শুভ জন্মদিন হাজার চুরাশির মা

লুৎফুল কবির রনি

“কিন্তু ক’দিনে বিরসাও বুঝল রোজ ভরপেট খেতে পাওয়া, গায়ে-মাথায় তেল মাখতে পাওয়া, কাপড়-গামছা আস্ত আস্ত পরতে পাওয়া – এর একটা অন্য সুখ আছে।

সে সুখ মানুষকে ভীতু আর কমজোরি করে দেয়।
এ ভারী মজা।

স্বামী ও পুত্রের সঙ্গে

খেতে-পরতে, মাখতে পেলে মানুষ জোনী মাসির মতো কমজোরি আর ভীতু হয়ে যায়।

তখন মনে হয়, আই আবা! চড়া কথা বলব না, যদি এ সুখটুকু ঘুচে যায়?”

_অরণ্যের অধিকার, মহাশ্বেতা দেবী।

মহাশ্বেতা দেবীর লেখার টেবিল কখনও বদলায়নি। বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে জ্যোতির্ময় বসুর বাড়িতে লোহার ঘোরানো সিঁড়িওয়ালা ছাদের ঘর, গল্ফ গ্রিন বা রাজডাঙা যেখানেই থাকুন না কেন, টেবিলটি সর্বদা অগোছালো। গাদাগুচ্ছের খাম, আবেদনপত্র, সরকারি লেফাফা, সম্পাদিত ‘বর্তিকা’ পত্রিকার প্রুফ-কপি ছড়িয়েছিটিয়ে। এক পাশে কোনও ক্রমে তাঁর নিজস্ব রাইটিং প্যাড ও কলমের সকুণ্ঠ উপস্থিতি। সাদা বড় সেই চৌকো প্যাডে ডট পেনে গোটা গোটা অক্ষরে লেখাই তাঁর অভ্যাস।

কোনও কাজে কলকাতায় এসে এক শবর যুবক আস্তানা নিয়েছেন মহাশ্বেতার বাড়িতে। স্নান সেরে বেরিয়ে তাকের উপরে রাখা মহাশ্বেতার চিরুনি দিয়েই ঘসঘস করে চুল আঁচড়ালেন। জাতপাতহীন, শ্রেণিহীন, শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন এ শহরে অনেক বামপন্থীই দেখে থাকেন। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত তেল-সাবান চিরুনি অন্যকে ক’জন অক্লেশে ব্যবহার করতে দিতে পারেন? কী ভাবে এলো এই অনায়াস আপনাত্তি? ২০০১ সালে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে বলেছিলেন মহাশ্বেতা, ‘যখন শবরদের কাছে গেলাম, আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল। আদিবাসীদের নিয়ে যা কিছু লিখেছি, ওদের মধ্যেই তা খুঁজে পেলাম।’

আন্তর্জাতিক মননের সঙ্গে মহাশ্বেতার পরিচয় অবশ্য জন্ম থেকেই। বাবা: কল্লোল যুগের বিখ্যাত লেখক যুবনাশ্ব বা মণীশ ঘটক। কাকা: ঋত্বিক ঘটক। বড়মামা: অর্থনীতিবিদ, ‘ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা শচীন চৌধুরী। মায়ের মামাতো ভাই: কবি অমিয় চক্রবর্তী। ক্লাস ফাইভ থেকে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বাংলার ক্লাস নেন, নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া যায়। সময়টাও নজর কাড়ার মতো। ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের পাবনা (অধুনা রাজশাহি) জেলার নতুন ভারেঙ্গা গ্রামে মহাশ্বেতার জন্ম।

