শেক্সপিয়ার গাঁজা সেবন করতেন

খোঁজাখুঁজির সূত্রটা পাওয়া গিয়েছিল সনেটে। ৭৬ নম্বর সনেটে লেখা আছে এরকম-

“Why with the time do I not glance aside
To new-found methods and to compounds strange?
Why write I still all one, ever the same,
And keep invention in a noted weed”

শেক্সপিয়ারের বাড়ি

শেক্সপিয়ারের বাড়ি

এই সনেট কার লেখা সে নিয়ে সাহিত্যের মনযোগী পাঠকের ভুল হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। আমরা বলছি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কথা। তাঁর সনেটগুচ্ছ তো পৃথিবীর সাহিত্যের ভান্ডারের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এই এই সনেটটিতে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় ওয়েড বা ক্যানাবিসের, যাকে আমরা শুদ্ধ বাংলায় বলি গাঁজা। সাধু ভাষায় গঞ্জিকা। কিন্তু শেক্সপীয়রের কবিতায় গাঁজার উল্লেখ! নড়েচড়ে বসার মতো আবিষ্কারই বটে। আমাদের বিশ্ব বরেণ্য এই নাট্যকার ও কবি মহাশয় কী তাহলে গাঁজায় আসক্ত ছিলেন?

কেমন যেন একটা খটকা লাগে তাঁর। কবি “compounds strange” আর “noted weed” এর মাধ্যমে কি অন্য কিছু বোঝাতে চেয়েছিলেন? বহু বছর আগে ইংল্যান্ডে কম্পাউন্ড স্ট্রেঞ্জ বলতে বোঝাতো কয়েকটি রাসায়নিক বস্তুর সম্মিলনে তৈরী নেশাদ্রব্য আর ওয়েডের নতুন করে তো আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। এই সূত্রটিই কয়েক বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার এক পুরাতাত্ত্বিক, ডাঃ ফ্রান্সিস থ্যাকারের মাথায় ঢুকে গেল। গবেষক মহাশয় শেক্সপিয়ারের কবিতা পাঠ করছিলেন। পড়তে পড়তে তার চোখ আটকে যায় কবির রচিত  ৭৬ নম্বর সনেটের এই চারটি লাইনে। ব্যাস, তাঁর মাথায় খটকা ঢুকে গেল। তিনি নেমে পড়লেন অনুসন্ধানে। কয়েকদিনের মধ্যেই দলবল নিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন সুদূর ইংল্যান্ড। সটান হাজির হলেন স্ট্র্যাটফোর্ড আপন এভন শহরের নিউ প্লেস নামক বাড়িটিতে, যেখানে কবি শেক্সপিয়ার তাঁর জীবনের অনেকটাই সময় কাটিয়েছিলেন। শেক্সপিয়ারের বাড়িতে ঢুকে গবেষণায় লেগে যাওয়া তো মুখের কথা নয়। তাকে অনুমুত নিতে হলো ‘শেক্সপিয়ার বার্থপ্লেস ট্রাস্ট’-এর কাছ থেকে। বাড়ির বাগানের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেল ২৪টি ধূমপান করার পাইপ। থ্যাকারে পাইপগুলোকে পাঠালেন রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরীতে। পরীক্ষার ফলাফলে ৮টি পাইপে গাঁজা আর ২টি তে কোকেন সেবনের চিহ্নের কথা বলা হলো। শুরু হয়ে গেলো গোটা পৃথিবী জুড়ে হৈ চৈ। মারামারি লেগে যাবার দশা। কবি গাঁজায় দম দিয়ে মহান কাব্য সৃষ্টি করে গেছেন? তা কী করে সম্ভব? অনেকেই বললেন যে গাঁজার প্রতিশব্দ হিসেবে weed এর ব্যবহার ইংরেজি ভাষায় অনেক বছর পর শুরু হয়। সুতরাং কবি এই উদ্দেশ্যে কখনই এটা লিখতে পারেন না। আবার কয়েকজনকে বলতে শোনা গেল  যে কবি তো বহু শব্দকেই নতুন নতুন অর্থে ব্যবহার করেছেন, এক্ষেত্রেই বা সেটা প্রযোজ্য  হবে না কেন?

