শেষ আকাশের রঙ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মৌসুমী দাশগুপ্তা

রাবেয়া বেগমের বয়স ঠিক কত, কেউই তা জানে না। তবে তাঁর কথামতো ব্রিটিশের পয়লা যুদ্ধের দুই বছর পর তার জন্ম। সে হিসেবে তাঁর বয়স এক’শ ছুঁই ছুঁই।

বয়সের তুলনায় তিনি মোটামুটি সুস্থ্য ছিলেন বলা চলে। নিজের মত চলাফেরা করতে পারতেন। স্বল্পাহারী ছিলেন বরাবরই, রান্না ছেড়েছেন অনেকদিন আগে, কিন্তু প্রয়োজন হলে রান্নাঘর থেকে নিজে নিয়ে খেতে পারতেন।

বড় পরিবার তাঁর, জন্মেছেন অনেক ভাইবোনের মাঝে, এসেছেন বড় একটি সংসারে বধূ হয়ে, আবার নিজেও সৃষ্টি করেছেন ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনি মিলিয়ে সুবিশাল একটি সংসার। এমনকি তাঁর নাতি নাতনিদের ছেলে মেয়েরাও এখন বাবা মা।

অনেক মানুষ তাঁর জীবন থেকে একে একে হারিয়ে গিয়েছে, বাবা, মা, ভাই বোনেরা সবাই, স্বামী, এমনকি বড় দুটি ছেলে মেয়ে আর একটি নাতিও এগিয়ে গেছে তাঁকে পিছু ফেলে। আবার কত কত নতুন মুখ এসেছে একে একে!

তিনি সবার মুখ আর আলাদা করে মনেও রাখতে পারতেন না। সবাইকেই ‘দাদু’ বা ‘মানিক’ বলে ডাকতেন। নিজের মনে আবোলতাবোল গল্প করতেন। সেই কবে ব্রিটিশের দ্বিতীয় যুদ্ধে তাঁর মামাবাড়ির পুকুরে জাপানি বোমা পড়েছিলো আর পুকুরের সব মাছ মরে ভেসে উঠেছিলো, সে গল্প তিনি প্রায়ই করতেন। আবার অনটনের বছর ভাতের ফ্যান খেয়ে বাঁচার গল্প, গোরা সৈন্য আর হাবশি সৈন্য (হয়তো অ্যাফ্রিক্যান-অ্যামেরিকান দের কথাই বলতেন) দের কুচকাওয়াজের গল্প আর নোয়াখালীর ভয়াবহ দাঙ্গার গল্পও বাদ যেত না। আঞ্চলিক ভাষায় গুণগুণ করে বলতেন একাত্তরে রাজাকার বাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানোর কাহিনীও। বহুবার শোনা সে গল্পগুলোতে কেউ আর কান দিতো না, তবুও তাঁর মতো করে তিনি স্মৃতি আঙ্গিনায় ঘুরে বেড়াতেন রাতদিন।

দুপুরে ভাত খেয়েছেন কিনা সেটা মনে করতে পারতেন না, কিন্তু তাঁর বধূবরণে শ্বাশুড়ি মা যে তাঁকে ভরা দুধের হাঁড়ি চুলোয় বসাতে বলেছিলেন সেকথা তাঁর মনে পড়তো নিত্যই। চুলোর আঁচে দুধ উথলে উঠলে শ্বাশুড়ি মায়ের মুখও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো, লক্ষ্মীমন্ত বউ হয়েছে, ধনেজনে ঘর উথলে উঠবে দুধের হাঁড়ির মতই। আগুনের আঁচে রাঙা বউ এর মুখখানি আরও একজনের মনে সুখ জুগিয়েছিলো, বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া সে মানুষটার মুখটাও রাবেয়া বেগমের মন থেকে মুছে যেতো না, অথচ সকালে দেখা মানুষকে বিকেলে চিনতে পারতেন না।

ইদানিং অবশ্য তিনি বারবার শুধু একটা পুকুরের কথা বলতেন। পুকুরও নয়, আসলে মস্ত বড় একটা দীঘি, নাম ছিল তার বড় দীঘি। তাঁর শ্বশুরবাড়ির সেই ‘বদ্দীঘির পাড়’ এর কথা, দীঘির ধারে বিশাল হরিতকী গাছটার কথা, ‘ঘাটলায়’ রোদে বসে চুল শুকোনোর কথা বারবার বলতেন। দুপুরে খাবার পর রোদ পড়ে আসলে বাড়ির মেয়ে বউরা সবাই মিলে পুকুর ধারে হরিতকী গাছের তলায় বসতো। আসতো পড়শি বাড়ির মেয়েরা। টুকটাক গল্প হতো, কিছু সেলাই ফোঁড়াই বা চাল ডাল বাছার কাজ হতো, কেউ হয়তো আনতো এক বাটি আচার বা কদবেল মাখা অথবা নুন মরিচে আমড়া। ওই সময়টুকু একান্তই নারী মহলের। পুরুষেরা তখন হয় কাজে নয়তো দিবানিদ্রায়। বিকেল গড়াতে গড়াতে আড্ডা ভাঙ্গতো আর ঘড়া ভরতি জল কাঁখে সবাই ঘরের দিকে ফিরতো। সেই পুকুরের ওধারে, পশ্চিম দিকে জঙলা মত জায়গাটায় ছিলো পারিবারিক গোরস্থান। সচরাচর ওদিকটায় যেতো না কেউ তেমন। মহিলাদের জন্যে বিশেষ ভাবেই সেদিকে যাওয়া নিষেধ ছিলো, খোলা মাথায় তো নয়ই।