সাহিত্যযাত্রার এই মোড়ে একদিনে এসে দাঁড়াননি মহাশ্বেতা। তার পিছনে ছিল দীর্ঘ পরিক্রমা। ’৪৬-এ বিশ্বভারতী থেকে ইংরেজির স্নাতক। এমএ পাশ করে বিজয়গড়ে জ্যোতিষ রায় কলেজে পড়ানো। তার আগে ১৯৩৯ সাল থেকেই ‘রংমশাল’ কাগজে ছোটদের জন্য লেখালেখি শুরু। স্বাধীনতার বছরে ‘নবান্নে’র রূপকার বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিয়ে। সে সময়টা কখনও সংসার চালাচ্ছেন টিউশনি করে, কখনও সাবানগুঁড়ো বিক্রি করে। মাঝে এক বার আমেরিকায় বাঁদর চালান দেওয়ার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন, সফল হয়ে উঠতে পারেননি। ১৯৬২’তে বিবাহবিচ্ছেদ, পরে অসিত গুপ্তের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহ। ১৯৭৬ সালে সেই দাম্পত্যেরও অবসান ঘটে।

ইতিমধ্যে, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি একমাত্র পুত্র নবারুণকে বাবার কাছে রেখে, চেয়েচিন্তে একটা ক্যামেরা জোগাড় করে উঠে পড়েছিলেন আগ্রার ট্রেনে। তন্নতন্ন করে রানির কেল্লা, মহালক্ষ্মী মন্দিরে ঘুরলেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে টাঙাওয়ালা, কাঠকুটোর আগুন ঘিরে বসা কিষাণ মেয়েদের থেকে গল্প শুনলেন, ‘রানি মরেনননি। বুন্দেলখণ্ডের মাটি আর পাহাড় আজও ওঁকে লুকিয়ে রেখেছে।’

তাঁর একটি বিখ্যাত গল্প ‘স্তনদায়িনী ও অন্যান্য গল্প।’ এখানে দেখানো হয়েছে এক মহিলা শিশুদের স্তন্যপান করান। এই স্তন্যপান করানোই ছিল মহিলাটির পেশা। কিন্তু একদিন কৌটোর দুধ এসে বাজার ছেয়ে নেয়। মহিলাটি পেশাহারা হয়ে পড়েন। এবং শেষ জীবনে মহিলাটির ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়। এমনই আরও অনেক মর্মস্পর্শী গল্প লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

মহাশ্বেতা দেবী সম্পর্কে ১৯৯৭ সালে শঙ্খ ঘোষ লিখেন – ‘…আমাদের ভব্যসমাজের সেই গণ্ডিটাকে উড়িয়ে দিতে চাওয়াটাই হলো মহাশ্বেতাদির ব্যক্তিজীবনের আর রচনাজীবনের সবচেয়ে বড়ো কাজ।… ‘মহাশ্বেতাদির মতো সত্যভাবে কেউই আমরা বলতে পারি না যে সমস্ত কিছু পিছুটান ভাসিয়ে দিয়ে সেই নিচুতলারই সহপথিক আমার জীবন। সাহিত্যজগতে সে-কথা বলতে পারেন ওই একজন, ভব্যসমাজের রীতি-না-মানা ওই একজন, বলতে পারেন যে তিনি ‘বর্ণ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের নিপীড়িত দুঃখী সংগ্রামী মানুষের আপনজন।… আমাদের সাহিত্য সমাজে এই একজন আছেন, সত্য অর্থে যাঁকে যে কোনো অঞ্চলে অভ্যর্থনা জানানো যায় ।শুধু পণ্ডিতজনের সেমিনার ঘরে নয় – অবোধজনের পথে পথে মাদল বাজিয়ে।’

মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যের একটি দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন বিষয়ের বহুমাত্রিকতা এবং দেশজ আখ্যানের অনুসন্ধান ক’রে। তার সেই খুঁজে ফেরা আখ্যানে তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছেন ব্যতিক্রমী জনপদের সাহিত্য। যে সাহিত্য কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য কেবল মাত্র সাহিত্য হয়ে থাকে নি, হয়ে উঠেছে ইতিহাস ।

