শেষদৃশ্যে লোরকা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ভোর হয়নি তখনও। ১৯৩৬ সালের ১৭ আগস্ট। ঘড়ির কাটা এগিয়ে চলেছে অন্ধকার ভেদ করে আলো ডেকে আনতে। কিন্তু বাইরে তখন চলছিলো আরো বড় অন্ধকারের আয়োজন। একটা কালো গাড়ি এসে থামলো কাদায় মাখামাখি একটা রাস্তার উপর। গাড়ি থেকে সাদা প্যান্ট আর ব্লেজার পরা একজন মানুষ পা রাখলেন মাটিতে। চাঁদের আলোও নেই। অন্ধকার স্পর্শ করলো তাঁর ৩৮ বছর বয়সী শরীরের কাঠামো। গাড়ি থেকে নামলো পাঁচজন সৈন্য। তাদের হাতে জার্মান অস্ত্র। 

ঘুরে তাকিয়েছিলেন কি তিনি সেই অন্ধকারে? দেখতে চেয়েছিলেন সেই নারকীয় আয়োজনের শেষদৃশ্য গভীর মনযোগে? না। তাকাননি তিনি। কারণ সম্ভাব্য শেষদৃশ্য তো ভালো করেই জানা ছিলো তাঁর। তাই আগেই লিখেছিলেন কবিতায়-    

আমি টের পেলাম তারা আমাকে খুন করেছে।

কাঁফে, গোরস্থান আর গির্জা তন্নতন্ন করে তারা খুঁজলো আমাকে

উঁকি দিলো পিপায় আর দেরাজে

তিনটি কঙ্কাল লণ্ডভণ্ড করে উপড়ে আনলো সোনার দাঁত,

কিন্তু তারা আমাকে আর কখনো খুঁজে পেলো না।

লোরকার সমাধি

স্পেনের স্বৈারচারী শাসকরা কি সত্যিই খুঁজে পেয়েছিলো তাঁকে? মৃত্যু দিয়ে কি মুছে দেয়া যায় কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে?

সৈন্যরা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে একটু পরেই। মাটিতে পড়ে যান লোরকা। মৃত্যুদৃশ্যে তাঁর সঙ্গী ছিলেন দুজন বুলফাইটার এবং পক্ককেশ এক স্কুল শিক্ষক। যার একটা পা ছিলো কাঠের।

এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার শেষ দিনগুলি। 

 

সেই চন্দ্রালোকহীন রাত্রি পৃথিবীতে নামার ঠিক এক মাস আগে তৎকালীন স্পেনের ক্ষমতা দখল করেন সেনা জেনারেল ফান্সিসকো ফ্রাঙ্কো। সাদা ঘোড়ায় চড়তে অভ্যস্ত ৪৩ বছর বয়সী এই নিষ্ঠুর জেনারেল তখনকার স্পেনের বামপন্থী প্রগতিশীল সরকারকে টেনে নামিয়েছিলো ক্ষমতা থেকে। সেই অভ্যুত্থানে ফ্রাঙ্কোর পেছনে ছিলো খুনে ডানপন্থী সেনাবাহিনী, পুলিশ, উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ফ্যালাঞ্জিস্ট দল আর সিভিল গার্ড। তখন সমাজতান্ত্রিক শক্তি স্পেনে ক্ষমতা দখল করে আরেক সেনাশাসক মিগুয়েল প্রেমিও ডি রিভেরাকে উৎখাত করে। স্পেনে সমাজতান্ত্রিক শক্তির উত্থান এবং সংস্কার কাজ পছন্দ হয়নি সামরিক শক্তির। ফলে মঞ্চস্থ হয় অভ্যুত্থানের নাটক। লোরকা ছিলেন বামপন্থীদের ঘোর সমর্থক।

