শেষ কদমফুল 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

নিঘাত কারিম

কর্কটকথা-২.

এখন  প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নিঝুমের মনেহয় সব সময় দুঃস্বপ্ন দেখে যেমন ঘুম ভাঙ্গে তেমনি আজও যেনো এটা দুঃস্বপ্নই থাকে সত্যি না স্বপ্নই দেখছিলাম এতক্ষণ ‘আশহাদুআল্লাহ ‘ বলে চোখ খুলে দেখে না সব সত্যি । কোন দুঃস্বপ্ন নয় ! সে এখন একজন ক্যান্সারের রোগী । তার ভিতরে বাসা বেঁধেছে ভয়ঙ্কর এক রোগ । যার নাম শুনলেই সবাই আঁতকে উঠে ।

সেদিন যখন সবার সঙ্গে ধবধবে সাদা এপ্রোন পরে বসেছিলো । সবুজ গাছটির দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলো সে ও গাছটির দেয়া অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকবে অনেকদিন । কিন্তু তা হয়তো হবার নয় । সেও বহন করছে এক ঘুনপোকা । যে পোকা একটু একটু করে খেয়ে ফেলছে তার টিসুগুলো । তাকে করে তুলছে নিস্তেজ । সজীব সতেজ নিঝুম  নিজ্ঝুম হয়ে যাচ্ছে । যাকে  কোনদিন কোন রোগ কাবু করতে পারেনি । পাঁচ বছরেও যার কোন জ্বর হয় না সে কিনা ক্যান্সার রোগী !

অতপর গন্তব্য পথের দৈর্ঘ্য  ঘুন পোকাদের খপ্পরে । কেটে ফেলছে  নরম – কোমল বয়সের আয়ু । কুহেলী মায়ায় মিশে যাচ্ছে জীবন ,অর্থহীন বোধের রোম্যান্টিকতার অন্ধকারে ।

ভেবেছিল কাউকেই জানাবে না । সব নিজে নিজেই সামাল দিবে । কিন্তু মুনীরে চোখ এড়ানো খুবই কঠিন । সব ধরা পড়ে গেলো । বায়পসি করানো হলো । ক্যান্সার- প্রাথমিক পর্যায় ।  ভাবীকে সব জানানো হলো । ভাবী ক্যান্সার রিসার্চার । ভাবী রাতে ভাইয়াকে  জানাতেই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পরের দিনই চলে এলো । একমাত্র আদরের বোন । মাথা  ও ঠিক রাখতে পারলো না । ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললো ।  সবচেয়ে ভাল কজন ডাক্তারের এর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডাঃ জেমী টেরীকে ঠিক করা  হলো। জেমী টেরী আমেরিকার বিখ্যাত অন্কোলোজিস্ট । সবাই নিঝুমকে  সাহস দিতে লাগলো ।

সবাই বলছে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার কোন সমস্যাই না । মুনীর বলছে , “তুমি ভালো হয়ে যাবে । তুমি আবার হাসবে । ভোরের রোদের মতো গলে গলে পড়বে । জীবন পথে তুমি হেঁটে যাবে অনেক দূর ।” পরিবারের সবাই , বন্ধুরা   ওকে সাহস দিচ্ছে । নিঝুমের ভয় এখন মৃত্যুকে । সে কি  শুনতে পারছে মৃত্যুর পদধ্বনি । তার দ্বারপ্রান্তে কার ডাক শোনা যায় ? মৃত্যুদূত কি এসে গেল !জীবন অঙ্কের হিসেব নিকেশ শেষ হলো । এটাই কি শেষ অধ্যায় ? কার পায়ের আওয়াজ শোনা যায় ?

সবাই বলছে , “ তুমি ভয় পেও না ।  আমরা সবাই আছি তোমার সঙ্গে ।তুমি অসীম সাহসী একজন । মৃত্যুকে তুমি পায়ের ভৃত্য বানিয়ে দাও । মৃত্যু তোমাকে ভয় পাবে , তুমি মৃত্যুকে নয় ।” কিন্তু নিঝুম ভেঙ্গে পড়ছে  একটু একটু করে ।

 

শারার নিঝুমের বড় ছেলে । মায়ের লক্ষণ গুলো ও প্রথম টের পেয়েছে । সাইকোলজির ছাত্র। ওর প্রথম পেসেন্ট ওর মা । যা পড়ে সব মায়ের উপর  মজা করে অ্যাপলাই করে । সব শোনার পর  এমন নীরব হয়ে গেলো । কথাও বলছে না ঠিক মতো । শুধু মুখটা কালো করে দরজা বন্ধ করে  বসে থাকে । মায়ের মুখোমুখি হতে ওর ভয় । কান্না কাউকে দেখাতে চাচ্ছে না ।ও মানতেই পারছে না মায়ের ক্যান্সার ।

শাইয়ূ-  ছোট ছেলে বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে ?

মায়ের কাছে থাকা , মায়ের আদর নেয়া ওর কাজ । যখন জানালো , চুপিচুপি ইন্টারনেটে বসে সার্চ করে সব জেনে গেলো কিন্তু কাউকে বুঝতে দিলো না ও সব জানে ।। সারাক্ষণ মায়ের কাছে থাকে কিন্তু পাথরের মতো তার মুখ। এতো মায়া , এতো ভালোবাসা ছেড়ে নিঝুম কি করে থাকবে ওপারে ? দুই ছেলেকে না দেখে তো থাকতেই পারবে না , আর মুনীর ?

যার সঙ্গে ওর আজন্ম সম্পর্ক ওকে ছেড়ে কি করে থাকবে ? অন্য কোন্ জগতের দিকে যাত্রা করেছে সে ? আব্বা আম্মাকে তো জানানোই হয়নি তাদের একমাত্র আদরের মেয়ের কি হয়েছে । ওর অনন্ত যাত্রা ওরা কিভাবে মেনে নিবেন ? মুনীরের বাসার সবাই এত কান্নাকাটি করছে যে নিঝুম নিজেই ওদের সাহস দিয়ে বলছে , “ আমার কিছুই হয়নি , অপারেশনের পর সব ঠিক হয়ে যাবে । তোমরা শুধু দোয়া করো ।” সবাই ওকে  ভালোবাসে জানা ছিলো কিন্তু এত যে ভালোবাসে ওর জানা ছিলো না । এমন ও কেউ আছে যাকে নিঝুম ভালো করে চিনেও না সে ওর জন্য মসজিদে মসজিদে কোরান খতম করাচ্ছে । যে শুনছে সেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে । এত যে ভালোবাসা ,মায়া -মমতা , পরিবার -পরিজন , বন্ধু -বান্ধব সবার ছেড়ে সে কি চলে যাবে নাকি সবার ভালোবাসায় , দোয়ায় আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিবেন ।

একদিন তো যেতেই হবে । ঝরাপাতার মতো ঝরে পড়তে হবে । এই ঝরা পাতার মর্মরে মিশে থাকে জীবনের  অর্থ ।

তবুও আমরা ঝরাপাতাদের উড়াউড়ির বিষাদে খুঁজে ফিরি নিজেদের নীড় প্রত্যাবর্তনের মোহ মায়া । সর্বদাই করি বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ।( চলবে)

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]