তিনি ইতিহাস থেকে, রাজনীতি থেকে যে সাহিত্য রচনা শুরু করেন, তা শোষিতের আখ্যান নয় বরং স্বদেশীয় প্রতিবাদী চরিত্রের সন্নিবেশ বলা যায়। প্রতিবাদী জীবন ও সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ঘরানার লেখক তিনি। সামাজিক দায়বোধ থেকেই তিনি তাঁর সেই উপেক্ষিত ইতিহাসের নায়কদের তুলে আনেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের ভূমিকায় বলেছিলেন—

লেখক হিসাবে, সমকালীন সামাজিক মানুষ হিসাবে, একজন বস্তুবাদী ঐতিহাসিকের সমস্ত দায় দায়িত্ব বহনে আমরা সর্বদাই অঙ্গীকারবদ্ধ। দায়িত্ব অস্বীকারের অপরাধ সমাজ কখনোই ক্ষমা করে না। আমার বিরসা-কেন্দ্রিক উপন্যাস সে অঙ্গীকারেরই ফলশ্রুতি।

মহাশ্বেতা দেবী তাঁর চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর উপন্যাসে ব্রিটিশ আমলের এক মুন্ডা হেডম্যান পহানকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন? সে সময় বিহার রাজ্যের ছোট লাটসাহেব রনাল্ডসনের ভাই মুন্ডাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। ইংরেজ লোকটি মুন্ডা আদিবাসী গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে আদিবাসী নারী-পুরুষের সঙ্গে ফটো তুলছিলেন এবং আদিবাসীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছিলেন, গ্রাম্য মেয়েদের সঙ্গে হাসি-তামাশায় মেতে উঠেছিলেন। এই দেখে অবাক হয়ে ওই মুন্ডা হেডম্যান পহান তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?’

মহাশ্বেতা দেবী ইতিহাস থেকে এমন চরিত্র নির্মাণ করেন, যা নিজেই ইতিহাস হয়ে যায়। প্রান্তিক মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ইতিহাস থেকে তিনি নায়ক খুঁজে সাহিত্যে তাদের প্রতিস্থাপন করেছেন। যেমন ‘শালগিরার ডাকে’ (১৯৮২) উপন্যাসটির নায়ক তিলকা মাঝি মূলত ইতিহাসের একজন নায়ক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের শোষণে পড়া বিহার-উড়িষ্যার সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া তিলকা মুরমুকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন এ উপন্যাস। ১৭৮৫ সালে এই তিলকা মুরমুরকে ফাঁসি দিয়েছিলো ব্রিটিশ সরকার।

মহাশ্বেতা বরাবরই বলতেন, তিনি সময়কে লেখার মধ্য দিয়ে দলিলীকৃত করেন। তিনি যেমন ইতিহাস থেকে সময়কে তুলে আনেন, তেমনি লেখকের উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে সাহিত্যের মোড়কে লিপিবদ্ধও করে ইতিহাস তৈরি করেছেন।

‘সুরজ গাগরাই’ (১৯৮৩)-এর সুরজ চরিত্রে এমনই এক বীরের উপস্থিতি দেখতে পাই। খড়কাই বাঁধ প্রকল্প নিয়ে আশির দশকের শুরুতে যে সংর্ঘষ হয়, তার নেতা ছিলেন চাইবাসার কাছাকাছি ইলিয়াগড় নিবাসী গঙ্গারাম কালুণ্ডিয়া। তিনি সেনা বিভাগে কাজ করতেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। সেই গঙ্গারাম কালুণ্ডিয়াই এ উপন্যাসের সুরজ গাগরাই। সুবর্ণরেখা নদীর বাঁধ প্রকল্প নিয়ে সংঘটিত সংঘর্ষের কাহিনীকে কেন্দ্র করেই এ উপন্যাস। সময়কে ধরতে গিয়ে তিনি কোলহান জাতির ইতিহাসকে সম্পৃক্ত করেছেন। এতে তাদের সমাজ-জীবন, পারিবারিক জীবনসহ উঠে আসে। আশির দশকের রাঁচি, পাটনা, উত্তর বিহার ও পালামৌ-ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী অঞ্চলের মানুষজনের সাথে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের নামে কিছু জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপট।

মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন- ‘মহাশ্বেতার লেখার দু’টি স্তর আছে। কিছু কিছু রচনা ইতিহাসভিত্তিক, আবার কিছু কিছু গল্প-উপন্যাস সমসাময়িক বাস্তবতার তীব্র রূপ। ইতিহাসচেতনা না থাকলে সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক রচনাও সার্থক হয় না, নিছক গল্প হয়ে যায়। কারণ, সমসাময়িক ঘটনাও ইতিহাসের অঙ্গ।’

১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষুধা’ উপন্যাসটি তিনি লিখেছেন আশির দশকে; সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় ‘মানাতুর মানুষখেকো’ নামক লোমহর্ষক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যেখানে প্রকাশ পায় মানাতুরের এক জমিদার তার নিজস্ব চিড়িয়াখানায়, খাঁচায় বন্দি চিতাবাঘকে খাওয়াত বন্ডেড লেবার বা ভূমিদাসের মাংস। এবং একজন নতুন মা ও তার শিশুটিকে বাঘের খাঁচায় ছুড়ে ফেলার সত্যি খবরের ভিত্তিতেই মহাশ্বেতা এ উপন্যাসটি লিখেছেন। এ প্রসঙ্গে লেখক জানান, “যাঁদের ঘটনাগুলি অবিশ্বাস্য মনে হবে, তাঁদের উত্তর দেবার দায় আমার নেই। ডালটনগঞ্জে যে সাংবাদিকের ঘরে থাকতাম সে ঘর, ওই শিবাজী ময়দান, গান্ধী হল, পালামৌয়ের পথ ঘাট, সেদিনের তরুণ বুদ্ধিজীবী সহসাথীরা জানে ‘ক্ষুধা’-র প্রতিটি অক্ষর সত্যি।”

তিনি ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাইকে নিয়ে যেমন লিখেছেন দেশ পত্রিকায়, পরবর্তী জীবনে লিখেছেন সাঁওতাল বিদ্রোহ যারা করেছিলেন তাঁদের জীবনযাত্রা নিয়ে। অবহেলিত জনজাতি, যারা সমাজের ব্রাত্যজন, তঁদের সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবীর নিবিড় মেলামেশা ছিলো। তাঁর লেখাতেও বারবার উঠে এসেছে নিম্ন স্তরের মানুষদের কথা।

তাঁর ব্যক্তিজীবন অনেকেরই পছন্দ নয়। একবার উত্তরবঙ্গের একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়ায় তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কলেজের একটি সভায় শিক্ষকদের আভিজাত্য ও উন্নাসিকতার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সামনেই তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন।
তাঁর স্বভাবের মধ্যে অনেক সময় বৈপরীত্য দেখা গেছে। এক সময় কট্টর মার্ক্সবাদীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন আবার জীবন সায়হ্নে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকটজন হয়ে পড়েন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মমতার নীতির প্রতিবাদ করেন। তাঁকে বাংলা আকাদেমির সভাপতিত্বের আসনচ্যুত হতে হয়। তবু তিনি প্রতিবাদী। প্রচিলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি সব সময়ই প্রতিবাদে সরব হতেন। তাই তো বোলপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রোমোটারি ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করেছিলেন।

২০০৮ সালে সেলিনা হোসেনের সম্পাদনা দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী গল্প শিরোনামে একটি গ্রন্থ বের হয়। এই সংকলনে মহাশ্বেতা দেবীর যে গল্পটি ছিল, তার নাম রুদালী। এই গল্পটি চলচ্চিত্র হয়েছে। গল্পটি পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বিষয়ের নতুনত্ব আমাকে বিস্মিত করেছিল।

