শুভ জন্মদিন সৈয়দ মুজতবা আলী

লুৎফুল কবির রনি

উর্দু চাপিয়ে দিলে পূর্ব পাকিস্তান (এখন বাংলাদেশ) পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাবে, এ কথা ভাষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের মাথায় ছিল না, ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর, যিনি পাকিস্তানের জন্মের ১০৫ দিন পরে এই সতর্কবাণী করেন। আলী সাহেব ৩০ নভেম্বর ১৯৪৭ সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদে বলেন ‘যদি উর্দুকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে এর ভবিষ্যৎ কখনই ভালো হবে না। বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে একদিন আমাদের জনগণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।একদিন বিদ্রোহ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’’

সেই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রতিপন্ন হয়।

গীতা তার সম্পূর্ণ মুখস্ত ছিল। এমনকী রবীন্দ্রনাথের গীতিবিতানও টপ টু বটম ঠোটস্ত ছিল। একবার এক অনুষ্ঠানে এক হিন্দু পুরোহিত গীতা সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সভায় সৈয়দ মুজতবা আলী উপস্থিত ছিলেন। দূর্ভাগ্যক্রমে সেই পুরোহিত যে সব রেফারেন্স গীতা থেকে সংস্কৃত ভাষায় দিচ্ছিলেন তাতে কিছু ভুল ছিলো। সৈয়দ মুজতবা আলী অবশেষে দাঁড়িয়ে উনার সমস্ত রেফারেন্স মূল সংস্কৃত ভাষায় কি হবে তা সম্পূর্ণ মুখস্থ বলে গেলেন। সমস্ত সভার দর্শক বিস্ময়ে হতবাক।

‘বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না’
‘আমার চাকরের নাম কাট্টু, কেননা সে পকেট কাটে, মাছের মাথা কাটে, আর প্রয়োজন হলে মনিবের মাথা কাটে’
‘যে ডাক্তার যত বড় তার হাতের লেখা তত খারাপ’ কিংবা ‘ওষুধ খেলে সর্দি সারে সাত দিনে না খেলে এক সপ্তায়’

এই কথাগুলোর মালিক আর কেউ নন, তিনি আমাদের রম্যসাহিত্যের দিকপাল সৈয়দ মুজতবা আলী। তার লেখার বাচনিক তৎপরতা পাঠককে এক আলাদাভাবের জগতে নিয়ে যায়। তিনি তার লেখায় শুধু হাসান না, মানুষকে ভাবান। গদ্যের সত্যিই তিনি এক দারুণ ওঝা। কীভাবে খেলতে হয় গদ্য নিয়ে, তা তিনি দেখিয়েছেন তুমুল মুন্সিয়ানায়। এটা একমাত্র সম্ভব হয়েছে বিপুল জ্ঞানরাশির কারণে।

তিনি তার গদ্যে যে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তা অনায়াসে সাধ্য নয়। শিল্প বা সাহিত্যের ইতিহাস মূলত তার আঙ্গিকগত নিরীক্ষারই ইতিহাস। এ সত্য কথা যথার্থ আলাদাভাবে প্রতিপন্ন করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এ কারণে সমালোচকরা বলতে বাধ্য হয়েছেন, বাংলা গদ্যের প্যাটার্ন তছনছ করে দিয়েছেন তিনি। সত্যি বলতে কি বাংলা ভাষার সব প্রচলিত বাক্য বিন্যাসকে তছনছ করে, যে অনবদ্য সাহিত্য সম্ভার সৃষ্টি করেছেন মুজতবা আলী, তার তুলনা আজও অমলিন।

লাট সাহেবের ৩ ঠ্যাং ওয়ালা কুত্তার পিছনে মাসে খরচ ৭৫ টাকা এবং ৮ সদস্য বিশিষ্ঠ বাংলার ব্রাক্ষ্মন পন্ডিতের বেতন ২৫ টাকা হলে, পন্ডিতের সমস্ত পরিবার লাট সাহেবের কুকুরের কটা ঠ্যাং এর সমান ?

পাদটীকা, চাচা কাহিনী

পড়ে চোখ জলে ভরে যেত। পরক্ষণে
যেদিন গিন্নী আমাকে বললেন, আমার ড্রিংক করা দেখে নাকি ছেলেরা এসব শিখবে, আমি তখন তাঁকে বললাম, কেনো আমি যে বাইশটা ভাষা জানি সেখান থেকে দু’চারটা ভাষা ওরা শিখুক না??

হাসতেই হয় ।

সৈয়দ মুজতবা আলী তখন বেশ বিখ্যাত লেখক। প্রতিদিনই তাঁর দর্শন লাভ করতে ভক্তরা বাসায় এসে হাজির হয়। একদিন এক ভক্ত মুজতবা আলীর কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কোন বই কী অবস্থায় লিখেছেন। মুজতবা আলী যতই এড়িয়ে যেতে চান, ততই তিনি নাছোড়বান্দা।

শেষে মুজতবা আলী সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘দেখো, সুইস মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল গুসতাফ জাং একদা তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, কিছু লোক আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কীভাবে লিখি।

এ ব্যাপারে আমাকে একটা কথা বলতেই হয়, কেউ চাইলে তাকে আমরা আমাদের সন্তানগুলো দেখাতে পারি, কিন্তু সন্তানগুলো উৎপাদনের পদ্ধতি দেখাতে পারি না।’

বিশ্বভারতীতে পড়াশুনা করার সময় একবার রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা নকল করে ভুয়া নোটিশ দিলেন, “আজ ক্লাশ ছুটি” .. ব্যাস যায় কোথায় সবাই মনে করল রবীন্দ্রনাথ ছুটি দিয়ে দিয়েছেন ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন ‘লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর চেয়েও মানুষ সৈয়দ মুজতবা আলী কম বিস্ময়কর ছিলেন না। যাঁরা দীর্ঘকাল ধরে তাঁর অন্তরঙ্গ ছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই পরে সে সম্পর্কে লিখছেন। অত্যন্ত চঞ্চল এই মানুষটিকে কিছুতেই সাধারণ সংসারী মানুষদের মাপে আঁটানো যায় না।

প্রতিভা জিনিসটা খুব সুখের নয়; বরং এর জ্বালা আছে, এই জ্বালাতেই ইনি সারা জীবন ছটফট করেছেন।’

জীবনের গভীরতর ভেতর থেকে জীবনকে পর্যবেক্ষণের অন্তর্দৃষ্টি মুজতবার ছিলো বলেই তাঁর পরিবেশিত হাস্যরসের মধ্যে পরিমিত জীবনমবোধ ছিলো।

বাঙালির বই কেনার প্রতি বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে… মরার ভয়ে বই কেনা, বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে।

-সৈয়দ মুজতবা আলী

বাঙালির দৈনতাকে যেমন জানতেন তেমনি বাঙালির সত্যিকার রসবোধ কি তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও রম্যরচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।