রাবেয়া বেগম ইদানিং কেবলই সেই দীঘির পশ্চিম পাড়ের কথা বলতেন। লম্বা একটা তালগাছ ছিলো সেদিকে আর নিচু নিচু কয়েকটা ঝুপসি কুল গাছ। তার ওপারে সমস্ত আকাশ জুড়ে হাজার রঙের আসর জমিয়ে সূর্যি ডুবতো, নিজের শোবার ঘরের পশ্চিমের জানালা ধরে দাঁড়িয়ে কতদিন সে সূর্যাস্ত দেখেছেন তিনি! ওদিকটায় লোক চলাচল নেই বলে পর্দা করা নিয়ে ভাবতে হতো না, যদিও মাথায় আধ ঘোমটা তাঁর টানা থাকতো প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই।

ছোট ছেলে আর নাতিদের কাছে রোজই বায়না করতেন দীঘির পশ্চিম ধারের সেই গোরস্থানে যেন তাঁকে কবর দেওয়া হয়। ছেলেমেয়েরা আমতা আমতা করে এড়িয়ে যায়। সে দীঘি ভরাট হয়ে গেছে বহু বছর আগেই। কবরস্থানের কিছু অংশ এখনও টিকে আছে বটে, কিন্তু নতুন কবরের জায়গা আর বাকি নেই সেখানে।

অনেক সময় তারা শহরের নানা অভিজাত কবরস্থানের কথা বলে; বলে, “হেই ভাঙ্গা গোরস্থানঅ যাইতেন কিল্লাই? আল্লাহ দিলে আঙ্গো টিঁয়া ফইসার অভাব আছে নি! আমনেরে ভালা জাগা’ত কব্বর দিমু। হিয়ানে কব্বর দিলে জিয়ারত কইরতাম যামু ক্যামনে?” রাবেয়া বেগমের তাতে মন মানে না। একটি নিরালা দীঘির ধারে আকাশ জোড়া সূর্যাস্তের রঙের নীচে শেষ নিদ্রায় যাবার ইচ্ছে তাঁকে আকুল করে রাখে।

হঠাৎ করেই এক দুপুরে অসুস্থ হয়ে পরলেন। ডাক্তার ডাকা হলো, নেওয়া হলো হাসপাতালে তাঁর প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও। পুরোটা পথ বিড়বিড় করতে করতে গেলেন, “আঁরে দেশর বাড়িত লই যা, বড় ফুস্কন্নীর (পুষ্করিণী) ধারত লই যা”। হাসপাতালে ঢুকে প্রবল বিরক্তি নিয়ে সমবেত সকলের দিকে তাকালেন, “তোগো মাথামুথা ঠিক আছে নি! আঁরে ইয়ানে কিত্তি আইনছস?” কেউ তাঁর কথায় তেমন গুরুত্ব দিলো না। অসুস্থ বৃদ্ধার মতিভ্রম হতেই পারে। সাধ্যমত সব চেষ্টা করা হলো তাঁকে বাঁচানোর, কিন্তু যার জন্য এত চেষ্টা, তার পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা চিকিৎসকেরা পেলেন না। রাবেয়া বেগম চিকিৎসা চান না, তিনি বাড়ি যেতে চান। দীর্ঘদিন শহরের চার দেওয়ালে বন্দী প্রাণ এবার ছুটি চায়।

অসুস্থ হবার দুদিনের মাথায় সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি চলেই গেলেন। যাবার কিছু আগে একবার চোখ মেলে তাকিয়েছিলেন। ঝকঝকে চুনকাম করা দেওয়াল আর টিউবলাইটের আলো দেখে আবার বিরক্তিতে মাথা নেড়ে চোখ বুজে ফেললেন। বললেন, “বুইজ্জি! বেঈমান অক্কল! তোরা আঁরে বাইত (বাড়িতে) নিতি’ন! আঁই বাস’অত উডি যামু গই! আসর বাদ মগরিব অই যাআর, আসমান’ত সুইজ্জ নামি গেছে, আঁই কলস’ত ফানি ভরি বাইত যামু গই।”

এরপর আর কারও ডাকে তিনি সাড়া দিলেন না। হয়তো তাঁর আকাশে তখন বেলাশেষের রঙ ধরেছে। লাল টুকটুকে বউটি ঘোমটা মাথায়, কলসী কাঁখে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে এগিয়ে যাওয়া সঙ্গীনিদের নাগাল ধরবে বলে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]