শুভ জন্মদিন হৃদয়পুরের ভবঘুরে রাখাল

লুৎফুল কবির রনি

বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গেও খুব আন্তরিক সম্পর্ক ছিল শক্তির। তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্বাতী বলেন, ড্রিঙ্ক করার পরে বন্ধুর বউয়ের সঙ্গে একটু ফ্লার্ট তো অনেকেই করেন! তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না, কিন্তু শক্তিকে অনেকটা খেয়েও তেমন কিছু করতে দেখিনি।

মদ্যপানের পরে সুনীলের বন্ধুদের মধ্যে নানা মজার ঘটনা ঘটত। এএইআই ক্লাবের আড্ডায় একবার কেউ একজন সুনীলকে বললেনও, শোনো, তুমি যদি স্বাতীকে ডিভোর্স করো, আমায় খবর দিও কিন্তু। সুনীল, বুদ্ধদেব গুহ, মতি নন্দী অনেককেই মেয়েদের সঙ্গে একটু-আধটু ফ্লার্ট করতে দেখেছি। আর শ্যামল (গঙ্গোপাধ্যায়) তো ইচ্ছে করে দুষ্টুমি করতেন, ‘স্বাতী তুমি কি আমায় একবারটি চুমু খেতে দেবে?’ বন্ধুদের মধ্যে এ সবই নির্দোষ মজা। শক্তির কিন্তু মেয়েদের নিয়ে এই ব্যাপারটা কখনও দেখিনি!

আমার বরং ওঁকে দেখে কেমন মায়া হতো! মায়েদের যেমন সবচেয়ে দুষ্টু ছেলেটার ওপরে বাড়তি স্নেহ থাকে। আমার মনে হয়, মদ খেলে সুনীল খানিকটা বেশি ‘হোল্ড’ করতে পারত। চট করে অতটা বেসামাল হতো না। হলেও চুপচাপ থাকত। শক্তি তুলনায় বেশি হইচই করতেন। হয়তো একটু বেশি তাড়াতাড়ি অনেকটা খেয়ে ফেললেন! তার পর কয়েক বার বললেন, ‘আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়!’ কিংবা হয়তো নিজেদের মধ্যে একটু গালাগাল করলেন। সুনীলকে দু’-একবার দেখেছি, এই সময়ে ওঁকে সামলাচ্ছে, ‘শক্তি, উঁ-হু এখানে কিন্তু এ সব কথাবার্তা হয় না।’ প্রথম প্রথম লোকটাকে নিয়ে আমার একটু জড়তা ছিল। শক্তিকে একটু ভয়-ভয়ও করত। কিন্তু ক্রমশ সে-সব কেটে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, যাই একটু মাথায় হাত

শক্তি-চট্টোপাধ্যায়

বুলিয়ে দিই, কয়েক বার দিয়েওছি! বলেছি, ‘সত্যি আপনারা পারেনও! কেন এত খান? কী যে করেন! ’

এখানে কবিতা পেলে গাছে-গাছে কবিতা টাঙাবো।’

এমন করে আর কে’ই বা বলতে পারেন! তিনি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জীবন জুড়ে, পথে-পিরিচে কবিতার ঘর-বাড়ি।

সুবর্ণরেখা পেরিয়ে লোকটা হাঁটছে রবিঠাকুরের ঘর-বাড়ির দিকে।
হাঁটছে…

তিনপাহাড়। মন্দির। ছাতিমতলা। ওপাশে পুরনো মেলার মাঠ। কিঙ্করের ডেরা থেকে বেরিয়ে, রতনপল্লির একলা পথ। লোকটা উত্তরায়ণে।

বিচিত্রা-সংগ্রহশালায় ঢোকার মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। তার চোখ যে গিয়েছে, সংগ্রহশালার সিঁড়িতে। প্ল্যাকার্ডের লেখায়। সেখানে লেখা, ‘জুতা খুলিয়া প্রবেশ করুন’।

কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা…
সজোরে লাথি মেরে লোকটা দূরে সরিয়ে দিল প্ল্যাকার্ড!
হায়, হায় করে উঠল চারপাশ!
‘‘এটা কী করছেন শক্তিবাবু!’’

লোকটার স্পর্ধা দেখে ছুটে এসেছেন রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ ভবতোষ দত্ত। বিস্মিত তিনিও!

লোকটা যেন উন্মত্ত দরবেশ! জলদগম্ভীর স্বরে বললো, ‘এটা কি মন্দির? রবীন্দ্রনাথ কি দেবতা? আমি বিশ্বাস করি মানুষে। মন্দির হলেও মানুষের মন্দির!’