রুদালী বাংলা শব্দ নয়। সে জন্য আমাদের অভিধানে নেই। এই শব্দের ব্যাখ্যা হলো, এরা টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা নারী। এদের মৃত বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করতে হয়। বিনিময়ে টাকা পায়। এই নারীরা মূলত রাজস্থানের নিম্নবর্গের বিভিন্ন গোত্রের। এভাবে কাঁদানোর রীতি রাজস্থানের সংস্কৃতির অংশ। স্বরোচিষের কাছ থেকে রুদালীদের চিনতে পেরে মহাশ্বেতা দেবীর সৃজনের মাত্রা আমাকে আচ্ছন্ন করে।

গল্পের নায়িকার নাম শনিচরী। নিজের কেউ মারা গেলে শনিচরী কান্নার সময় পায় না। মৃতের সত্কারের জন্য নানা কাজ করতে হয়। বর্ণনা এমন : শাশুড়ি মরলে শনিচরী কাঁদেনি। ওর বর আর ভাশুরশাশুড়ির দুই ছেলেকেই হাজতে পুরেছিল মালিক-মহাজন-রামাবতার সিং। বুড়িকে দাহ করার ব্যবস্থা করতে শনিচরী এত ব্যস্ত ছিলো যে কাঁদার সময় হয়নি। হয়নি তো হয়নি! বুড়ি যে জ্বালান জ্বালিয়ে গেছে, কাঁদলেও তো শনিচরীর আঁচল ভিজতো না। এরপর মারা গেল শনিচরীর ভাশুর আর জা। তখনো কাঁদা হলো না শনিচরীরকাঁদবে, না লাশ জ্বালাবার, সস্তায় শ্রাদ্ধ সারবার কথা ভাববে? শনিচরীর জীবন তো এভাবেই কাটে।

কারণ ওকে কাঁদতে হবে মৃত বাড়িতে গিয়ে। টাকা আয় করতে হবে।

স্বামীর মৃত্যুতেও কাঁদা হলো না শনিচরীর। একমাত্র ছেলে বুধুয়াকে নিয়ে রান্ডি হলো। ঘটনা দাঁড়াল এমন যে মোহনলালকে তুষ্ট করতে, রামাবতারের কাছে পাঁচ বছর ক্ষেত-বেগারি খেটে ৫০ টাকা শোধ করবখতে টিপসই দিয়ে কুড়ি টাকা নিতে, সে টাকায় বুধুয়ার বাপের শ্রাদ্ধ করতে, শ্রাদ্ধ মেটাতে কচি ছেলে নিয়ে হা-ভাত! জো ভাত! করতে করতে এমন ব্যস্ত থাকে শনিচরী যে বুধুয়ার বাপের জন্য আর কাঁদা হয়নি।

এক বছর পর খত দিয়ে টাকা নেওয়ার দায় শোধ করার জন্য দিনমজুরির সময় শনিচরী অন্য মজুরদের বলল, আজ আমি বুধুয়ার বাপের জন্য কাঁদব। বুক ফাটিয়ে কাঁদব।

অন্য মজুররা অবাক হলো। এত দিন পরে কাঁদবে কেন শনিচরী? তাও আবার বুক ফাটিয়ে কান্না? ওদের জিজ্ঞাসার উত্তরে শনিচরী বললো, তোরা মজুরি নিয়ে ঘর যাবি। আমি খত লিখে বসে আছি। আমি যাব চারটি ভুট্টার ছাতু নিয়ে। তাই কাঁদব। আমার কান্না পায় না?

