শুভ জন্মদিন সেলিনা পারভীন

লুৎফুল কবির রনি

মেয়েটির স্তনের একটি অংশ কাটা ছিলো, লালচে দগদগে জমানো রক্তে সারা শরীর ভেজা। মাটির ঢিবির পাদদেশে মেয়েটির চোখ বাঁধা ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়ে ছিলো। মেয়েটির মুখ ও নাকের কোন আকৃতি নেই, নরপিশাচেরা অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছিলো ।

সেলিনা পারভীন

মেয়েটি হলো সাংবাদিক সেলিনা পারভীন।

‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলীতে দাঁড়িয়ে
আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের
যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে
একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ’
—শামসুর রাহমান

১৯৭১ জাতিকে মেধাশূণ্য করতেই রাজাকার আল-বদর বাহিনী পাক-হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনকে ছিলেন স্বাধীনচেতা এক নারী। পাকিস্তান আমলের একজন নির্ভিক কলম সৈনিক । যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাংবাদিকতা করেছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশেই আজ কলম চালানো যে কত কঠিন তা চোখে মেললেই দেখতে পাওয়া যায়,তাহলে ভাবতে পারেন কি পরাধীন বাংলার মাটিতে কলম চালানো কতটা কঠিন ছিলো।কিন্তু তারপরো কলম চলেছিলো অনেকের,তাদের মাঝে একটি কলম চলে ছিলো সেলিনা পারভীনের হাত ধরে পরাধীনতার বৃত্ত থেকে স্বাধীনতার আলোর আশা বুকে নিয়ে।

ছেলে সুমনের সঙ্গে

১৯৬৯ সালে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৬৯ বের করেন শিলালিপি নামে একটি পত্রিকা ৷ নিজেই এটির সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। শিলালিপি ছিলো সেলিনার নিজের সন্তানের মত ৷ দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত শিলালিপি সকলেরই নজর কাড়লো ৷

শিলালিপির বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়েই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন৷ শিলালিপির উপরও নেমে আসে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর খড়্গ৷ হাসেম খানের প্রচ্ছদ করা একটি শিলালিপির প্রকাশিতব্য সংখ্যা নিষিদ্ধ করে দেয় পাকিস্তান সরকার৷

শর্ত সাপেক্ষে আবার শিলালিপি প্রকাশের অনুমতি দেয় পাকিস্তান সরকার। ৭১ সালের আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে তাঁর সম্পাদনায় বের হয় শিলালিপির শেষ সংখ্যা। কিন্তু এর আগের সংখ্যাই স্বাধীনতার স্বপক্ষের বুদ্ধিজীবীদের লেখা দিয়ে বের করায় আবার পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পরেন সেলিনা পারভীন।

শহরে তখন কারফিউ। ডিসেম্বর সকালবেলা ১১৫ নং নিউ সার্কুলার রোডে তার বাড়ীতে থাকতো তিনজন মানুষ- পুত্র সুমন, মা আর তার ভাই জনাব উজির৷ সেদিন শীতের সকালে তারা সকলেই ছিলেন ছাদে। সেলিনা পারভীন সুমনের গায়ে তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন।তারপর সুমন যখন ছাদে খেলাধুলা করছিলো তখন সেলিনা পারভীন একটা চেয়ার টেনে একটি লেখা লিখছিলেন।

সেই বাসার প্রধান গেইট ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেলো কিছু লোক তাদের সবাই একই রঙের পোশাক পরা ও মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা সুমনদের ফ্ল্যাটে এসে একসময় কড়া নাড়ে তারা৷ সেলিনা পারভীন নিজে দরজা খুলে দেন।

তরুনী সেলিনা পারভীন

লোকগুলো তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং এ সময় শহীদ সেলিনা পারভীনের সঙ্গে লোকগুলোর বেশ কিছু কথা হয়। তিনি বলেন, ‘বাইরে তো কারফিউ, আমি কাপড় বদলে নেই।’ তারা বলে, আমার সঙ্গে গাড়ি ও পাশ আছে। সুমন যেতে চাইলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দুতে বলে, বার্চা লোক নেহি যায়েঙ্গা- আন্দারমে যাও। শহীদ সেলিনা পারভীন তাঁর ছেলেকে বলে, ‘ সুমন তুমি মামার সঙ্গে খেয়ে নিও, আমি যাব-আর আসবো।’ এটাই তাঁর সঙ্গে জীবনের শেষ কথা (মা-ছেলের)। তাঁরই কোমরের গামছা দিয়ে চোখ ও হাত পিছমোড়া করে বেধে এরপর তারা শহীদ সেলিনা পারভীনকে তাদের সঙ্গে ধরে নিয়ে যায়।

 ছোট্ট সেই সুমনের লাশও পাওয়া গেছে এই তো সেদিন রেললাইনের ধারে।

১৮ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনের গুলিতে-বেয়নেটে ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। খুব শীতকাতুড়ে সেলিনার পায়ে তখনও পড়া ছিল সাদা মোজা । এটি দেখেই তাঁকে সনাক্ত করা হয় । ১৪ ডিসেম্বর আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো পাকিস্তানের দালাল আলবদর বাহিনীর ঘৃণিত নরপশুরা সেখানেই শহীদ সেলিনা পারভীনকে হত্যা করে। তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা হয়।

কোমরে গোঁজা সেই গামছায় চোখ মুখ বাঁধা, সেই সাদা শাড়িতে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে স্বয়ং তিনি পড়েছিলেন নিষ্প্রাণ দেহে, স্বাধীনতার শিলালিপি হয়ে।

আজ অকুতোভয় স্বাধীনতার জন্য সব বিসর্জন দেয়া এই মানুষটির জন্মদিন।

ছবি: গুগল