রবীন্দ্রানুরাগী ছিলেন শক্তি। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই রবিঠাকুরের প্রতি সমূহ অনুরাগ কাজ করে। এক্ষেত্রে তার একটি স্বীকারোক্তি উল্লেখ্য,

‘আমি যখন মদ্যপান করতে করতে নিজের মধ্যে চলে যাই তখন রবীন্দ্রনাথের গান আমার ভিতর বাহিরকে একাকার করে দিয়ে যায়। তখন গলার সবটুকু জোর ও উদারতা দিয়ে ওঁর গান গাইতে ইচ্ছে করে।’

বোহেমিয়ান এই কবির যখন একটা আশ্রয় লাগতো, তখন হয়তো কারো দরজায় এভাবেই করাঘাত করতে চাইতেন, আবার হয়তোবা নিজের দরজার দিকেই তাকিয়ে থাকতেন একবার একটি করাঘাতের কামনায়। ভাবনা ও ভাষার বৈপরীত্যপূর্ণ সংঘাতে ভেসে ওঠে কিছু কথা,

“দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া

কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া

অবনী বাড়ী আছো?”

নীরদ মজুমদারের বাড়িতে শক্তি-সুনীল

সাহিত্যজীবনের শুরুটা কবিতা নয়, গদ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো। ‘কুয়োতলা’ উপন্যাসই তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ১৯৫৬-৫৭ এর দিকে এটি রচিত হয় এবং ১৯৬১ সালে প্রকাশিত। প্রথমদিকে তিনি উপন্যাস লিখে অর্থ রোজগারের চিন্তা করলেও পরে তার সমগ্র সত্ত্বাই যেন ঝুঁকে পড়ে কবিতার দিকে। এই উপন্যাসটির নায়ক নিরুপমকে শক্তির পরবর্তী বেশ কিছু উপন্যাসেও দেখা যায়, তবে প্রথমবারের মতো ওঁর প্রবলতা থাকে না তাতে। হয়তো বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু কাব্যের দিকে সরে এসেছিলো বলেই উপন্যাসে তার সাহিত্যিক তীব্রতায় ভাঁটা পড়ে।

দায়বদ্ধতা তাকে তেমন আকর্ষণ করতো না, ছুটে বেড়ানোতেই জীবন খুঁজে পেতেন বলেই হয়তো! অনিয়ন্ত্রিত গতির মধ্য দিয়েই তার অগতানুগতিক ভাবনা প্রকাশ পেতো শক্তিময় লেখনীতে। লাগামহীন জীবন আর মদ্যপান- এই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

“ভালোবাসা পেলে আমি কেন পায়সান্ন খাব

যা খায় গরীবে, তা-ই খাব বহুদিন যত্ন করে”

যার সব আবেদন নগণ্য হয়ে যায় ভালোবাসার কাছে, তেমনই কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তার জীবনে প্রেম এসেছিলোও অত্যন্ত সরব উপস্থিতি নিয়ে। মলয় রায়চৌধুরীর দাদা সমীর রায়চৌধুরীর শ্যালিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমে পড়েন তিনি। একসাথে অনেকটা সময়ও কাটান তারা। শীলা কলেজে গেলে বাইরে গাছতলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন শক্তি। ধারণা করা হয়, সেই অপেক্ষারই ফসল ছিল ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো। সমীর রায়চৌধুরী চাকরিজনিত কাজে বাইরে গেলে বাড়িতে মাঝেমাঝে শক্তিকে রেখে যেতেন এবং বলাই বাহুল্য যে এ কাজটি তিনি বেশ আগ্রহের সাথেই করতেন!

একবার তো এতদিন থেকে গিয়েছিলেন যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার খোঁজে গিয়ে বলেন, “তুই এখানে ইস্টিশান পুঁতে ফেলেছিস ?” কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে প্রেম পরিণয় পর্যন্ত গড়ায়নি এবং এই ব্যর্থতা তার জীবনে বেশ গভীর দাগ কাটে। সাহিত্যজীবনেও এর বেশ প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এ নিয়ে তার লেখা ‘কিন্নর ও কিন্নরী’ উপন্যাসটি প্রকাশ পায় ১৯৭৭ সালে। এটি ছাড়াও ‘অম্বা ও দেবব্রত’, ‘রামচন্দ্র ও শর্বরী’, ‘সোম ও তারা’, ‘অর্জুন ও উত্তরা’ নামক চারটি ব্যর্থ প্রেমের উপন্যাস তিনি উপহার দেন বাংলা সাহিত্যকে, যার উৎসও মনে করা হয় তার নিজের জীবনে প্রেমের ব্যর্থতাকেই। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসগুলোর সবগুলোই পৌরাণিক চরিত্র কেন্দ্রিক।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় খ্যাপাটে মাতাল। শক্তি চট্টোপাধ্যায়।এই কবি জীবনকে উদযাপন করেছেন, নিংড়ে নিংড়ে। তাঁর জীবনের পুরোটাই মিথ। যা তিনি জন্ম দেননি, তাও। ‘এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালেম/ চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়।’

