শেকড়ের সন্ধানে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

পাশ দিয়ে অতি ধীরে হেঁটে গেলেন তিনি। যখনই শনি কিংবা রবিবারে আমাদের দ্বীপে হাঁটতে বেরোই, তখন মাঝে মাঝেই তাঁকে দেখি। বয়সের ভারে ন্যূব্জ হয়ে গেছেন, চোখে ভালো দেখতে পারেন বলে মনে হয় না, হাতের কম্পনও দূর থেকে চোখে পড়ে। বয়স কম করে হলেও নব্বুই হবে – চেহারা দেখে বুঝতে পারি, পূর্ব ইউরোপীয় হবেন। হাঁটেন অতি ধীরে, ডান হাতে শক্ত করে ধরে থাকেন তাঁর সাহায্যকারিনীর হাত।বাঁ হাতে একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগটি বহু পুরোনো – কাপড়ের রং বিবর্ন হয়ে গেছে, বাঁধার সুতোটি বর্তমান সময়ে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না – এতই প্রাগৈতিহাসিক সেটা। কিন্তু কখনোই ওই ছোট্ট ব্যাগটি ছাড়া এ অতি বৃদ্ধা মহিলাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না – ব্যাগটি যেন তাঁর আত্মারই অংশ, তাঁর ব্যক্তিত্বেরই একটা দিক, তাঁর প্রতিদিনের একটি অবিভাজ্য জিনিষ। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, তাঁকে ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করি, কি অমন মনি-মুক্তো আছে ঐ ব্যাগে যে তিনি কখনোই ঐ ব্যাগটি হাতছাড়া করেন না।

আজ একটু হেঁটে গিয়ে পূর্বী নদীর তীরের বেঞ্চিতে বসি। কি সুন্দর দিন – একটু গরমের দিকেই, কিন্তু একটা ভারী মিষ্টি হাওয়া বইছে! একটু পরেই টের পাই যে ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি এসে আমার পাশে বসেছেন – হাতে ধরা তাঁর সেই অনন্য ব্যাগ। তারপর আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তুমি তো ভিন্ন দেশের বুঝতে পারছি। কোন দেশের গো তুমি’? আমি স্মিতহাস্যে বললাম,‘বাংলাদেশের’। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা, ‘এটা কি তোমার জাতীয় পোশাক?’ – দেখলাম তাঁর চোখ আমার গায়ের লাল পাঞ্জাবীটির দিকে। আমি হেসে বললাম, ‘তা’ বলতে পারেন’।তিনি উদাস দৃষ্টিতে পূর্বী নদীর ওপারের হর্ম্যরাজির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর খুব মৃদুস্বরে বললেন, ‘দ্যাখো, আমরা যারা বাইরে থেকে এ দেশে আছি, তারা সবাই আমাদের শেকড়ের একটা অংশ আঁকড়ে থাকতে ভালবাসি। এই যেমন, তুমি তোমার জাতীয় পোশাক পরে আছ’।

বলতে বলতে তাঁর চোখে একটি নরম ছায়া নামে। অতি যত্নে তিনি তাঁর নিত্যসঙ্গী কাপড়ের ব্যাগটির ফিতে খোলেন। তারপর আরও নরম হাতে ব্যাগের ভেতরের দিকে আঙ্গুল চালিয়ে আরেকটি ছোট ব্যাগ বের করেন।তারপর আমাকে বলেন, ‘এটির মধ্যে কি আছে জানো? প্রায় আশি বছর আগের বুদাপেষ্ট শহরতলীর একটি বাড়ীর সামনের উঠোনের একটি পপলার গাছের দু’টো শুকনো পাতা’। আমার অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন,’ আমি হাঙ্গেরীর মেয়ে। আশি বছর আগে আমার পিতামহ-পিতামহী আমার মা-বাবা যখন এদেশে আসেন, তখন আমার বয়েস দশ বছর। আমাদের বাড়ীর সামনে বড় একটা পপলার গাছ ছিলো। আমার ভীষন বন্ধু, আমার খেলার জায়গা – কতদিন যে কাটিয়েছি ঐ গাছের তলায়’, একটি চাপা দীর্ঘ নিশ্বাস শুনতে পাই আমি।

