শেষদৃশ্যে জুলিয়াস ফুচিক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাম কী?বলো। ধাম? বলো। কার সঙ্গে যোগসাজশ আছে? জবাব দাও। তাদের নাম কী? বলো! বলো! না হলে পিটিয়ে মেরে ফেলবো তোমাকে।

কত মার মানুষ সহ্য করতে পারে?

বেঁধে কয়েক ঘা লাগাও।

রাত একটা। শেষ গাড়িগুলো ফিরে যাচ্ছে, পথ জনশূন্য।বেতার তার শেষ বিস্বস্ত শ্রোতাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সমিতির আর সভ্য কারা? তোমাদের ট্রান্সমিটারগুলো কোথায়?কোথায় ছাপাখানা?বলো! বলো বলো!

এখন আমি গুনতে পারছি আঘাতগুলো। ব্যথা শুধু এখন ঠোঁটে।ঠোঁট কামড়ে রয়েছি তাই…

দু‘টো। প্রাগ নিদ্রামগ্ন। কোথায় হয়তো শিশু কেঁদে উঠলো, কোথাও বা কোনো পুরুষ হয়তো তার স্ত্রীর নিতম্বে মৃদু চাপড় মারছে।

বলো! বলো!

রক্তাক্ত মাড়ি অনুভব করছি জিব দিয়ে, গুনতে চেষ্টা করছি ক‘টা দাঁত ওরা উপড়ে ফেলে দিয়েছ।

সময়টা ১৯৪৩ সাল। আগস্ট তখনো আসেনি ক্যালেন্ডারের পাতায়। তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগ শহরে নাজি বাহিনীর প্যানক্রাটস বন্দীশালার একটি ছোট্ট ঘরে বসে লিখে চলেছেন জুলিয়াস ফুচিক, সাংবাদিক, সাহিত্য-সমালোচক এবং তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। হিটলারের জল্লাদ বাহিনীর হাতে ১৯৪২ সালে ধরা পড়েন  ফুচিক। তিনি জানতেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চিত মৃত্যু। পার্টির সদস্য আর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের খোঁজ বের করার জন্য হিটলারের গেস্টাপো অফিসাররা ব্যাপক নিরযাতন চালায় ফুচিকের ওপর। প্রতি রাতে মারধোর আর জিজ্ঞাসাবাদ ছিলো নিয়মের মতো। কিন্তু তারা ভাঙতে পারেনি এই বিপ্লবীকে। মার খেয়ে প্রায় অচেতন হয়ে লোহার গরাদঘেরা সেলে পড়ে থাকতেন তিনি। জ্ঞান ফিরলে লিখতে বসতেন ভাঙা আঙুল দিয়ে। তখন তাঁর মুখের ভেতরে জমাট বেঁধেছে রক্ত, দাঁত পড়ে গেছে আঘাতে, একটানা মারে বিকল পা। সে লেখার পদ্ধতিটাও ছিলো ভয়ংকর। এক চেক কারারক্ষী তখন তাকে গেস্টাপোদের নজর এড়িয়ে সরবরাহ করতো পেন্সিল আর টুকরো কাগজ। সেই কাগজগুলোতেই রাত জেগে জেগে ফুচিক লিখেছিলেন জীবনের শেষদৃশ্যের ভয়াবহ বিবরণ, তাঁর ধারাবাহিক অথচ অনিশ্চিত লেখা। এই লেখাগুলোই হিটলারের পতনের পর ‘নোট ফ্রম দ্য গ্যালোজ’ নামে একটি বই হিসেবে প্রকাশ পায়। বাংলায় এই বইটির অনুবাদ করা হয় ‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’।

বিপ্লবী জুলিয়াস ফুচিকের অসামান্য জীবন, তার বেঁচে থাকা, দেশের জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়ার নানান ঘটনা নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো,‘শেষদৃশ্যে জুলিয়াস ফুচিক’।

