শেকড়ের টান…

সুলতানা শিরীন সাজি

(অটোয়া থেকে): ছোটবেলা আমাদের ভীষন আকর্ষণের জায়গা ছিল আমাদের নানী বাড়ি। বগুড়ার সুলতান গঞ্জপাড়ার নামাজগড়ে ঈদগাহ মাঠের ঠিক লাগোয়া বাড়িটা।আমার মায়ের নানাবাড়ি বগুড়ার সোনাতলায়। মায়ের মুখে কত গল্প যে শুনেছি ছোটবেলায়। আমরা ট্রেনে করে যখন বগুড়া আমাদের নানাবাড়ি যেতাম। সোনাতলা স্টেশনে আসলে মা বলতো,”এখানে আমাদের নানাবাড়ি”। আমি দু’চোখ মেলে রাখতাম। আর ভাবতাম একদিন মায়ের সঙ্গে মায়ের নানা বাড়ি যাবো। নিজেদের নানাবাড়ি যাবার ইচ্ছাতে এতটাই উন্মুখ হয়ে থাকতাম যে তখন মায়ের জায়গায় বসে ভাবাও হয়নি মায়ের কেমন লাগছে। আজ মায়ের অনুভবের সেই জায়গাটুকু যেনো ছুঁতে পারি। হয়তো চুপ বসে আছি। স্মৃতির কোন সুদুর থেকে উঁকি দেয় সেই সব দিন। লালমনিরহাট থেকে বগুড়া খুব বেশি দূর নয়। তবে লোকাল ট্রেনে যেতে প্রায় সারাদিন লেগে যেতো। প্রতিটা স্টেশনে ট্রেন থামতো আর আমরা ফেরিওয়ালাদের ডাকতাম। কারো কাছে বাদাম,ঝালমুড়ি বা কারো কাছে ফল কিনে খেতাম। মায়ের আরো দুই বোন থাকতো আমাদের একই শহরে। দিলু খালাম্মা আর রানী খালাম্মা। আমরা সবাই যখন একসঙ্গে নানী বাড়ি যেতাম ,ভীষন আনন্দ হতো। নানী বাড়ি পৌছানোর পর মাকে আর বেশি কাছে পেতাম না। মা রান্না ঘরে যেয়ে মামী বা খালাদের সঙ্গে রান্না শুরু করতেন। ভাইবোনদের সঙ্গে গল্প করতেন। আমরা ভাইবোনরা সবাই নানীবাড়ির বিশাল ফল বাগান এ লুকোচুরি খেলতাম। বাড়ির একপাশ দিয়ে একটা ডোবার মত ছিল। ওখানে যাওয়া বারণ ছিল। নানী বাড়িতে ঢোকার সময় বিশাল গেটের উপর লেখা ছিল, হামিদা বাগ। নানীর নামে বাড়ি। শহরের মধ্যে এত বড় জায়গা নিয়ে একটা বাড়ি। মাটির বাড়ি অথচ দেখতে মনে হতো পাকা বাড়ি। বাড়ির সামনে এত সুন্দর সিঁড়ি ছিল,আমরা প্রায় পঁচিশ ত্রিশজন বসতে পারতাম। বসে বসে কত গল্প,কত গান।

বাড়ির ভিতরে উঠানে নামার আগেও একই রকম সিঁড়ি ছিল কিন্তু বেশি বড় না। মায়েরা সিঁড়িতে বসতো, কেউ চেয়ারে। তাদের গল্পের কোন বিষয় আমাদের ছুঁয়েও যেতোনা। হয়তো তাদের অনেকের গল্প জুড়েই আমরা ছেলেমেয়েরা  ছিলাম। আমরা কে কি করবো, কেমন থাকবো। এইসব। বাবা মায়েদের গল্পে সন্তানরা কিভাবে যে জুড়ে যায় তা নিজেরা বাবা মা না হলে বুঝতাম না। এখন কারো সঙ্গে গল্প করলে কখন যে সেই গল্পে ছেলেরা চলে আসে, সেকথা ভাবলে অবাক হয়ে যাই। আমাদের বড়মামার গলার স্বরটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। একদম আলাদা। কারো মত না।

হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র) এর মাজার

আব্বা সবসময় আমাদের সঙ্গে যেতে পারতেন না। যেবার যেতেন,আমার খুব ভালো লাগতো। সেই ছেলেবেলায় নানা, দাদাবাড়ি ছাড়া আর অন্য কোথাও তো যাইনি কখনো। আমি অবশ্য আব্বার সঙ্গে মাঝে মাঝে ঢাকায় যাবার বায়না করতাম আর চলেও যেতাম। আব্বা কত গল্প করতেন। আব্বা নানীবাড়ি গেলে খুব মজা হতো। সবাই বসে গল্প করতেন। খাওয়া ,দাওয়া চলতো। সে এক অদ্ভুত পরিবেশ। মনে হতো পৃথিবীর যত সুখ যেনো সেখানেই।