মৃত স্বামীর জন্য নয়, কাঁদতে হয় ভাতের জন্য। এভাবেই নিম্নবর্গের মানুষের জীবন চিত্রিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে। এরপর ছেলে বুধুয়া মারা গেছে, এখনো কাঁদতে পারেনি শনিচরী। শুধু দুই চোখ ভরে তাকিয়ে দেখল খিদের জ্বালায় বুধুয়ার বউ ঘর ছেড়ে গেলো। যে পুরুষদের ও ভাই ডেকেছিলো তারা ওকে রান্ডি ছাড়া আর কিছু ভাবেনি। এসব নিয়ে শনিচরীর ভাবনা ভাঙিয়ে দিয়ে অন্যরা বলল, অত পাপ-পুণ্য দেখাতে চাস না বুধুয়ার মা। পাপ-পুণ্য মালিকদের এখতিয়ারের জিনিস। ওরাই সে হিসাব ভালো বোঝে। তুই-আমি বুঝি খিদের হিসাব। শেষ পর্যন্ত শনিচরী কাঁদতে গেল গম্ভীরা সিংয়ের মৃত্যুর পরে। তার আগে ওকে অনেক রান্ডি জোগাড় করতে হলো। বেশ্যাপাড়ায় গিয়ে হাজির হলো ও। বিধবাদের জড়ো করলে যুবতী বেশ্যারা বলল, আমরা যাব না? শনিচরী পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, সবাই চল। বুড়ো হলে এ কাজ তো করতে হবে, আমি থাকতে থাকতে তোদের হাতেখড়ি করে দিই।

গল্পের শেষে দেখা যাচ্ছে, পেটফোলা লাশ ঘিরে রুদালী রান্ডিরা মাথা কুটে কাঁদতে লাগল। মাথা কুটে কাঁদলে পাওয়া যায় ২০০ টাকা। গল্পের শেষ হলো শনিচরীর কান্না দিয়ে।

এ এক অসাধারণ গল্প। অন্যদিকে নিম্নবর্গের মানুষের ভাতের কান্না প্রিয়জনের মৃত্যু শোকের চেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে। এও এক কঠিন সত্য। জীবনের এই অনুচ্চারিত দিক সাহিত্যে এনেছিলেন তিনি। তাই তাঁকে স্মরণে রাখা মৃত্যুরও অধিক।

ঝাঁসির রানী’ উপন্যাস ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক হিসেবে বেরোল এবং একা একা ঘুরে বেড়িয়ে লেখার উপাদান সংগ্রহ করার বিপ্লবিয়ানায় মহাশ্বেতা তাঁর পূর্বসুরি লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণাদের থেকে বেশ খানিকটা আলাদা হয়ে গেলেন। আলাদা হয়ে গেলেন তাঁর অকুণ্ঠ রাজনৈতিক উচ্চারণেও। ‘অগ্নিগর্ভ’ উপন্যাসের সেই মোক্ষম লাইন: ‘জাতিভেদের সমস্যা ঘুচলো না। তৃষ্ণার জল ও ক্ষুধার অন্ন হয়ে রইলো রূপকথা। তবু কত দল, কত আদর্শ, সবাই সবাইকে বলে কমরেড।’ কমরেডরা তো কোনও দিনই ‘রুদালি’, ‘মার্ডারারের মা’-এর সমস্যা দেখেননি। ‘চোলি কে পিছে’ গল্পের স্তনহীন নায়িকা যে ভাবে ‘লক আপে গ্যাংরেপ… ঠেকেদার গাহক করে, গানা বাজায়’ বলে চেঁচাতে থাকে, পাঠকেরও কানে তালা লাগে।

মহাশ্বেতা দেবীর মত প্রাণবন্ত মানুষের মৃত্যু নেই। যতদিন জীবন ও সমাজের জন্য একটি মানুষের লড়াই জারি থাকবে, ততদিন মহাশ্বেতা শক্তবাঁধনে থাকবেন সংগ্রামী মানুষের বাজুবন্ধে।সর্বভারতীয় সাহিত্য এবং সমাজ এই দুই ক্ষেত্রে মহাশ্বেতা দেবীর মত সমান গ্রহণযোগ্যতা অন্য কোন বাঙালির আছে বা ছিল বলে আমার জানা নেই।

শুভ জন্মদিন হাজার চুরাশির মা।