লোরকা জন্মেছিলেন ১৮৮৯ সালে স্পেনের গ্রানাদার কাছে একটা গ্রামে। বেড়েও ওঠেন সেখানেই। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে আবির্ভাব ঘটে একজন অসাধারণ সুরকার, কবি এবং নাট্যকারের। তাঁর কবিতা পাল্টে দেয় কবিতার পৃথিবী।ধারালো মুখাবয়বের অধিকারী গার্সিয়া লোরকার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে চিলির কবি পাবলো নেরুদা একবার বলেছিলেন, ‘লোরকার মধ্যে আভিজাত্য আর মেধা একসঙ্গে একটা ঝর্ণার মতোন বাঁধা পড়েছে। এমনটা আমি আগে দেখিনি।’

লোরকা ও বুনুয়েল

তিরিশ বছরে পৌঁছানোর আগেই এই কবি স্পেনের মানুষের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো গোটা দেশে। কিন্তু মৃত্যুর ছায়া কবির উপর সবসময়ই ছায়া ফেলে রাখতো। সমকামী লোরকার জীবন সমাজের ঠিক আর দশজন মানুষের মতো ছিলো না। ক্ষতস্থানে নুনের মতো কোথাও যন্ত্রণার দায় তোঁকে বহন করে চলতেই হতো। আর সেই যন্ত্রণার চেতনা থেকেই হয়তো জন্ম মৃত্যু চেতনার।

লোরকা ও দালি

তখন ফ্রাঙ্কোর বাহিনী অস্ত্র হাতে মাদ্রিদের দিকে এগিয়ে চলেছে। মাথার উপর তাদের ছায়া দিচ্ছে ইতালীর যুদ্ধবিমান। সৈন্যদের হাতে আছে জর্মানদের সরবরাহ করা অস্ত্র। ফ্রাঙ্কোর ভাড়া করা খুনে বাহিনীরে লোকেরা তাদের নেতার মতোই শ্লোগান দিচ্ছে, ‘মৃত্যু দীর্ঘজীবী হোক’। তখন কি লোরকা জানতেন মৃত্যু এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে ধীর পদক্ষেপে? জানতেন না। কিন্তু ওই অস্থির, মৃত্যুশাসিত সময়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘মৃত্যু সাধারণত অনেক কিছুর সমাপ্তি রেখা। কিন্তু স্পেনে মৃত্যু মানে উন্মোচন’।

তিনি স্পেনের বিখ্যাত ষাঁড়ের লড়াইকে ইঙ্গিত করে লিখেছিলেন, ‘‘স্পেন একমাত্র দেশ যেখানে মৃত্যু একটি জাতীয় চশমা, এখানেই শরৎ আসতেই মানুষ শুনতে পায় মৃত্যু ফেটে পড়ছে ট্রামপেটের তীব্র শব্দে’।১৯৩৬-এর এই উত্তপ্ত গ্রীষ্মে রক্ত ঝরছে ‘প্লাজা দ্য টরস’-এ। শুরু হয়েছে বুল ফাইট। যেমনি করে স্পেনের গ্রামে, শহরে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হাতে বিপ্লবীদের প্রাণহীন শরীর পড়ে থাকছে, এপাশ-ওপাশ করছে মৃত্যু যন্ত্রণায়’’। এই মৃত্যুর দূত হয়েই ফ্রাঙ্কোর খুনীরা গোটা দেশে চালাচ্ছিলো তাণ্ডব। ‘ফালাঞ্জিস্ট’ বাহিনী শুধু বিপ্লবী বামপন্থীদের খুন করেই ক্ষান্ত হতো না প্রমাণ হিসেবে কেটে নিতো তাদের কান। তাদের কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক স্কোয়াড’ তখন গোটা স্পেনে সংক্ষিপ্ত আদালত গঠন করে বাম সরকারের আদর্শে বিশ্বাসীদের হত্যা করছিলো, চালাচ্ছিলো নির্বিচারে ধর্ষণ। এমন কথাও প্রচলিত আছে প্রতি রাতে ফায়ারিং স্কোয়াডের হত্যাদৃশ্য দেখতে দেখতে পাগল হয়ে গিয়েছিলো মাদ্রিদের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কেয়ারটেকার। কিন্তু তখনও কবির মৃত্যুর মঞ্চ তৈরী হয়নি।