আমরা নানী বাড়ির বড় হল রুমটায় বসতাম গোল হয়ে। কার্পেটের উপর বিছানা পাতা হতো। নানী বাড়ির সেই রুমে একটা শো-কেস ভর্তি অনেক বই ছিল। আমার ভীষন ইচ্ছা করতো বই পড়তে কিন্তু চাবিটা ঠিক কার কাছে ছিল বা থাকতো জানা ছিলোনা। তাই বাইরে দিয়ে তাকিয়ে নামগুলো পড়ার চেষ্টা করতাম। শো-কেসের ভিতরে ঝিনুকের দু’টো পুতুল সাজানো ছিল। অদ্ভুত সেই পুতুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এই হল রুমের আর একটা আকর্ষণ ছিল,দেয়ালে আমার মামাদের ছবি। যখনি যেতাম আমাদের খেলা ছিল,কোনটা কোন মামার ছবি কে ঠিক বলতে পারবে? ছোটরা সবাই পারতোনা। আমরা বারবার যেতে যেতে শিখে গেছিলাম। এত সুন্দর সেই ছবিগুলো। বড় বড় ফ্রেমে বাঁধানো। একটা বড়ফ্রেমে নানার সঙ্গে ,আমার মা এবং আরো কয়েকজন মামা, খালার ছবি ছিল। আমার সাত বা আট বছর বয়সী মায়ের সেই ছবি দেখে অদ্ভুত লাগতো।

আমার মায়ের এক খালাতো ভাই ছিলেন। উনি পাঠান পাড়ার নান্নু মামা নামে পরিচিত ছিলেন। আমাদের যাবার খবর পেলে উনি ঠিক চলে আসতেন। এত হাসিখুশি আনন্দময় মানুষ আমি জীবনে কম দেখেছি। উনি যেখানেই যেতেন, মাতিয়ে রাখতেন চারিদিক। আমরা মামাকে পেলেই বায়না ধরতাম মহাস্থান গড় যাবো। আমরা সবাই মামার সঙ্গে রওনা দিতাম। মামা ঘুরে ঘুরে আমাদের গল্প করতেন। মহাস্থান বাস স্ট্যান্ড থেকে খুব কাছেই হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র:) এর মাজার শরীফ। পরশুরামের ভিটা, গোবিন্দ ভিটার উপর দাঁড়িয়ে বিস্ময় লাগতো। আমরা সবাই ভাবতাম, কোথায় শোবার ঘর ছিল,কোনটা রান্না ঘর। মামা বলতেন অভিশাপে সব বিলীন হয়ে গেছে। ঠিক কি কারণে বা কার অভিশাপের কথা বলতেন আজ মনে নেই।

একটা ছোট্ট যাদুঘর ছিল সেখানে, আমরা ছুটির দিনে যেতাম বলে কখনোই যেতে পারিনি ভিতরে। অনেক বছর পরে একবার গেছিলাম কিন্তু কিছু পুরাতন বই,প্লেট আর চাকু দেখেছিলাম মনে আছে। একটা কুয়া আছে সেখানে, সেখানে সবাই মানত করে পয়সা ফেলতো। ওখানে গেলে আমার ভীষন ভয় করতো। আমি কুয়ার নীচে তাকাতে পারতাম না। মামা ফেরার পথে আমাদের মহাস্থানের বিখ্যাত কটকটি কিনে দিতেন। খুব মজা করে খেতাম আমরা। মামা আমাদের শহরের সাতমাথা ঘুরে বাড়িতে নিয়ে যেতেন।

শীতকালে নানীবাড়ি গেলে সবচেয়ে মজার একটা ব্যাপার হতো সকালে । ঘুম থেকে আমাদের ওঠানো হতো। কারন হলো খেজুরের রস খাওয়া। বাড়িভর্তি মানুষ সব ঘুম চোখে উঠে আসছে আর কলস থেকে ফেনা ওঠা সেই খেজুরের  রস খাচ্ছে সবাই। আমার যদিও খেতে ভালো লাগতো না, তবু আজ নানীবাড়ির অনেক আনন্দ স্মৃতির এটিও একটি। উঠানের একপাশে তখন মায়েদের রান্না চলছে। সকালের নাস্তা। আমরা সবাই আবার লেপের নীচে গুটি শুটি মেরে শুয়ে থাকতাম। মামাদের ঘর কাঁপানো গল্প ,হাসির শব্দে আমাদের দুষ্টুমী ,হাসি চাপা পড়ে যেতো।