আপাত দৃষ্টে পদ্যের শক্তি খ্যাপামো দিয়ে মোড়ানো মনে হলেও শক্তির পদ্য আদতে আধুনিক সমাজের বিরুদ্ধে খ্যাপাটে এক আক্রমণ, সে হোক প্রেম, ঘৃণা কিংবা দ্রোহের পঙক্তি, সব জায়গাতেই এক তেড়েফুড়ে আসা চেহারা– শক্তি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়– ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি নিয়েই হাজির হয়েছেন পঞ্চাশের দশকে।

হৃদয়ের গহীনে বসত করা অবাধ্য নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছেন, জাগাতে চেয়েছেন, বৃষ্টিস্নাত বারোমাসে: “বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস/ এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে/ পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস/ দুয়ার চেপে ধরে– ‘অবনী বাড়ি আছো?” শক্তি নিজেই বলেছেন অবনী তিনি নিজেই। শরীরটা যেন এক বাড়ি, ভেতরে থাকা নিজেকে তাই চিৎকার করেই ডাকেন তিনি, যখন, শক্তি বলছেন, “আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী/ ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি/ সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া/ ‘অবনী বাড়ি আছো?’” এই কড়ানাড়া যেন থামে না, থামতে চায় না।

শিশির মঞ্চের সামনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়

যে শক্তি এত ছন্নছাড়া, উড়নচণ্ডী, বাউণ্ডুলে স্বভাবের; যে শক্তি অফিসে হাজির থাকে না টানা কয়েকদিন। জিজ্ঞেস করলে বলেন, বলে গিয়েছি তো! কাকে? শক্তির উত্তর, কেন দারোয়নকে তো বলে গেলাম, দশদিনের ছুটিতে যাচ্ছি। শক্তি এমনই। কবির স্ত্রী মীনাক্ষীও অনেকসময় জানতেন না কোথায় আছেন শক্তি। কদিন পর খোঁজ আসে, কলকাতার বাইরে কবিতা পাঠের আসরে পদ্য পড়ছেন শক্তি।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে তার বাবার কথা মনে করে বলেন, তিনি শুধু কবি বা লেখকই ছিলেন না, একজন সমাজসেবীও ছিলেন। একবার তিনি তার এলআইসি ফান্ডের সম্পূর্ণ অর্থ এক রিকশাচালককে দিয়ে দেন শুধুমাত্র এই কারণে যে রিকশাচালকটি কয়েকটি কবিতা লিখেছিলো এবং বাংলা সাহিত্যে তার বেশ আগ্রহ ছিল।

নিশি ডাকা ভোরে, টেলিফোনে টেলিফোনে ঘুরল কবির শোক-সংবাদ!
চলে যাওয়ার খবরে মীনাক্ষীদেবী এলেন শান্তিনিকেতন। এলেন আরও অনেকে। তাঁদের স্মৃতি—
এসেছিলেন তাঁর প্রেসিডেন্সির শিক্ষক, ভূদেব চৌধুরী। মীনাক্ষীদেবী বললেন, ‘‘আপনার ছাত্র ফাঁকি দিয়ে চলে গেল!’’ ভূদেববাবু কবি-জায়ার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘‘ও যে চিরকালের ক্লাস পালানো মা, তুমি আর কত দিন ধরে রাখতে পারবে!’’

শান্তিনিকেতনে শক্তির শেষযাত্রায় তাঁকে স্টেশনে পৌঁছবার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও জোটেনি!
ঘি রঙের ডোরাকাটা পাঞ্জাবি, পাজামায় বরফের বিছানায় ঘুমিয়ে শক্তি। জিপে করে দেহ পৌঁছল বোলপুর স্টেশনে।
রবিঠাকুরকে বিদায় জানানোর প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পর, আর এক প্রিয় কবিকে চোখের জলে ভেসে শেষ প্রণাম জানাল বোলপুর-শান্তিনিকেতন!
পা দুটি হাঁটু অবধি, বেরিয়ে রইল জিপের বাইরে। সারাটা পথ!

শক্তির কবিতা নিয়ে বলার দু:সাহস আমি করি না। এই আজন্ম ভবঘুরে,বাউণ্ডুলেকে বলি
“কে বেশি পাগল/ কবি না কবিতা/ দরকার নেই সেই হিসেব দেবার।/ ঘুমোও বাউণ্ডুলে, ঘুমোও এবার।”

ক্রন্দনরত বীজের খোলস, ভেতরে ক্রন্দন স্মৃতির জননী হয়ে যার কবিতা করুণ সুরে বুকে বেজে উঠে , সে ভবঘুরে শব্দ কারিগর , হৃদয়পুরের রাখাল শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

কবিতার আধুনিকতার উৎস খুঁজতে গিয়ে শক্তি কবিতার রাজ্য তছনছ করে দেবার ভূমিকা নেন।কলকাতার মধ্যরাতের রাজত্ব করা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাঁচার অনুপ্রেরনা পেতেন জীবনের থেকে। তাঁর কবিতাগুলো হাজার টানাপোড়েনের মাঝে এক উদ্দাম জীবনশক্তির দলিল।

‘শুভ জন্মদিন হৃদয়পুরের ভবঘুরে রাখাল’

ছবি: গুগল