‘যখন বুদাপেষ্ট ছেড়ে চলে আসি, তখন অন্যকিচ্ছুর কথা মনে হয় নি, শুধু ঐ গাছটির কথা ভেবে বুকের মধ্যে ভারী কষ্ট হয়েছিলো,’ তিনি বলতে থাকেন। ‘যে শুকনো পাতা দু’টো নিয়ে এসেছিলাম, তারা আজ ধুলোর মতো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু আমি কখনো তাদের কাছছাড়া করি না। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন ঐ পাতাদু’টো – না পাতার দু’টোর গুঁড়োগুলো – আমি বয়ে বেড়াবো। কারন, ওগুলোই আমার শেকড়’।বলতে বলতে তিনি চোখ তুলে আমার দিকে তাকান। চেয়ে দেখি তাঁর বড় বড় নীলচে চোখ জলে টলটল করছে। আমি অতি মমতায় তার হাতে আলতো করে আমার হাত রাখি – টের পাই তাঁর কম্পমান হাত আমার হাতের ওপর এসে পড়েছে।
শেকড়ের প্রতি এই যে টান, সেটা কত ভাবেই না প্রত্যক্ষ করেছি। আমার এক প্রতিবেশী ভিয়েতনাম থেকে এদেশে এসেছেন। গত তিনবছর থেকে তাঁর অদম্য চেষ্টা লক্ষ্য করছি, কি করে তাঁর বারান্দায় বাঁশ গাছ গজানো যায়। হচ্ছে না – কোন ভাবেই সম্ভব নয়, তবু তাঁর উদ্দ্যমে কোন ভাঁটা পড়ে নি – প্রতি বছরই তিনি নতুন উৎসাহে শুরু করেন। আমার পেরুর এক সহকর্মী অতি পরিতৃপ্তির সঙ্গে বৈশ্বিক সব রকমের খাবার খান – কিন্তু তাঁর দেশের কিনোয়ার প্রতি তাঁর যে কি আকুলি-বিকুলি! সারা নিউইয়র্ক চাষে বেড়ান, কোথায় সবচেয়ে ভালো কিনোয়া পাওয়া যায়। এ অভিযান থেকে কেউ তাঁকে দমাতে পারে নি। এই যে ক’দিন আগে অবয়বপত্রে দেখলাম, লন্ডনে আমাদের বাচ্চারা রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা-আবিষ্কার’ অভিনয় করেছে অতি সুন্দরভাবে, তখন গর্বের ভাগই তো ছিল বেশী, কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও তো মনে হয়েছে, এ প্রচেষ্টাতো প্রবাসে দেশ ও সংস্কৃতির চিহ্ন ধরে রাখার আন্তরিক প্রয়াস – বর্তমান প্রজন্মের জন্য তো অবশ্যই, তার চেয়েও বেশী আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও।

যে জীবন ছেড়ে এসেছে, যে পৃথিবী পেছনে ফেলে এসেছে, তার প্রতি এক অবর্ণনীয় মমতাতো মানুষের চরম অবস্হা বা দুর্দিনেও লক্ষ্য করেছি। গত বছর কার্যোপলক্ষে তুরস্কের শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলাম। মূলত: সিরিয়া থেকে আসা শরনার্থীই সেখানে। ঘুরতে ঘুরতে একটি শিশু শরনার্থীকে দেখে চোখ ফেরাতে পারি নি। ফুলের মতো শিশুটি, লাল আপেলের মতো গাল, চোখ চক চক করছে। কিন্তু বোঝা যায়, চুলে তেল পড়ে নি বহুদিন, পোশাক শতচ্ছিন্ন, নাক দিয়ে সিকনি ঝরছে, স্নান হয় নি বহুদিন। দেখতে পেলাম, এতো কিছুর মধ্যেও সে বুকের কাছে একটি ভাঙ্গা-চোরা পুতুল ধরে আছে। পুতুলটির একটি পা নেই, একটি চোখে গর্ত, গায়ের রং চটকে গেছে। কিন্তু জানা গেল যে একমাত্র ঘুমের সময় ছাড়া সে পুতুলটি হাতছাড়া করে না।

শিশুটির পিতা জানালেন, যখন পরিবারটি আলেপ্পো থেকে পালায়, তখন এ শিশুটি তার পুতুল ছাড়া আর কিছুই তুলে নেয় নি। সারা পথ কচি কচি হাতে সে পুতুলটি বয়ে এনেছে তুরস্কের সীমান্ত পর্যন্ত। এখন পুতুলটি নিতান্তই পুরোনো, ভাঙ্গা-চোরা, শতচ্ছিন্ন – কিন্ত তবু সে পুতুলটি ছাড়বে না। কৌতুহলী হলাম আমি। দোভাষীর মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলাম, ‘একটি নতুন পুতুল দিলে তুমি এ পুতুলটি দিয়ে দেবে’? ‘না, না’, ভীষন জোরে মাথা ঝাঁকায় সে। তার বাবা জানালেন, এ প্রশ্ন তাকে আগেও করা হয়েছে। কিন্তু তার জবাব একটাই – ‘ এ পুতুলটি আলেপ্পোতে ফেলে আসা তাদের বাড়ীর দোতালার বারান্দার কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে সে বসে বসে পুতুলটি নিয়ে খেলতো। তাই এটা সে কিছুতেই দেবে না – নতুন একটা পেলেও না।’ ঐ ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে শিশুটির দিকে তাকিয়ে দেখি, সে চোখ বুঁজে পরম আদরে পুতুলটির গালের সঙ্গে নিজের গাল মিলিয়েছে। কেন জানি, আমার চোখ ছাপিয়ে জল এলো।

আজ বিশ্বায়নের যুগে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায় – নতুন সুযোগের জন্য, নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষায়। সংঘাত এবং সংঘর্ষও মানুষকে প্রতিনিয়ত ঘর ছাড়া করে – আমরা কি জানি যে, বিশ্বে সংঘাত ও সংঘর্ষের কারনে প্রতি মিনিটে ২৪ জন মানুষ ঘর থেকে উৎখাতিত হয়, সীমান্ত পেরোয়, নতুন জগতে প্রবেশ করে? কিন্তু যে কারনেই মানুষ ঘরছাড়া হোক না কেন, এক টুকরো স্বদেশ মানুষ তার বুকের মধ্যে নিয়ে যায়। আর যেখানেই সে যাক না কেন, সে টুকরোটুকু সে বয়ে বেড়ায়। ঐ যে আমার এক লেখক বন্ধু বেশ কিছুদিন আগে তার এক লেখায় লিখেছিল, ‘ঘর ছাড়া মানুষ যেখানে যায়, তার ফেলে আসা দেশের চিহ্ন খুঁজে বেড়ায়’।

লেখক: সেলিম জাহান
ভূতপূর্ব পরিচালক
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং
দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box