শুয়োরের সঙ্গে মুখোশে মুখোশে মানুষের বসবাস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

না, ছেলেটিকে আমি চিনতাম না। নামও জানতাম না তার। দেখা হয় নি কখনো। চিনি না তার পিতাকেও। কিন্তু তবু আবরার ফাহাদকে আমি চিনি। কারন আমি অভিজিৎ, দীপনদেরও চিনি। পশুত্ব, সহিংসতা ও নৃশংসতার শিকার ওদের কেউ আমার অচেনা নয়। আবরারের বাবাকেও আমি জানি। কারন অধ্যাপক অজয় রায় আর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও আমার চেনা? না, ব্যক্তিগত পরিচিতির কারনে নয়, সন্তান হারানোর পর ওঁদের মুখায়বয়ের সঙ্গে আবরারের পিতার আর্ত মুখের কোন তফাৎ নেই বলে।

আবরার কি রাজনীতির শিকার, সে কি প্রান দিয়েছে মতামতের ভেদাভেদের কারনে, সে কি চলে গেল অন্যের ক্রোধের মূল্য দিতে গিয়ে? আপাত:দৃষ্টিতে তাই মনে হলেও আবরার আসলে আত্মাহুতি দিয়েছে নৃশংসতার কাছে, শিকার হয়েছে সহিংতার, হার মেনেছে পশুত্বের কাছে। যারা আবরারের ওপরে চড়াও হয়েছিলো, তারা ছাত্র নয়, তারা তরুন নয়, তারা হয়তো মানুষও নয়; তারা নৃশংসতার ছোরা, তারা সহিংতার তরবারি, তারা পশুত্বের রাম-দা। ওই দিন শুধু আবরারের প্রানহানি ঘটে নি, মৃত্যু হয়েছে সহনশীলতার, শুভ বুদ্ধির আর মানবতার।

আমাদের সমাজে ভিন্নতা তো নতুন কিছু নয়। সংস্কৃতির ভিন্নতা আছে, ভিন্নতা রয়েছে ধর্মের, রাজনৈতিক বিশ্বাসের আর্থ সামাজিক অবস্থানের, জীবন-যাপন প্রক্রিয়ার। সে ভিন্নতা নিয়েও আমরা সম্প্রীতির সঙ্গে, সৌহার্দ্যের সঙ্গে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বসবাস করেছি যুগ যুগ ধরে। সেই বৈচিত্র্য আমাদের শক্তিশালী করেছে, দূর্বল করে নি; ঋদ্ধ করেছে, শূন্য করে নি; বিকশিত করেছে, সঙ্কুচিত করে নি। বিরোধ কি ঘটেনি তখন, মতানৈক্য কি দেখা যায় নি ওই সময়ে, সংঘর্ষ কি বাঁধে নি সে বেলায়? সবই হয়েছে। কিন্তু সে সবই আবার মিটিয়ে ফেলা হয়েছে বিবিধ প্রক্রিয়ায়। ভিন্নতা মাত্রেই ভেদাভেদে পরিনত হয়নি।

তা’হলে এখন কেন সব কিছু বদলে গেলো? পাঁচটি কারন বারবার আমার চিন্তা-চেতনায় উঠে আসে। প্রথমত: আমাদের সমাজে মানুষে-মানুষে একটি সম্পর্ক ছিলো আত্মিক, অন্যটি ব্যবসায়িক। আজ সব সম্পর্কই স্বার্থের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছি। কোন দিন ভাবি নি শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক অর্থের হয়ে দাঁড়াবে, ভাই-বোনের সম্পর্ক ব্যবসায়িক হয়ে যাবে, সতীর্থ বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক স্বার্থ-সম্পর্কে রূপান্তরিত হবে – রাজনৈতিক স্বার্থ, আর্থিক স্বার্থ, সামাজিক স্বার্থ! স্বার্থ যখন সব সম্পর্কের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়, তখন স্বার্থের বিপক্ষে কোন মতভেদই সহ্য করা যায় না।