চেকোস্লোভাকিয়া তখন হিটলারের পদানত। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছেন জুলিয়াস ফুচিক। তার ওপরই তখন ছিলো পার্টির পত্রিকা ‘রুদে প্রাভো’ নিয়মিত প্রকাশের দায়িত্ব। জার্মানরা চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে নেয়ার পরই অন্য বিপ্লবীদের সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান ফুচিক। গেস্টাপোদের চোখে ধূলো দিয়েই তিনি কাজ করছিলেন প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে। কিন্তু ১৯৪২ সালে ধরা পড়লেন তিনি হিটলারের খুনে বাহিনীর হাতে। তারা তাঁকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। সেই রাতে ফুচিকের সঙ্গে ছিলো আরো ছয় সঙ্গী। পুলিশের এক সাধারণ অভিযানে হঠাৎ-ই ধরা পড়েন এই বিপ্লবী। পরে গেস্টাপো বাহিনীর গোয়েন্দারা তাকে চিনে ফেলে।

ফুচিক সেই চিরকুটে লিখেছিলেন তাঁর ওপর জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালানো নির্মম অত্যাচারের কথা-পেটচেক বিল্ডিং-এর ছবি ঘরটি নিশ্চয়ই উপভোগের বস্তু নয়। এটি ‍উৎপীড়ন গৃহের প্রবেশদ্বার। এখানে থেকেই তুমি চিৎকার আর গোঙানি শুনতে পাবে, ভাববে, কী আছে তোমার ভাগ্যে কে জানে! দেখবে শক্তসমর্থ মানুষ এখানে ঢুকছে; দু তিন ঘন্টা পরে তারা ফিরে এলো একেবারে ভেঙেচুরে। এখানে বহু লোকের ভিড়। বেঞ্চে গায়ে গায়ে লেগে বসে আছে। তাদের ম্লান, রক্তাক্ত মুখ। দরজার কাছে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে উৎপীড়নের ছায়া। মজুরের নীল পোশাক পরনে। জল খেতে চাইছে..উদগ্র পিপাসায়। এবার সে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে, যেন যবনিকা পড়লো। আমার গ্রেপ্তারের প্রথম রাতে, প্রথম শুনানির সময় ঘটেছিলো এই ব্যাপার। ওরা আমাকে এখানে তিনবার নিয়ে এলো-বোধ হয় দশবারও হতে পারে।

জুলিয়াস ফুচিক ১৯০৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী প্রাগের সুমিচভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সেখানকার এক ইস্পাত কারখানায় কাজ করতেন। কিশোর বয়স থেকেই ফুচিক শ্রমিক আন্দোলন আর চেকোস্লোভাকিয়ার সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফুচিক ধীরে ধীরে শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে যান। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কমিউনিস্ট ছাত্র সংঘের একজন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ওই সময়ে প্রগতিশীল রাজনীতি করার জন্য বেশ কয়েকবার তাকে জেলে যেতে হয়।

কিন্তু জার্মান বাহিনী যখন চেকোস্লোভাকিয়া দখল করলো ফুচিক কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সঙ্গে আত্মগোপনে চলে গেলেন। তখন পার্টির মূল ঘাঁটির দায়িত্ব ছিলো তাঁর হাতে। আর এ কারণেই জার্মান গোয়েন্দারা হন্যে হয়ে খুঁজছিলো তাঁকে।

জার্মানদের সেই ভয়ংকর কয়েদখানার অন্তরালে দু‘একজন চেক কারারক্ষীর সাহায্য পেয়েছিলেন ফুচিক। এদের মাধ্যমেই সেই প্যানক্রাটস কারাগারে ফুচিকের কাছে পৌঁছেছিলো টুকরো কাগজ আর ক্ষয় হয়ে যাওয়া সামান্য পেন্সিল।

