করা হলে যার নাম অনিবার্য তিনি সুবীর নন্দী ।প্রায় পাঁচ দশকের বেশী সময় বাংলা গানের জগতে দীপ্তি ছড়িয়েছেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত ।

চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে অবদানের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সুবীর নন্দী। মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) ও মহুয়া সুন্দরী (২০১৫) চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে পাঁচবার এই পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও সঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

সুবীর নন্দীর জনপ্রিয় কিছু গান হলো ও আমার উড়াল পঙ্খী রে, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই, দিন যায় কথা থাকে, ও মাস্টার সাব, পাখি রে তুই দূরে থাকলে, আমার এই দুটি চোখ, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, তুমি এমনই জাল পেতেছ সংসারে, একটা ছিল সোনার কন্যা, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, আয়নাতে ওই মুখ, কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়, পাহারের কান্না দেখে, প্রেমের নাম বেদনা, তোমারি পরশে জীবন, তুমি যে আমার কবিতা, বন্ধু তোর বরাত নিয়া, হাবলঙ্গের বাজারে, আমি পথে পথে ঘুরি, নীড় ছোট ক্ষতি নেই, দিন যায় কথা থাকে, বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে, চাঁদে কলঙ্ক আছে, গানেরই খাতায়, আমি সাত সাগর।

সুবীর নন্দী সে ধরনের শিল্পী, যাঁর লেখা গান হোক, হোক যে নায়কের অভিনয়, গলা শুনলেই মনে হবেই যে, ওই যে সুবীর নন্দী গাইছেন, কণ্ঠ ভরা বিষাদের মেঘ উগরাচ্ছেন, আর আমাদের মনে এই নিরাক পড়া দুপুরে বিনা মেঘেই গায়েবি সুরমেঘ থেকে অদৃশ্য বৃষ্টি ঝরছে।

তাঁর গানের ভাষা কোন নির্দিষ্ট শ্রেণিতে আটকে ছিল না । প্রায় সব মানুষের মনের কথাগুলি তিনি তাঁর অনন্য সংগীত দক্ষতায় রুপ দিতেন । যেমন প্রেম, অসংখ্য প্রেমের গানগুলির কথা সবার অনুভুতিকে ধারণ করার ক্ষমতা রেখেছে । প্রেমহীন মানুষ কি আছে কোথাও ? নেই, সেই প্রেমের গানে তিনি সবাইকে একই কাতারে নিয়ে এসেছেন । সিনেমার মধ্য দিয়ে তিনি যেমন পৌঁছে গেছেন আপামর জনগণের কাছে, আবার আধুনিক নাগরিক গানের মধ্য দিয়ে তিনি বিশাল মধ্যবিত্তের মন জয় করেছেন । সংগীত বিশেষজ্ঞদের কাছে তিনি গৃহীত ছিলেন কারণ তাঁর গান ছিল একজন শিক্ষিত শিল্পীর গান । তিনি ভারতীয় মার্গ সংগীত রপ্ত করেছিলেন এবং এর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন তাঁর সব গানে । তিনি যখন লোক সংগীতের সুরে গান করছেন তখনো মার্গ সংগীতের উপাদান অসাধারণ দক্ষতায় ব্যবহার করছেন । তাঁর গান ছিল সারল্যের প্রতিমা কিন্তু জটিল উপাদানে ভরপুর । এই মিশ্রণ তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে যা সব মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে সাহায্য করেছে । তাঁর কণ্ঠস্বর সুক্ষ কারুকাজে ভরা ছিল । শ্রুতিনন্দন ছিল তাঁর কণ্ঠ, যখনি কানে আসে, একটা সুখকর আনন্দে ভরে ওঠে ইন্দ্রিয় । তাঁর গান বাঙলা গানের জগতে এক অমুল্য রত্নরাজি । দীর্ঘ, দীর্ঘদিন আলো ছড়াতে থাকবে তাঁর গান । তিনি সত্যিকারের একজন কিংবদন্তী, একজন কালজয়ী শিল্পী।

সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবীর উপস্থাপনায় একটি অনুষ্ঠানে সুবীর নন্দী জানিয়েছিলেন তার শেষ ইচ্ছের কথা- “আমার শেষ ইচ্ছা, আমার মৃত্যুর পর কেউ যেন না কাঁদে, আমি চাই আমার শবদেহের পাশে সবাই যেন আমাকে গান শোনায়।” এমন মহাত্মা, এমন অনুভব এই মহাপ্রাণ ছাড়া কারই বা ছিল! শুভ জন্মদিন আমাদের আবেগের, কান্নার আশ্রয় সুবীর নন্দী।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]