নিউইয়র্কে লোরকা

গ্রানাদা তখন আর লোরকার জন্য নিরাপদ জায়গা নয়। তার জন্মের গ্রামও তাঁকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। ২০ জুলাই লোরকার বোনের স্বামীকে কার্যালয় থেকে বের করে দেয় কিছু ফালাঞ্জিস্ট গুণ্ডা। ভদ্রলোক ওই শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন মাত্র দশদিন আগে। তার অপরাধ ছিলো সে বামপন্থীদের সমর্থক। ঘটনাটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলো লোরকার পরিণতি। কারণ তার আগে থেকেই কবি উগ্র জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে জোর গলায় কথা বলছিলেন, লিখছিলেন। এই ঘটনার পর পরই সেই দলটা হামলা করে লোরকার বাড়িতে। সেখানে তারা কবিকে বাড়ির সিঁড়িতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। মারধোর করে বাড়ির মালিকে।

তারা চলে যাবার পর লোরকা নিরাপত্তার জন্য আত্নগোপন করেন ২৬ বছর বয়সী আরেক কবি লুইস রোসেলের বাড়িতে। স্পেনে সময়টাই তখন অন্যরকম, বিশ্বাসঘাতকতার চাদরে মোড়া। কেউ বলেন, ওই বাড়ির-ই কেউ ধরিয়ে দিয়েছিলো লোরকাকে। আবার কারো মত হচ্ছে, রেমিয়ন লুইজ আলেন্সো নামে স্থানীয় একজন ফালাঞ্জিদের কাছে নিজের অবস্থান শক্ত করতেই তাদের জানিয়ে দিয়েছিলো লোরকার গোপন অবস্থান।

অগাস্ট মাসের ১৬ তারিখ বিকেল। লোরকা তখনও আত্নগোপন করে আছেন। হঠাৎ করেই সেই বাড়িটা ঘেরাও করে সৈন্যরা। তারা হাতের অস্ত্র তাক করে দাঁড়ায়। তারা আটক করতে চায় সেই বাড়িতে আত্নগোপনে থাকা ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে। তাদের অভিযোগ ছিলো, ‘লোরকা তার কলম দিয়ে অস্ত্রধারীদের চাইতেই বেশি ক্ষতিসাধন করে ফেলেছে।’

লোরকাকে ওরা ধরে নিয়ে যায় একটা সরকারী ভবনে। তারপর রাত নামলে ওই বাড়ির সামনে এসে থামে একটা ট্রাক। কবিকে বের করে তোলা হয় সেই ট্রাকে।তাদের গন্তব্য সিয়েরা নাভাদা পাহাড়ের পাশে ছোট্ট গ্রাম ‘ভিজনার’। ভোরের আলো ফোটেনি তখনো। ট্রাক থামে পথের ওপর। নামিয়ে আনা হয় লোরকাকে, সঙ্গে তিন বন্দী। আবার লোরকার পায়ের তলায় ঠাণ্ডা কাদা, মাথার উপরে নেই কোনো চাঁদও। অন্ধকারে পথের পাশে একটা জায়গায় থেমে যেতে বলা হলো তাদের। তারপর ফায়ারিং স্কোয়াডের গৎবাঁধা দৃশ্যের অবতারণা। লোড…এইম…ফায়ার। কবির রক্তে ভাসে স্পেনের মৃত্তিকা।

অনেক বছর পরে লোরকার হত্যাকারীদের একজন জানিয়েছিলো শেষদৃশ্যে অকম্পিত ছিলেন কবি। সেই হত্যাকারী কবির আয়তনে কিছুটা বড় মাথায় একটা বুলেট ঢুকিয়ে দিয়েছিলো।

তারপর? তারপর,

আমাকে তারা খুঁজে পায় নি?

না। আমাকে তারা আর খুঁজে পায় নি।

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে কোনোদিন ঘাতকের বুলেট খুঁজে পায় না। ‍লোরকা কবিতা হয়ে ছড়িয়ে থাকেন আকাশে আকাশে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ লিটারেরি হাব

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]