দ্বিতীয়ত: স্বার্থের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক ‘ইউ’ আর ‘কিউ’ এর মতো। স্বার্থ যেমন বহু অর্থের চালিকা শক্তি, অর্থও তেমনি বহু স্বার্থের যোগানদার। অর্থের বিনিময়ে বহু স্বার্থসিদ্ধির জন্যে মানুষ মানুষকে অপমান করতে, নিগৃহীত হতে, প্রানহানি ঘটাতে দ্বিধা করে না। বর্তমান সময়ে আমাদের তরুন সমাজের মাঝে, আমাদের নানান ছাত্র সংঠনের মধ্যে এ প্রবনতাটি প্রবল।

তৃতীয়ত: স্বার্থ ও অর্থ যেখানে মূখ্য, সেখানে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হবেই। আত্মকেন্দ্রিকতা কতগুলো মাত্রিকতার সৃষ্টি করে – যেমন, যে কোন ব্যাপারে চরম অবস্থান নেয়া, সহনশীলতা হারিয়ে ফেলা, পরমত সহিষ্ণুতার বিলুপ্তি। এ অবস্থায় কোনো রকম দ্বিমতের অবস্থান স্বীকার করা হয় না। ‘তুমি আমা থেকে যে কোন দিকেই ভিন্ন হলে, তুমি আমার কাছে শুধুমাত্র অগ্রহনযোগ্যই নও, তুমি আমার কাছে পরিত্যাজ্য’ – এটাই আজ আমাদের সামাজিক সম্পর্কের একটা মূলসূত্র।

চতুর্থত: যে কোন বিরোধ বা মতভেদ বিবিধ উপায়ে নিরসন করা যায় – বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা, মধ্যস্থাতা এমন কি বিরাগের দ্বারাও। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের সমাজে সব বিরোধের মীমাংসা করাহয় অস্ত্রের মাধ্যমে ও শক্তি প্রয়োগের দ্বারা।আমাদের সমাজের অস্ত্রায়ন ও পেশীশক্তির সংস্কৃতি বিরোধ মীমাংসার অন্য সব উপকরণকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে।

পঞ্চমত: অস্ত্রায়নের পথ ধরেই আসে নির্মমতা আর নৃশংসতা। অস্ত্রের ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে গেলে নৃশংশতা সেখানে স্বাভাবিক হয়ে যায়। সেটা আমরা বিশ্বজিৎ থেকে আবরার পর্যন্ত প্রতিটি হ্ত্যাকান্ডে দেখেছি। নৃশংসতা মানুষের পাশবিকতাকে উসকে দেয় আর তাই নৃশংসতার কালে মানুষের কেন বিচারবুদ্ধি কাজ করে না।

শেষ করি তিনটে কথা দিয়ে। এক, সহিংসতা, নৃশংসতা আর হত্যার এ প্রবনতায় শুধু আবেগ-মথিত হওয়াই যথেষ্ট নয়, সেখানে বিবেক-চালিত হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত কাতরতাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করা বড়ই জরুরী।

দুই, গণতন্ত্রের একটি মূল স্তম্ভই হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। সেই মত প্রকাশে মানুষ যদি ভীত হয়ে পড়ে, তা’হলে গণতন্ত্র হারিয়ে যাবে। সে জায়গাটিকে আমরা যাতে ধ্বংস না করি।

তিন, আমি মনে করি,জাতি হিসেবে আমাদের একটি মনস্তাত্বিক নিরীক্ষণ হওয়া দরকার। মনোবিজ্ঞানীদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত। আমাদের বর্তমান অবস্থাটি তুলে ধরতে কে যেন উল্লেখ করেছিলেন, ‘মুখোশে মুখোশে মানুষের সঙ্গে শুয়োরের বসবাস’। হয়তো এটাও বলা যায়, ‘শুয়োরের সঙ্গে মুখোশে মুখোশে মানুষের বসবাস’।

ছবি: গুগল

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]