মাটির তৈরী এই পাইপগুলোর জন্মকাল সপ্তদশ শতাব্দীতে। তখন ইংল্যান্ডে মারিজুয়ানা নামক বস্তুটি চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হতো। থ্যাকারে অবশ্য তার রিপোর্টে বলেছেন, শেক্সপিয়ার গাঁজা সেবন করে থাকতেই পারেন। তখন ইংল্যান্ডে নবজাগরণের সময় বুদ্ভিজীবী সমাজে নেশা করার প্রেচলন ছিল। আর শেক্সপিয়ার মহাশয় তাঁর লেখার জন্য এবং নিজের মস্তিষ্ককে উজ্জীবিত করার জন্য এ ধরণের নেশাদ্রব্য নিয়ে থাকতেই পারেন। তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় নি।Marijuana-Drug-Addiction-23

পাইপগুলো পরীক্ষা করতে গিয়ে ফ্রান্সিস থ্যাকারে আরও কিছু মজার তথ্য পেয়ে যান। দুটি পাইপে তিনি কোকেনের অবশেষ আবিষ্কার করেন। এই দুই পাইপের একটি এসেছিল আজকের ইংল্যান্ডে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় যার নামে সেই জন হার্ভাডের মায়ের বাড়ি থেকে। ইউরোপে কোকেনের অস্তিত্বের বয়স আগে ধরে নেয়া হতো ২০০ বছর। কিন্তু এই আবিষ্কার গবেষখদের ধারণাই পাল্টে দিয়েছে।

তবে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের গঞ্জিকা সেবনের বিষয়ে গবেষকদের বক্তব্য যে একেবারে অকাট্য তা অনেকেই মেনে নিতে রাজি নন। তারা বলছেন, বাড়ির বাগানে পাইপ আবিষ্কার করার মানেই যে শেক্সপিয়ার গাঁজা অথবা কোকেন সেবন করতেন সে তত্ত্ব প্রমাণিত হয় না। এই পাইপগুলোর মালিকও যে শেক্সপিয়ার ছিলেন তারও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তবে গোটা বিষয়টা প্রমাণ করতে হলে পরীক্ষা করতে হবে স্ট্যাটফোর্ট-আপন-অ্যাভন শহরের কবরখানায় ৪০০ বছর ধরে নিরিবিলিতে শুয়ে থাকা শেক্সপিয়ারের দেহাবশেষ।২০১১ সালে ড. ফান্সিস থ্যাকারে শেক্সপিয়ারের কবরের ভেতরকার থ্রি-ডি ছবি ধারণ করার জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। তাতে কবর খনন না করেও কবির কঙ্কালের বিশদ ছবি পাওয়া সম্ভব হতো। থ্যাকারে তখন আমেরিকার ফক্স নিউজকে জানিয়েছিলেন, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, শেক্সপিয়ারের মাথার খুলি পরীক্ষা করা। এওকই সঙ্গে তাঁর দাঁতের পাটিও তারা পরীক্ষা করবেন। আর এতে করে শেক্সপিয়ারের মৃত্যুর আসল কারণটাও জানা যাবে। জানা যাবে তিনি কোন ধরণের নেশায় আসক্ত ছিলেন কি না। কিন্তু সেখানেও ঝামেলা বাধলো। গেল বছর স্ট্যাফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রত্নতাত্বিক দল শেক্সপিয়ারের কবরে অনুসন্ধানের অনুমতি পেয়ে কাজ শুরু করে। আর তখনই বের হয়ে আসে নতুন এক তথ্য-কবরের ভেতরে মস্তকহীন অবস্থায় পড়ে আছে শেক্সপিয়ারের হাড়গোড়। তারা জানায়, ১৮৭৯ সালে ‘আরগোসি’ নামে একটি পত্রিকায় কবর থেকে শেক্সপিয়ারের খুলি চুরি হওয়ার খবর ছাপা হয়েছিল।

অবশ্য এই বিষ্ফোরক খবরটির সত্যতা প্রমাণ করার জন্য গবেষকরা আর কোন অনুসন্ধান চালাতে পারেন নি। সম্ভবত উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের শেষ ইচ্ছার একটি ছিল তাঁর নিজের কবরে কোন খনন কাজ না চালানোর। পলে এই দুই রহস্যের কোন সঠিক সমাধান এখনো কেউ জানিতে পারে নি।

মনসুর রহমান

তথ্যসূত্রঃ দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ

ছবিঃ টেলিগ্রাফ, গুগল