সাতমাথার মোড়

আজ এত বছর পর,কোথায় হারিয়ে গেলো সেই মানুষগুলো। দেয়ালের ছবির ফ্রেমের সেই মানুষগুলোর অনেকেই হারিয়ে গেছেন। কে জানে তারা কে কোন আকাশের কোন তারা হয়ে গেছেন।

নাকি আছেন কোথাও । শুন্য বলে যদি কিছু না থাকে তাহলে মানুষের চলে যাওয়া বলে কিছু নেই। হয়তো শুধু জায়গা বদল।

সেই নানী বাড়ি যাবার জন্য আমরা আকুল হয়ে থাকতাম। সেখানে একসময় মানুষের শোবার জায়গা দেয়া যেতোনা। মাত্র কয়েকটা বছর। তারপর ব্যস্ত হতে হতে কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো। শেকড় উপড়ে কে কোথায় আজ! মাঝে মাঝে ভাবি আসলে কয়টা বছর পাশে থাকি আমরা। ভাইবোনদের সঙ্গে আট থেকে দশ বছরের সুরভিত স্মৃতি। বাতাবী লেবুর মত। যার ঘ্রাণ সারাটা জীবন রয়ে যায়। মাঝে মাঝে খোলা জানালায় চোখ ফেলে,অথবা নিজের সন্তানদের কারো দিকে তাকিয়ে হয়তো মনে হয়, “আমার ছেলের চোখ আমার ভাই এর মত অথবা হাসিটা বোনের মত। অথবা কথাবলা ।” এইরকম স্মৃতি কাতরতা থাকে বলেই বোধহয় আমরা মানুষ। নাহলে ঘরের আসবারপত্রের মতই জড় একটা অস্তিত্ব হয়ে কাটাতে হতো জীবন।

আমার সেই মা,যে একদিন কি দাপটে সংসার চালাতো। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা নিজে দেখতো। এখন সেই মা, একলা বসে থাকে। কথা বলেনা খুব প্রয়োজন ছাড়া। মাঝে মাঝে কচিমামা জার্মান থেকে ফোন করলে অনেক কথা বলেন,মিনি খালাম্মা ফোন করে কত কথা বলেন,মা ফোনের এ প্রান্ত থেকে শুধু বলেন, “থাক মিনি,থাক,ভালো থাক।” মা পার্থিব কোন জটিলতা,কোন অভিযোগ ,অনুযোগ শোনেন না। শুধু তাকিয়ে থাকেন। এত ক্ষমা ,মা একেই কি ভালো থাকা বলে?  আমি বলেছি বলে ,আমার মা এখন প্রতিদিন ডাইরী লিখতে বসেন। কে জানে সেই ডাইরী জুড়ে আমরা আছি কিনা। নাকি সেই সোনাতলা। মায়ের নানাবাড়ি। মায়ের মামারা যেটা দান করেছেন একটা কলেজের জন্য। মায়ের গল্পের সেই বড়ই গাছ সেখানে আজো আছে কিনা জানিনা তবু মায়ের স্মৃতির সেই বড়ই গাছের পাতা এখনো ঝিরঝির করে নড়ে যায়,আমার কিশোরী মা ভাইবোনের হাত ধরে কোচড় ভরে বড়ই খুঁজে বেড়ান তার একলা অবসরে।

মানুষের ফিরে দেখার কোন সীমা নেই।ততটুকু ফিরে যায় মানুষ ,যতটুকুতে আলোময় হয়ে আছে ছেলেবেলার দিন।

ভালো থাকো মা। লেখো । ডাইরীর পাতায় পাতায় জমা হোক অনেক না বলা বানী। আমাদের ভালোবাসা বয়ে যাচ্ছে মা। মায়ের জঠরে জন্ম নেয়া প্রতিটা সন্তানের ভিতর বাবা-মায়ের ভালোবাসার স্মৃতি বয়ে যায়। আমি হয়তো জীবনের অদ্ভুত আয়োজনে আজ দূর থেকে দুরে বসে আছি। নাড়ির সেই টান আজো রয়ে গেছে মা। এমন করে হয়তো আমার সন্তানরাও বয়ে বেড়াবে আমাদের অনেক কিছু। অনেকদিন পর , একদিন আমাদের রাশীক বা  রাইয়ান হয়তো ওদের ব্লগ এ বসে লিখবে ওর মা টা ,বরফের দিনগুলোতে জানালার পাশে রোব গায়ে জড়িয়ে বসে কম্পিউটারে বাংলায় কবিতা লিখতো, ছেলেবেলার গল্প লিখতো। ফেইসটাইমে বসে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে থাকা দোয়েল ,মাতেয়া আর জয়াকে দেখতো আর কথা বলতো।

কিছু কি ভোলে মানুষ ,শেকড়ের টান? নাড়ির টান? সেকি ভোলার?

ছবি: গুগল