এত অত্যাচার আর মানসিক নীপিড়ন ফুচিককে নড়াতে পারেনি। জার্মানরা নানা ভাবে নিরযাতন করেও তাঁর কাছ থেকে তথ্য বের করতে সক্ষম হয়নি।কারাগার, অত্যাচার, সেখানকার মানুষগুলোকে ভিন্ন চোখে দেখতেন ফুচিক। তিনি লিখেছেন সেই গোপন কাগজে-আমার মুখোমুখি সেলের দরজার পাশে পাৎলুন বাঁধার ফিতেগুলো ঝুলছিলো। পুরুষদের ব্যবহারের খুব সামান্য জিনিস।যখনই আমাদের সেলের দরজা খুলে যায়, ওই দিকেই তাকিয়ে থাকি। ওদের ভিতরে যেন ক্ষীণ আশা দেখতে পাই।

যখন ওরা তোমাকে গ্রেপ্তার করবে, তোমাকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলতেও পারে, কিন্তু প্রথমেই ওরা তোমার গলাবন্ধ, বেল্ট আর পাৎলুনের ফিতা কেড়ে নেবে যাতে তুমি ফাঁসি দিতে না পারো। যতদিন পযর্ন্ত গেস্টাপো আদালত থেকে তোমাকে বেগার খাটানো বা বন্দী-শিবিরে চালান দেয়ার হুকুম না হয় বা তোমার মৃত্যুদণ্ড না আসে ততদিন মৃত্যুর এই যন্ত্রগুলো জেল অফিসে জমা থাকে। এমনি করেই এখানে বেঁচে আছি। গত বছর, গত মাস, আজ, আগামীকাল। আমাদের চোখ শুধু আগামীকালের দিকে তাকিয়ে আছে।

জেলের সেই জীবনকে ফুচিক একেবারে অন্য ভাবে দেখেছিলেন। একজন বিপ্লবী যেভাবে দেখে তার সংগ্রামকে। তিনি তাঁর সেই গোপন নোটের একটিতে লিখেছেন, ‘‘মানুষের জীবনের দিনগুলোর সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবু তুমি সেগুলো দ্রুত নি:শেষ করে দিতে চাও। হ্যাঁ, দ্রুততর হোক তার গতি, যতদূর সম্ভব হয় তাই ভালো। পলায়মান সময়, অবাধ্য সময়, মানুষের জীবনকে ক্ষইয়ে দেয় অথচ সেই-ই তো এখানে তোমার পরম বন্ধু! কী অদ্ভুত!

জুলিয়াস ফুচিককে ১৯৪৩ সালের মে মাসে নিয়ে যাওয়া হয় জার্মানীতে। সেখানে বাউতজেন নামে এক কারাগারে তাঁকে আরো দু‘মাস আটকে রাখা হয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন আগস্ট আসি আসি করছে। বিচার শুরু হয় ফুচিকের। তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা আর দেশদ্রোহীতার অভিযোগ এনে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। তারপর আসে ১৯৪৩ সালের সেই সেপ্টেম্বর মাস। তারিখটা ছিলো ৮। হিটলারের দানবরা তাঁকে ঝুলিয়ে দেয় ফাঁসির দড়িতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপর অবশেষে যবনিকা নামে। ফুচিকের স্ত্রী আগাস্তিনা ফুচিক খুঁজে বের করেন ফুচিকের সেই লেখাগুলো। ফুচিক যখন আটক ছিলেন তখন গেস্টাপোরা তাঁর স্ত্রীকেও ধরে নিয়ে যায়। আগাস্তিনার উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালে ফুচিকের ‘নোটস ফ্রম দ্য গ্যালোজ’ প্রকাশিত হয়।

ফুচিক তাঁর জীবনের প্রায় শেষদৃশ্যে একটি চিরকুটে লিখেছিলেন, ‘‘এই লেখা শেষ হওয়ার আগেই যদি জল্লাদরা আমার শ্বাসরোধ করে দেয়, তবে লাখো লাখো মানুষ রইলো যারা লিখবে তার ‘মধুর উপসংহার’।বি: গুগল

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্র: ফাঁসির মঞ্চ থেকে, উইকিপিডিয়া
ছবি: গুগল  

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]